সুপ্রিয়া দেবীরা প্রতিদিন জন্মান না, কালেভদ্রে জন্মান

নাসরিন শাপলা:

“The Last Word” ছবিটি দেখছিলাম। এক সময়কার সফল ব্যবসায়ী একজন বৃদ্ধা শেষ জীবনে এসে খুঁজে নিলেন একজন তরুণী সংবাদ কর্মীকে। সংবাদপত্রে এই লেখিকার মূল কাজ মৃত্যু সংবাদগুলো (Obituary) অত্যন্ত কাব্যিকভাবে পত্রিকাতে লেখা। বৃদ্ধার ইচ্ছা অনুযায়ী লেখিকা তার আগাম মৃত্যু সংবাদের ড্রাফট লিখতে যেয়ে আবিষ্কৃত হলো, মানুষ এই আপাতদৃষ্টিতে সফল বৃদ্ধাকে তার ইচ্ছের চেয়ে ভিন্নভাবে স্মরণ করছে-সেখানে তাঁর সাফল্য গাঁথা পুরোই অনুপস্থিত। শুরু হলো তরুণী লেখক আর বৃদ্ধা ব্যবসায়ীর অন্যরকম পথচলা। এই দুই অসমবয়সী নারী একে অপরের সাহায্যে নতুন করে তাদের জীবন গাঁথা রচনা করলো। অসাধারণ এক কাহিনী।

আজ বাংলা চলচ্চিত্রের আরেকজন সফল অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরী চলে গেলেন। আরেক নক্ষত্রের পতন হলো। অসময়ে বলবোনা। জীবনের ৮৩টি বছর কাটিয়েছেন তিনি। তাঁর মাঝে ৫০ বছরেরও বেশী সময় অভিনয়ের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। বলাই যায়, এক বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন তিনি।

কিছু মানুষকে আমার সব সময়ে মনে হয়, ইনারা সময়ের অনেক আগে জন্মেছেন, অর্থাৎ সমাজ এবং পারিপার্শিকতা যতটুকু আধুনিকতার জন্য প্রস্তুত, ইনারা তাঁর চেয়েও বেশী আধুনিক ছিলেন। হয়তো তাদের তৎকালীন আচরণগুলো সেসময়ে বেমানান লাগলেও বিশ বা ত্রিশ বছর পরে অনেক স্বাভাবিক মনে হয়।

সুপ্রিয়া দেবীকে আমার কাছে ঠিক তেমনি একজন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মানুষ মনে হতো। আমি কোথায় যেন উনার সাথে পাশ্চাত্যের সোফিয়া লরেনের একটা মিল খুঁজে পেতাম। আর তাঁর অভিনয়, বাচনভঙ্গি, পোষাক নির্বাচন, শাড়ি পরার ঢঙ্গ সবকিছুই যেন সেকালের রুচির চেয়ে অনেকখানি এগোনো। ফলে যতোখানি দর্শকপ্রিয়তা উনার পাবার কথা ছিলো, ঠিক ততোটা উনি পাননি। মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী সমাজ “মেঘে ঢাকা তারা”র নীতাকে খুব আদর করে গ্রহণ করলেও, অন্যান্য চরিত্রগুলোর সাথে আর নিজেদের খুব একটা মেলাতে পারেনি। ফলে বাঙ্গালী ললনার ইমেজ নিয়ে সুচিত্রা সেনই সেই সময়টাতে বেশী দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।

শুধুমাত্র চলচ্চিত্রই নয়, তাঁর ব্যক্তিজীবনও সেই সময়কার মধ্যবিত্ত মানসিকতার আদলে ছিলো না। মহানায়ক উত্তম কুমারের সাথে সখ্যতা, বিবাহ বহির্ভুত (মত্তান্তরে) সস্পর্ককে টেনে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানা কারনেই তিনি অনেকের রোষানলে পড়েছিলেন। এই সবকিছু উপেক্ষা করার মানসিক শক্তিও ছিলো তাঁর বাহবা পাবার মতো। অকপটে তিনি বলে গেছেন মহানায়কের সাথে তাঁর সখ্যতার কথা। একবার কিভাবে যেন আমার হাতে উনার একটি রেসিপির বই এসেছিলো। সেখানে তিনি উনার হাতের রান্না করা উত্তম কুমারের পছন্দের খাবারগুলোর রেসিপি প্রকাশ করেছিলেন। অসম্ভব ভালো রান্নার হাত ছিলো উনার। তখন আমি রান্না না জানলেও কোন একদিন রাঁধবো এই আশায় রেসিপিগুলো কোথায় যেন রেখে দিয়েছিলাম খুব যত্ন করে। উত্তম কুমার যে আমারও খুব প্রিয় ছি্লেন।

আজ উনার মৃত্যু সংবাদ লিখতে যেয়ে নিশ্চয়ই অনেকেই আকাশ পাতাল ভেবেছেন। কোথা থেকে শুরু করবো? কোনটুকু বাদ দেবো? অনেকগুলো Obituary চোখে পড়লো-সবই গতানুগতিক,শব্দ চয়নে, বিষয় নির্বাচনে সবাই বড় সাবধানী। কোথাও আসল সুপ্রিয়া চৌধুরীকে খুঁজে পেলাম না। বোধহয় টাইপের অক্ষর তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের প্রতি আর সুবিচার করতে পারছে না। একজন সুপ্রিয়া চৌধুরীর তাতে কী আসে যায়? বাংলা চলচ্চিত্রকে যা দেবার ছিলো উনি তাঁর চেয়ে অনেক বেশীই দিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্র কতোটুকু নিতে পেরেছে আর কতটুকু ব্যার্থ হয়েছে সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে, শুধু এটুকু জানি সুপ্রিয়া দেবীরা প্রতিদিন ঘরে ঘরে জন্মান না- কালেভদ্রে জন্মান।

প্রিয় সুপ্রিয়া দেবী, আপনার মহাপ্রস্থান শান্তিময় হোক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.