‘শায়লাকে বেশ্যা না বললেও চলে’

0

লাবণী মণ্ডল:

২৩ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ঘটেছে, তা আমরা সবাই জানি, সবাই দেখেছি। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সেদিনের ছবি দিয়ে সয়লাব হয়ে গেছে।

আন্দোলনরত এক নারীকে যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যানারে ভিসিকে আটকে রাখা হয়েছিল সেদিন। যেহেতু ইতিহাসের প্রত্যেকটি আন্দোলনে সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন প্রগতিশীলরা, এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। মূল নেতৃত্বে ছিলো- ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন (গণসংহতি)সহ প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ছাত্রসংগঠনগুলো। সকাল থেকেই তারা অবস্থান করছিল। ভিসি একটি অনুষ্ঠানে যাবেন বলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জানালেও তারা তাকে মুক্ত করে দেয়নি। তাদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তারা ভিসিকে আটকে রাখবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একদল কর্মী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপরে ন্যাক্কারজনক হামলা চালায়। যে হামলার মূল নেতৃত্বে ছিলো দলটির সাধারণ সম্পাদক। সেখানে ছাত্রলীগের অন্যান্য নেতাকর্মীর সাথে যুক্ত হয়েছিল নারী নেতাকর্মীরাও। এমনি একজন নারী নেত্রী শায়লা শ্রাবণী। কুয়েত মৈত্রী হলের নেত্রী। ক্ষমতাসীনদের দল করে, তার তো পাওয়ার থাকবেই! থাকাটাই স্বাভাবিক! যদি তাই না থাকতো তবে কি আর নেত্রী হতে পারতো! এখন পাওয়ারেরও শ্রেণী চরিত্র আছে। আমাদের আন্দোলনরত ছাত্রীদেরও পাওয়ার আছে। তাদের পাওয়ারটা হলো জনগণের পাওয়ার, মানুষের ভালোবাসার পাওয়ার। আর শায়লার পাওয়ার ক্ষমতার পাওয়ার, অর্থের পাওয়ার। সহজ হিসাব।

শায়লার আক্রমণাত্মক ছবি ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই তাকে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দিচ্ছে। কিন্তু শায়লাকে আমি বেশ্যা বলতে পারছি না, শায়লার কাপড়ও খুলে ফেলা হোক, তাও বলতে পারছি না। কেননা শায়লা আর প্রগতি বর্মণ তমাদের পার্থক্য বুঝতে হবে। এই যে শায়লা এতোকিছু করলো, চুল ছিঁড়ে ফেললো, ওড়না টেনে নিয়ে গেল, লাথি, ঘুষি, চড় মারলো, তবুও, আমাদের তমারা শায়লার ওড়না টেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিবে না। তমারা জানে নোংরা রাজনীতিতে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ টেনে লাভ নেই। এখানে দুটো শ্রেণী, একটা নিপীড়িত আর একটা নিপীড়িক। এর বাইরে আর কিছু নেই।

আমার বন্ধুরা দেখছি শায়লাকে কাপড় খুলে ফেলার পক্ষে মত দিচ্ছে, তাকে উলঙ্গ করলে কেমন লাগবে তা জানতে চাচ্ছে, তাকে উলঙ্গ করে তাদের সামনে ছেড়ে দিক- তাও বলে বেড়াচ্ছে। এমনও বলে বেড়াচ্ছে- পতিতারা শুধু পতিতালয়ে থাকে না, ঢাবিতেও থাকে, ছাত্রলীগেও থাকে। এগুলো কী ধরনের নোংরা মানসিকতা! শায়লাকে আক্রমণ করার আর কোনো পথ নেই? আর এর মধ্য দিয়ে আপনারা যে আমাদের সবাইকে অপমান করছেন, তা বুঝতে পারছেন না?

শায়লাদের শ্রেণী চরিত্র বুঝতে হবে। শেখ হাসিনা তো দেশের প্রধানমন্ত্রী, নারী প্রধানমন্ত্রী। তাতে কী হয়েছে নারীদের? কারণ তার শ্রেণী চরিত্র নিপীড়িতের পক্ষে নয়, নিপীড়িকের পক্ষে। এই যে এতোকিছু ঘটে গেল, ‘মাদার অফ হিউমানিটির’ কোনো কথা নেই। উনি নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন। তাতেও আপত্তি নেই, কারণ এদেশে তমাদের শ্লীলতাহানি অত সস্তা নয়। তমা, আশারা বেঁচে থাকার সুখটা বুঝে গেছেন। তারা বুঝে গেছেন আন্দোলন ব্যতীত আর রক্ষা নেই। এই সমাজকে শ্রেণীহীন সমাজ হিসেবে গড়ে না তোলা পর্যন্ত তমা, আশাদের কারোরই মুক্তি নেই।

শায়লার রাজনীতি নিয়ে আপনি হাজারটা কথা বলেন। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে তাকে বেশ্যা বলে, মাগি বলে, খাঙ্কি বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না। লিটনকে যারা অর্ধউলঙ্গ করে ফেললো, তাদেরকে কী বলবেন? দুটো শ্রেণীই যথেষ্ট। নারী, পুরুষ ভেদাভেদ টেনে মজা পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শায়লার রাজনীতি ওকে যা শিক্ষা দিয়েছে, ও তাই করেছে। দেখেন, তমা, আশারা কিন্তু ওর ওড়না টেনে নেয়নি, ওর কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছে। হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে, চিল্লাচিল্লি করেছে। তার মানে কি এটা বুঝা যায় যে তমাদের শক্তি নেই, দুর্বল শ্রেণীর? মোটেও না। তমাদের আদর্শ অনেক বড়। তাদের দর্শন তাদেরকে শিক্ষা দেয় নারীমুক্তির, মানবমুক্তির। তাই তো তারা শায়লাদের চুল ছিঁড়তে পারে না, ওড়না টেনে নিয়ে উলঙ্গ করে দেওয়ার মানসিকতা অর্জন করতে পারে না। তবে প্রতিরোধটা করতে পারে। প্রয়োজনে জীবনও দিতে পারে। ইতিহাস তাই বলে। ইতিহাসের শিক্ষাই বড় শিক্ষা।

আমি মোটেও শায়লার পক্ষ নিচ্ছি না। অন্যায়কে অন্যায় বলার মতো মানসিকতা আমার আছে। আমার রাজনৈতিক শিক্ষাও তাই। শায়লা এখানে ব্যক্তিমাত্র। বড় বড় শায়লারাও এই নোংরামি করবে। কেননা তাদের কোনো আদর্শ নেই, নীতি-নৈতিকতা নেই, দর্শন নেই। তাদের দর্শন খুনের, রাহাজানির, চুরি, বাটপারির। সুতরাং এটা এই নোংরা রাজনীতির ফসল।

যে বা যারা শায়লা এই বেশ্যাগিরি করেই পদ-পদবী পেয়েছে বলে বেড়াচ্ছেন, তাদের বলতে চাই- নারী হওয়ার কারণেই বেশ্যা বলছেন কেন? বেশ্যা শব্দটা উইথড্র করেন। শায়লাকে রাজনীতি দিয়ে আঘাত করেন। আপনার রাজনৈতিক নৈতিকতা দিয়ে আঘাত করেন। শায়লার ব্যক্তিগত ছবি অর্ধনগ্ন করে আপনারা কী বোঝাতে চাচ্ছেন? শায়লার স্তন ধরে টানা উচিত বলে কী বোঝাচ্ছেন? কী জঘন্য মানসিকতা আপনাদের! কী ভয়ংকর! একটা অন্যায়কে অন্যায় বলতে গিয়ে আরেকটা অন্যায় করে বেড়াচ্ছেন!

এ কেমন শিক্ষা! শায়লাকে বহিষ্কারের দাবি তোলেন, জনগণের কাছে তার ভুল স্বীকার করে যাতে ক্ষমা চায় সে কথা বলেন, শায়লাদের আর যাতে ভুল না হয়, তা বলুন। আমি মোটেও শান্ত হতে পারছি না। আন্দোলনে এতো এতো লোক হামলা করলো। অথচ আপনারা শায়লাকেই দেখছেন, শায়লাকেই ধর্ষণ করার মানসিকতা প্রকাশ করে বেড়াচ্ছেন। আমি
স্যরি। এই মানসিকতা বর্জন করুন।

কোনো আন্দোলনকর্মী কিন্তু এই মানসিকতার প্রকাশ ঘটাতে পারছে না। যারা মার খেয়ে হাসপাতালে, তারাও কিন্তু এ ধরনের নোংরামি করতে পারছে না। তবে আপনারা কেনো? আপনারা কেনো সুযোগে অসৎ ব্যবহার করছেন। শায়লারা এই নোংরা সিস্টেমের নোংরামির অংশ। সেই নোংরামি নিয়ে আওয়াজ তুলুন। ব্যক্তি শায়লাকে আক্রমণ করে, কথা দিয়ে ধর্ষণ করে কোনো লাভ হবে না। এতে বরং শায়লাদের সংখ্যাই বাড়বে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

লেখাটি ৫,৬৭২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.