সম্পর্ক গড়া বা না করার দায় আমাদের সবার

ফড়িং ক্যামেলিয়া:

বছর সাতেক আগে এক বিখ্যাত ব্যান্ডের বিখ্যাত গায়ক এর কঠিন ভক্ত ছিলাম। ব্যক্তিগতভাবেই ওনাকে চিনতাম, তার বাসায় আড্ডা দিয়েছি বেশ কয়েকবার, আর প্রতিবারই নতুন করে মুগ্ধ হয়েছি। সব মিলিয়ে এমন গুণী মানুষের ভক্ত না হবার কোনো কারণ নেই।

একদিন ফোন দিয়ে বললেন পরদিন কনসার্টে যেতে চাই কিনা। সানন্দে রাজি হলাম। সেই থেকে মাঝে মাঝেই নক করতেন। কারণ তো কিছু না, অকারণেই চ্যাট হতো, কখনো মোবাইলে আলাপ।

মাসখানেক পর একদিন মাঝ রাতে আমাকে ফেবুতে নক করে বললেন মন ভালো না, কথা বলতে চান। সারা রাত যে মেসেজ পাঠালেন তার সারমর্ম ভয়াবহ। ওনার মেসেজগুলোর সারমর্ম হলো, উনি একজন একাকী মানুষ এবং বিবাহিত জীবনে উনি ক্লান্ত। তাই আমাকে ওনার জীবনে বড্ড বেশী প্রয়োজন। পরদিন ক্লাস আছে বলে সে কথোপকথনের ইতি টেনে খানিকটা পাঁথর হয়ে বসে রইলাম ।

যেহেতু এমন কোনো পরিস্থির জন্য তৈরি ছিলাম না, তাই দিশেহারা অবস্থা হলো আমার। আগেই বলেছি, আমি তার গানের এবং গুণের ভক্ত এবং তাকে কঠিন রকমের শ্রদ্ধাও করি, আমি যে তাকে অপছন্দ করি না, সেটাও তো জানি। তাই আমার ভেতরে এক ধরনের ভাংচুর শুরু হলো। তার পরের রাতে মেসেজ পাঠালেন জেগে আছি কিনা, এবং আমার সিদ্ধান্ত কী, উনি জানতে চান।
জবাব দিলাম না, এক কথায় পালালাম। এর পরদিন মোবাইলে মিস কলের পর মিস কল হলো, মেসেজ জমলো, কিন্তু উত্তর দেবার সাহস হলো না।

শেষমেশ ওনার ফোন ধরে বললাম, সম্ভব না। আমি ওনার গুণের ভক্ত, এবং সেটাই থাকতে চাই। আর যে বৈবাহিক সম্পর্কে উনি সুখী নন, সে সম্পর্ক সামাজিকতার দোহাই দিয়ে টিকিয়ে রাখতে চাইলে সেটা ওনার বিষয়, কিন্তু দ্বৈত সম্পর্ক ওনাকে আরও একা করে দেবে। সমস্যা ঢাকলে বাড়ে, কখনো কমে না। যাই হোক,
উনি এখনো ওনার স্ত্রীর সাথেই আছেন এবং আমার সাথে ওনার দেখা হয়েছে বহুবার। সব সময়ের মতো হেসে হেসেই কথা হয়েছে। ওনার একান্ত আলাপগুলো গোপনই রেখেছি, এবং আমি এখনো ওনার গানের ভক্তই আছি।

– প্রেমে পড়ার কোনো বয়স, সময়, কাল থাকে না। চুলে পাক ধরলে যে মনেও পাক ধরবে, সেটা কে বলেছে? তাহলে সুবর্ণা কিংবা হুমায়ূন আহমেদ এর মতো উদাহরণ তৈরি-ই হতো না। দুজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের প্রেম হতেই পারে, সেখানে তাদের বয়স নয় সম্মতিই মুখ্য, কিন্তু সেটা তৃতীয় জন মানে বর্তমান বৌ, স্বামী কিংবা প্রেমিক/প্রেমিকা থাকা অবস্থায় না। আর বিবাহিত জেনেও যারা প্রেম করে, তারা দুজনেই অপরাধী সেই তৃতীয় জনের কাছে। এখানে কারও অপরাধ ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। যদি বর্তমান প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় সম্পর্ক হয় সেক্ষেত্রে সেটা তাদের রুচির বিষয়। যদিও এমন সম্পর্ক ধোপে, যুক্তিতে টেকে না। তবুও সেটা অন্যায় নয়। এটা ওপেন রিলেশনশিপ এর একটা শাখা মাত্র।

– এর পরের বিষয় হলো, প্রেম হলে আজীবন থাকবেই, এমন তো কোনো কথা নেই। মনের উপরে জোর চলে না, কেউ আলাদা হতে চাইলে দুজনের সম্মতিতে আলাদা হয়ে যাওয়াটাও প্রেমের একটা কমিটমেন্ট। এখানে কাউকে জোর করে রাখাটা বরং অন্যায়।

– প্রেম হয় গোপনে। বেডরুম কখনো রঙ্গমঞ্চ হয় না। সেখানে দর্শক ঢোকার সুযোগ নেই। যদি সেখানে কেউ শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়, সেজন্য আইন আছে, আদালত আছে। নিয়ম অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু প্রেম নেই বলে বেডরুমের আলোচনা বাইরে বের করে আনাটা প্রেমের কমিটমেন্ট ভাঙার শামিল এবং এটা অন্যায়। প্রেম নেই বলে প্রেমের সময়টুকু নিয়ে তামাশা করার অধিকার জন্মায় না।

– যৌনতা অপরাধ না, কিন্তু ধর্ষণ অপরাধ। যৌনতা দুজন মিলেই উপভোগ করেছে, সেখানে শুধু ছেলের দায় কেন হবে? বিয়ে করার আশ্বাস দিয়ে ঠকানো ফালতু আলাপ। বিয়ে টেকে বিশ্বাসে, যেখানে ভালবাসা নাই, সেখানে বিয়ে করে বরং সমস্যা হাজার গুন বারে।

প্রথমেই বলেছিলাম সেই গায়ক এর কথা। গুণীজন মানেই সকল মানবিক আচরণের ঊর্ধ্বে না। উনি আমাকে ভালবাসার কথা বলেছিলেন, জোর করেননি, কিংবা আমার সাথে কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ করেননি। উনি প্রেমে পড়েছিলেন, আর প্রেম খুব স্বাভাবিক বিষয়। সামাজিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের সাহস ওনার নেই, সেটা ওনার দুর্বল চরিত্রের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু না। কিন্তু আমার দায় ছিল ওনার এই অন্যায় চাওয়াকে প্রশ্রয় না দেয়া, এবং একই সাথে ওনার ভালবাসার অনুভূতির প্রতি সম্মান জানানো। আমি সেটাই করেছি।

শেয়ার করুন:
  • 503
  •  
  •  
  •  
  •  
    503
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.