কোনো ভালবাসাই মন্দ নয়, যদি তোমায় মন্দ না রাখে!

শেখ তাসলিমা মুন:

পৃথিবীর কোনো ভালবাসা মন্দ নয়, অন্যায় নয়, পাপ নয় যে ভালবাসায় তুমি ভালো থাকো। ভালবাসা কোনো প্যাটার্ন ফলো করে না। ভালবাসার কোনো ডিজাইন নেই। ভালবাসা একটি স্বাধীন অ্যাক্ট। আমি কাকে ভালবাসবো, কীজন্য ভালবাসবো, কেন ভালবাসবো, সেটির কোনো রেসিপি ফলো করা যায় না। আজ পর্যন্ত কেউ তা পারেনি। হাজার বছর ধরে কেউ পারেনি। যে ভালবাসায় তুমি ভালো বোধ করো, সে ভালবাসা তোমার জন্য রাইট। ভালবাসা যদি ভালবাসা হয়, তা তোমাকে ‘মন্দ’ রাখে না।

ওয়ান সাইডেড ভালবাসা হলে অনেক সময় মনো যাতনা থাকতে পারে, কিন্তু দুজনের ভালবাসায় যদি কাউকে মন্দ রাখে, তবে বুঝবে ভালবাসায় ভালবাসা বলতে যা বুঝায় সেটি নেই, হয়নি। একটি রুগ্ন কিছু যা ভালবাসাকে অসুস্থ করে তুলছে। তখনই ভালবাসার পাত্র-পাত্রীদের বোঝা উচিত, ‘এখনি পেছানোর সময়’। সে রুগ্নতা যে কোনো কারণে হতে পারে কিন্তু, সমাজ, নর্ম, ডিজাইন, প্যাটার্ন, নিয়ম, নীতি, উচিত, অনুচিত কোন বাধা নয়। ভালবাসা একটি শক্তি। পরখ করে দেখো, সে শক্তি অনুভব করছো কি? যদি না করো, তাহলে সেটি ভালবাসা নয়।

‘পরকীয়া’ নাম দিয়েছে সমাজ বা কিছু নর্ম। বা ধর্ম বা বিধান। যারাই ‘বিবাহ’ সৃষ্টি করেছে, তারাই ‘পরকীয়া’ শব্দটি সৃষ্টি করেছে। ভালবাসার সমস্যা ‘পরকীয়া’তে নয়। বিষয়টির জটিলতা অন্য জায়গায়।

ভালবাসা একটি স্বাধীন অ্যাক্ট আগেই বলেছি। এ অনুভবটি স্বতঃস্ফূর্ত। যখন তুমি অন্যের টার্ম এবং কন্ডিশনে ভালবাসাকে ড্রাইভ করবে, তখনই বুঝবে সেটি ভালবাসা নয়, দাসত্ব। সে দাসত্বে ভালবাসার শ্বাসরোধ হয়। ভেঙে পড়ে। জটিল হয়, পঙ্কিলও হয়। কিন্তু একে তুমি বলো না ‘পরকীয়া’র দোষ। এ দোষ সম্পর্কের। সম্পর্কটি অস্পষ্ট। সম্পর্কটি রুগ্ন। সম্পর্কটি তখনও ‘ধারণা’। সম্পর্কটির কোনো প্ল্যাটফর্ম তখনও হয়নি। তখনও সেটি একটি ইলিউশন। একটি মোহ ও আকর্ষণ। তখনও ইনফ্যাচিউয়েশন। যে ভালবাসা আমি নিজে পরিচালিত করি আপন মেধা মনন অনুভবে, পৃথিবীর কারও শক্তি নেই তাকে অশক্ত করার। দুর্বল করার। কোনো নামকরণে সে ভেঙে পড়ে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নিজের কারণ তৈরি হয় তা ভেঙে পড়ার।

ধরে নিলাম, মানুষটি বিবাহিত নয়। একেবারে আনকোরা ‘ব্যাচেলর’। কোনো ঝুট ঝামেলা নাইক্যা। প্রেমে পড়লে তুমি। সেও। রাতভর গল্প। দিনভর কথা। এখন প্রশ্ন, তুমি কি এ ভালবাসার জন্য কোনো ডকু ফিল্ম করে রাখবে? একদিন ছেলেটি বা মেয়েটি বললো, আমার আর এ সম্পর্ক ভালো লাগছে না। এটি ধরে রাখার ইচ্ছে পোষণ করছি না। তখন তুমি মেনে নেবে, নাকি তোমার ডকু সাবমিট করবে সালিশ ডেকে? ‘যে, এই দেখো সব প্রমাণ, তুমি আমার সাথে প্রেম করেছো। পাপ করেছো।’

কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সম্পর্ককে তুমি পাপাচার বলে নিজেকে ‘ভিক্টিম’ রোলে নিজেকে এলাও করতে পারো না যদি তুমি স্ট্রং পারসোনালিটি হও! আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন হও। চরিত্র দৃঢ়তায়। যুক্তিতে। শক্তিতে। চরিত্রের কর্ম অন্য কোনো জায়গায় নাই।

তথ্য উপাত্ত প্রমাণের ঘটনা অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে ঘটে না, সেটি নয়। ঘটে, ঘটেছে। কেউ কেউ অন্তরঙ্গ মুহূর্ত ভিডিও করে নেটে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাও দেয়। আমার ছোট্ট বিচারক জীবনেও আমি এ ধরনের কেইস কোর্টে পেয়েছি। এসব ক্ষেত্রে একটি ‘ইল উইল’ থাকে। অর্থাৎ ছেলে বা মেয়েকে জিম্মি করে বা ব্ল্যাকমেইল করে কিছু পেতে চায়। টাকা বা অন্যকিছু। সেখানে আর যাই থাকুক, ভালবাসা থাকে না। এমনকি শাস্তি হিসেবে বিয়ে পর্যন্ত দাবি করে কেউ কেউ কিন্তু। বিয়ে কিন্তু ভালবাসাহীন বিয়ে।

তাহলে বিষয়টির জটিলতা অন্যখানে। ‘বিবাহিত’ মানুষের ক্ষেত্রে ভালবাসা অন্যরকম হয়ে যায় না। তার বৈবাহিক সম্পর্কর মর‍্যাল কেক আলাদা টপিক। আমি কথা বলছি ‘ভালবাসা’ বিষয়ে। ভালবাসা কোনদিন কোনো কারণে অপরাধ নয়, যদি তা সম্মতির সাথে হয়। এখন বিবাহিত জনটি যদি বলে, ভালবাসা ফুরিয়েছে, তার ক্ষেত্রে সাক্ষী সাবুদ হাজিরের দরকারটি এটাই সাক্ষী দেয়, বিবাহিতের ভালবাসাটি তুমি নিজেই ‘অপরাধ’ জ্ঞানে করেছো। পরাজয়টি সেখানেই ঘটে যায়।

অর্থাৎ অবিবাহিতের ক্ষেত্রে যা, বিবাহিতের ক্ষেত্রে আলাদা তুমি নিজেই অনুভব করছো। বিবাহিতটি যখন পিঠটান দিচ্ছে, তখন তুমি বলছো, ‘চিনে রাখো এই বিবাহিত প্রতারককে!’ কেন? কোন যুক্তিতে? ভালবাসা যদি হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়, তাহলে সে হৃদয় কি ‘বিবাহিত’ ও ‘অবিবাহিত’ ক্ষেত্রে আলাদা?

তাহলে দাঁড়াচ্ছে, তুমি নিজেও ‘মূল্যবোধ’ আরোপ করছো, ‘তুমি বিবাহিত, তোমার ভালবাসা অনুচিত।’ অথবা তুমি একটি অলীক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছো, ‘সে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে আমাকে বিয়ে করবে’ তাহলে সব শুদ্ধ-সিদ্ধ হয়ে গেল।

কী নিদারুণ রুগ্ন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ভালবাসা ভালবাসা খেলছো! ভালবাসা কি চুক্তি? তাহলে তুমি ভালবাসা নয়, সেই চুক্তিকে ভালবেসে এগিয়েছো। ভালবাসার অপমান হয়েছে তাতে। কারণ চুক্তি আর ভালবাসা এক নয়। চুক্তি করে ভালবাসা হলে আমার কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু তাহলে তাকে চুক্তিভঙ্গের জন্য স্যু করো। ভালবাসার জন্য নয়। কারণ ভালবাসায় প্রবেশ করলে তোমাকে জানতে হবে, যে কোনো পক্ষ ভালবাসা থেকে মুক্ত হবার অধিকার রাখে। প্রত্যেকটি ভালবাসায় এটি অন্তর্গত। কেউ কাউকে সারাজীবন ভালবাসতে বাধ্য করতে পারে না। আর না পারলে তাকে অপরাধী বা অনৈতিক বলা যাবে না। যদি বলো তাহলে বলবো, তুমি তাহলে সামাজিক নর্মের দাস নিজেই। সেই দাস হয়ে পাইওনিয়ার হওয়া অসম্ভব। এখানে তুমি সেই পুরনো প্রথারই একজন। সেই প্রথা মানো পুরোপুরি। সেজন্য চাইছো, বিবাহিত মানুষটির শাস্তি হওয়া উচিত। এককালীন ভালবাসার মানুষটির শাস্তি তুমি চাইছো না।

এভাবেই আমরা অস্পষ্টতার ভেতর নিজেদের সঁপে দেই।

ভালবেসে তোমরা ভুল করোনি। যে কটা দিনই হোক, যদি ভালবাসা তোমার কাছে ভালো লেগে থাকে, তাকে উপভোগ করো। যদি ভালো অনুভব করে থাকো সে কটা দিনের কাছে ভালো থাকো। যদি সে বলে ‘এখন বিদায়’ বলবে, থ্যাঙ্কস বস! সি ইয়ু! থ্যাংক্স ফর দ্য কফি!

কিন্তু ‘বিবাহিত’ ‘অবিবাহিত’ ‘পরকীয়া’ ‘শুদ্ধ’ বিশুদ্ধ’ সিদ্ধ ‘অসিদ্ধ’ নামকরণ করে ভালবাসার অসম্মান করো না।
ভালবাসা কেবল তখনই মন্দ যখন তুমি সে ভালবাসায় মন্দ থাকো। নতুবা পৃথিবীর কোন ভালবাসাকে মন্দ বলার রাইট কারও নেই! রিমেম্বার দ্যাট বন্ধু!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.