সম্পর্কের সমীকরণ

0

রাব্বী আহমেদ:

কী জটিল প্রক্রিয়ায় নারী এবং পুরুষের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে জানা নেই। জানি না এই শহরে কেমন করে প্রেম হয়। গড়ে ওঠে সম্পর্কের বীজ। চারদিকে অজস্র সম্পর্ক গড়ে ওঠার মিছিল দেখে মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ভীড়ের মাঝে ঢুকে পড়ি। কিন্তু এইসব মিছিলে নিজেকে ‘ফিশ আউট অফ ওয়াটার’ মনে হয়। ভাবি, গড়পরতা এইসব সম্পর্কের শেষটা আসলে কোথায়?

কলা ভবনের সামনে তেঁতুলের আচার চাটতে দেখে যে নারীকে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী মনে হয়েছিল, একদিন বর্ষার বিমুগ্ধ প্রহেলিকায় হুড তোলা রিক্সায় অচেনা লোমশ হাত পেছন থেকে তার কোমর ধরে বসে ছিল বলে, দেবীত্বের আসন থেকে মন যেন সহসাই তাকে নামিয়ে দিয়েছিল সাধারণ মেয়েদের কাতারে। কেন যে জানি না, অধিকারহীন এক নারীর জন্য বুকের মাঝে ছ্যাঁত করে ওঠা এই দৃশ্যপটের ভয়ে ভীতু আমি আর কোনদিন হুড তোলা রিক্সার দিকে তাকাইনি।

জ্বরগ্রস্ত মায়া মায়া এক নিশুথি রাতে যখন মাহবুব এসে হাত রেখেছিল মাথায়, বলেছিলাম তোর হাতটা হাতের ওপর রাখ। বহুদিন কেউ হাতের ওপর হাত রাখেনি। একথা শুনে ও হাত রাখার বদলে সরিয়ে নিয়েছিল। অবাক বাকরুদ্ধ আমাকে অসহায়ের মতো বলেছিল, দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় এক মেয়ে বলেছিল, তোমার হাত খুব শক্ত মাহবুব। সেই থেকে আমি কারো হাত ধরি না ভাই। জানি না সে মেয়ে আজ অন্য কারো হাতের নিগড়ে বন্দী কিনা!

মনে পড়ে বরিশাল শহরের এক নিরিবিলি রেস্তোরায় সাদা ইউনিফর্ম পড়া কলেজ বালিকা রুক্ষ্ম আমার হাত ধরে একদিন বলেছিল, শোনো, জীবন পথে অনেক সম্পর্কই তোমাকে পদে পদে বিভ্রান্ত করবে।

কিন্তু এই অমোঘ সত্যটুকু জেনো, তোমারই প্রিয় শঙ্খ ঘোষের কথা,
হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়,
সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়….

দ্বিধাগ্রস্ত এই আমি সারা জীবন বইতে পারবো না বলে আজো সম্পর্কের কোনো কঠিন পথে পা বাড়াইনি। অথচ এই শহরেই বছরের পর বছর একসাথে ঘর করা পুরুষটা জানে না স্ত্রীরও নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। শুধুই নিজের কথা কেন লিখি। বরং অন্যের কথাও হোক দু একটা।

কার্জনের এক নির্জন বিকেলে বন্ধু লাবণ্য বলেছিল, এই সত্য তোরা ছেলেরা কবে বুঝতে শিখবি? একটা মেয়ে শরীর দেয়ার আগে মন দেয়। মানসিকভাবে কাউকে গ্রহণ করতে না পারলে শারীরিকভাবে তাকে গ্রহণ করা যায় না রে! তোরা পুরুষরা শুধুই পশুর মতো শরীরটাকে কামড়াতে জানিস। পর্নোগ্রাফি দেখে দেখে পারভার্ট তোরা সেক্স আর লাভ মেকিং এর পার্থক্যটুকুও জানিস না।

শরীর না দিতে পারা লাবণ্যের জন্য যেদিন হাসপাতালের করিডোরে নির্ঘুম রাত জেগেছিলাম আমরা ক’জন, সেদিন জেনেছিলাম জীবন থেকে চলে যাবার কষ্ট কতোটা নির্মম। আত্মঘাতী অভিমানে যে লাবণ্যকে হারিয়ে ফেলেছিলাম ক্যাম্পাস জীবনের শুরুতে, তাঁর কাছ থেকেও তো শেখা যেতো সম্পর্কের রসায়ন!

শুধুই ভুল মানুষকে নির্বাচন করি আমরা। ট্রায়াল এন্ড এরর মেথড এই জীবনে খুব প্রাসঙ্গিক নয় বলে, আমরা হেঁটে বেড়াই ভুল মেমোরি লেনে। ক্লাসের যে মেয়েটা নোট নিয়ে অপেক্ষায় থাকে, তাকে কোনদিন ভালো লাগে না আমাদের। আমাদের ভালো লাগে রিক্সায় যেতে যেতে চুল বাঁধতে থাকা কোন অচেনা নারীকে। আমাদের ভালো লাগে স্টেডিয়ামে হঠাৎ চোখ যাওয়া কোনো অচেনা পুরুষ, অথচ ভালোবাসার অথৈ সমুদ্র নিয়ে অপেক্ষমান যুবককে মনে হয় স্রোতের জলে ভেসে আসা ঝিনুক। সেই ঝিনুকের মাঝেই যে মুক্তা ছিল, তাকে আবিষ্কার করা হয় না বলে আমরা একটা জীবন কাটিয়ে দেই পুঁতির মালার সাথে। আমরা কাঁচকে হীরা ভেবে ভুল করি।

আমরা ভাবি, সহজেই যা পেয়েছি তার আর কীসের মূল্যায়ন! অথচ জানি না, জীবনের বেঁচে থাকার জন্য সব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমরা সহজে পেয়ে যাই। অক্সিজেন এবং পানির মূল্য যেমন বোঝা যায় এর দুষ্প্রাপ্যতায়, তেমনি সহজলভ্য মানুষগুলো সহজাত অভ্যাসে মিশে গেলে তাদের মূল্য মেলে হারিয়ে ফেলার পর। আমরা হারিয়ে ফেলতে ভালোবাসি, কারণ নতুনের প্রতি আমাদের আগ্রহ অনেক। অথচ জানি না, সম্পর্ক পুরনো হলেই ঋণ বাড়ে। নতুন সম্পর্কের কাছে আমাদের দাবী আদায়ের কোন মিছিল থাকে না। সম্পর্কের এইসব জটিল রহস্যের সমাধান যেদিন খুঁজে পাবো, সেদিন একটি চিরস্থায়ী সম্পর্কের কথা ভাবা যাবে। আপাতত মিছিলের হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর কথা ভেবে খানিকক্ষণ বিরহ বিলাস হোক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 911
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    911
    Shares

লেখাটি ৩,১৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.