প্রসঙ্গ: মজাদার চুকচুকে ‘পরকীয়া’

শেখ তাসলিমা মুন:

ঘটেছে আবার ঘটেছে। ঢোল ঢোল ঢোল। জানো, কী ঘটেছে? প্রেম করেছে। কী প্রেম গো? অবৈধ প্রেম! ওমা তাই নাকি? কী বলো? ছি: ছি: ছি:। মুখে ঝামা ঘষে দাও। বুড়ো হাবড়ার রস দেখো। মেয়েটাও কম কী? জানতো না ব্যাটার বউ আছে? ফিডার খায় তাই না? নির্লজ্জা। বাপের বয়সী মিনসে। বেচারা বউ। ঘর সংসার আগলে রাখে। বাচ্চা-কাচ্চা আগলায় রাখে। আর ব্যাটা বাইরে মজা লুটে!

প্রসঙ্গ: মজাদার চুকচুকে ‘পরকীয়া’!

আমাকে ফেসবুকে ব্যান করা হয়েছে আজ ২৫ দিন। দণ্ডকাল পার হতে লাগবে আরও দু সপ্তাহ। ফেসবুকে আমি কিছু লিখতে না পারলেও দেখতে পারি। যেহেতু নিজে লিখতে পারি না, তাই যাই না খুব একটা। দুপুরের পরে অফিসের কাজে টায়ার্ড হয়ে যাওয়ায় একটু খুলে ছিলাম। বাপরে, পরকীয়ার ভূমিকম্প বয়ে যাচ্ছে সেখানে। যেকোনো সময় ফেসবুক সাঁকো পরকীয়া ঝাঁকুনিতে ভেঙে পড়বে।

একজন ফেসবুক সেলিব্রিটি, নারীবাদী পুরুষ লেখক, ৫৭ ধারায় গ্রেফতারের হুমকি নিয়ে সর্বজনের মুখে ফেরা আইনজীবীর ‘পরকীয়া’র বেফাঁস কথোপকথন তাঁর প্রেমিকা ফেসবুকে প্রকাশ করে দিয়েছে। ব্যাপক আলোচনা। আবার এক মুখরোচক ক্ষুধাবৃদ্ধিকর উপাদেয় টপিক। ‘পরকীয়া’। দণ্ড, বিচার, ঔচিত্য-অনৌচিত্যবোধ নৈতিকতা, অনৈতিকটা, মূল্যবোধ। দ্বেষ, উপদেশ, বাণী, অমৃত, কত কী!

বিবাহ- আহা স্যাক্রেট ম্যারেজ!

সেই তো একই খেলার মাঠ! মুখ থুবড়ে পড়া। ঠেলাঠেলি। ধাক্কাধাক্কি। কার দোষ বেশী, কার পাপ বেশী। কে ভিলেন, কে ডাইনি। কে ভিক্টিম। কে আদর্শবতী।

কিন্তু ফিল্ডটির ফাউন্ডেশনে একটা ফাটল আছে, সেটা নিয়ে ভাবার তেমন আগ্রহ কারও নেই।

বিবাহ। প্রেম। যৌন-সম্পর্ক। বিষয়গুলো ভিন্ন ভিন্ন বিষয়, সেটি রিয়ালাইজ এবং স্বীকার করতে মানুষের বিশেষ করে শিক্ষিত মানুষের এতো ভনিতা কেন, আমি বুঝে উঠতে সক্ষম হইনি আজও। এটা কি মানুষের মিথ্যে নিয়ে জীবন যাপন করার পুরনো অভ্যেস? সত্যকে মোকাবেলা করার যথেষ্ট সততার অভাব? ইনসাইটের অভাব? প্রিটেনশনের সাথে বসবাস করতে করতে সত্য উৎঘাটনের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে? নাকি অন্যকে জাজ করা, সমাজের মাথা, গাছ হওয়ার আরেক ভান করার নেশা।

‘তুমি কচি খুকি?’ ‘আরে ব্যাটা বুড়ো হাবড়া তোর ঘরে বউ নাই?’। বাহ বেশ কিছুদিন জবর কাটার খড় জুটে গেছে। কাটি জবর!

খৃষ্টীয় বিবাহগুলোতে একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে একজন প্রিস্টের সামনে প্রতিশ্রুতি দেয়। সারা জীবন ফেইথফুল থাকবে, রোগ ও নীরোগে। এই প্রতিশ্রুতি শুনলেই আমার কানের ভেতর ঘূর্ণি জল ঢুকে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’। ভাইরে, কোনো সম্পর্ক কি প্রতিশ্রুতি দিয়ে হয়? সম্পর্ক আছে কি নাই, সে খবর আগে জানে মন। মনে নাই ভালবাসা। মনে নাই প্রেম-শ্রদ্ধা, একসাথে জীবন কাটানোর খোরাক ‘আমি প্রতিশ্রুতি আবদ্ধ’! এই বাধ্যবাধকতায় কয় মাঘ যায়রে ভাই-বইন?

মুসলিম বিবাহ কাবিন দেনমোহরের এসবের উল্লেখ নাইবা করলাম। হিন্দু ধর্ম তো একেবারে হোমাগ্নি চান-সুরুয মন্ত্র-জালে আবদ্ধ। ‘তুমি যাইবা কেমনে, তুমি যাইবা কুনহানে?…ধরা পইড়া গেছ মানুষ বিবাহ জালে!।

তো, জাল কেটে মাছগুলান বাইরাইয়া যায় ক্যানরে মানুষ? সমুস্যাডা কই? ভাবতে শুরু করেন, চাপাইয়া দিয়া সম্পর্ক টেঁকে না। কন্ট্রাক্ট হয়ই কন্ট্রাক্ট ভাঙার জন্য। বিবাহ অব কনভিনিয়েন্সরে কইয়েন না প্রেম। একখান ঘরে থাহি। এক খাটে ঘুমাইয়া বাচ্চা পাড়ি। এক টেবিলে খাই, এক টয়লেটে হাগি। এক আলমারিতে জামা কাপড় রাখি। আমার পারফিউমের পাশে থাকে তার আফটার শেইভ। এক টুথপেস্ট, দুটো ব্রাশ। আহা! আহারে বিবাহ! বুক ছিঁড়ে যায়। পরান ছিঁড়ে যায় সেগুলো আলাদা করতে।

তবু আফটার শেইভের পাশ থেকে পারফিউম সরিয়ে নিতে হয়। ব্রাশ একটি হয়ে যায়। দুটো তোয়ালে একটি হয়ে ঝুলতে থাকে। ওহ! সংসার! ঐ যে রোজ ধুয়ে রাখা টি-কাপ। তার জন্য একটি , আমার একটি। ওরা আলাদা হয়ে যায়। বুকের ভেতর রক্তের নালি। প্রেম কি তবে এটা? নাকি অভ্যেস? অভ্যেস ভঙ্গের কষ্ট কি প্রেম?

যে হাতে চায়ের কাপ। মুখস্ত স্বাদ। ঠিকঠাক। একটুও বেশকম নেই। গরু ভুনা, হাঁসের মাংস। প্রেসারের ওষুধ কোথায় থাকে, কেবল সে জানে। তবু রাতে ক্লান্ত শরীর আগের মতো মেতে ওঠে না। অন্য কোনো নারীর কথা ভাবতে ভালো লাগে। শরীরটা জাগে।

উইকেন্ডে অফিসের ‘বিশেষ কনফারেন্স’ পড়ে যায়। পেছন পড়ে থাকে শান্তির নীড়। সেখানে ঘুমুচ্ছে সন্তান। বউ ক্লান্ত শরীরে জেগে কাজ করছে। সকালে বুয়া দারোয়ানের বেতন, কাঁচাবাজার, বাচ্চাদের কোচিং সেন্টার, শ্বশুর শাশুড়ির খোঁজ নেওয়া।

ওদিকে একটি সাদা গাড়ি ছুটে চলেছে জঙ্গলের ধার ঘেঁষে। ‘অফিসের কনফারেন্স’। পাশে বসা এক জমজমাট তরুণী। গাঢ় নীল রঙের শাড়ী আর কবিতার বই মিলিয়ে দিনটা অপূর্ব। না না এতে পাপ নেই। কে বলেছে অন্যায়? কে আবিষ্কার করেছে এসব ন্যায় অন্যায় ভাবনা? এইতো ছুটে চলা। এইতো জীবন! এইতো জীবন!

মায়ের স্ট্রোক। সাদা গাড়ি ছুটে চলেছে। গ্রামের পানে। প্রেমিকা ফোন করে পাচ্ছে না। প্রেমিকার সাথে আজ দেখা করার কথা। সে ফোনের পর ফোন দিয়ে যাচ্ছে। কোনো নিরিবিলি পাওয়া যাচ্ছে না ফোন ধরার। একটু নিরিবিলি। ‘এই শোন। মা স্ট্রোক করেছে। আমরা গ্রামের পথে, গাড়িতে। কদিন যোগাযোগ হবে না।’

– সাথে কি তোমার বউ?

– হ্যাঁ।

– অথচ তুমি বলেছিলে, তার সাথে তোমার কথাই হয় না। সব সম্পর্ক চুকে গেছে। কেবল এক বাড়িতে বাধ্য হয়ে থাকা।

– দেখো, এটি একটি স্পেশাল সিচুয়েশন। মা মারা যাচ্ছে। সে পুত্রবধু। না গিয়ে উপায় নেই।

– হ্যাঁ ‘পুত্রবধু!’

পুত্রবধু। পুত্রবধু। পুত্রবধু।

আর সে? সে কে? ভালবাসা?

বউয়ের সাথে সে এখন চলছে একই গাড়িতে। সেই একই গাড়ি। তারা দুজন ছুটেছিল অবকাশে। সেখানে এখন তার মায়ের পুত্রবধু। নাতি-নাতনি।

মনের ভেতরটা গর্জে ওঠে। গর্জে ওঠে। সে প্রতারিত। প্রতারিত। ব্যবহৃত। সে পরাজিত।

একটি ‘পরকীয়া’ ডিজাইন। বউ জেতে সংসারের স্বার্থে। প্রেমিকা জেতে তখন, যখন বুকের ভেতর প্রেম খুঁড়ে। তখন বউ হারে। পুরুষতান্ত্রিক প্রথায় এ ডিজাইনটা খুব কমন ডিজাইন, প্যাটার্ন। যেখানে ঘুরে ফিরে নারীই ভিক্টিম। পালাক্রমে। পুরুষের সুবিধেয় বউ জেতে, পুরুষের সুবিধেয় প্রেমিকা জেতে। ‘পরকীয়া’ ডুবসাঁতারে খেলে যায় খেলারাম হয়ে।

প্রশ্ন, যে সমাজে নারী ও পুরুষের সম্পর্কে ভারসাম্য রয়েছে, সেখানেও কি প্রতিশ্রুতিগুলো তাজা গোলাপ হয়ে দোল দোল খেলে? না। প্রেম শুকিয়ে যায়। প্রেম নিঃশেষ হয়ে যায়। সেটি অপরাধও নয়। অপরাধ হলো, সেটির সমাধান করতে না পারা। একটি ভুল সাথে নিয়ে হাজারটা ভুল করে যাওয়া। পাশ্চাত্যে বিচ্ছেদের সংখ্যা বেশি হলেও তারা সৎ জীবন যাপন করতে সক্ষম। তারা সত্যকে মোকাবেলা করতে সক্ষম। তারা বিষয়ের সুরাহা করতে সক্ষম। তারা বিচ্ছেদকে হ্যান্ডল করতে সক্ষম। তারা বন্ধুর মতো সমস্যাটা নিয়ে কথা বলতে সক্ষম। পার্থক্যটা এখানে। সৎ জীবন ও অসৎ জীবন।

সময় এসেছে রিয়ালাইজ করার, উচিত অনুচিত আর ধর্ম কথা শুনিয়ে মানুষকে এগুলো থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। তাদের মর‍্যাল উৎকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। মানুষের সততা ভেঙে পড়ছে। মানুষের এক একটি অংশ এক এক কাজ করছে, যার কোনটার সাথে কোনটার যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।

আর ঠিক তখন সমাজের মানুষ বসছে ন্যায়-অন্যায়ের ঝাঁপি নিয়ে। কী উচিত ছিল। কী উচিত হয় নাই। চুলচেরা বিচার চলছে। সমালোচনা, আলোচনা, মুখরোচক চাটনি চাটা চলতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজে বা তার কাছের কেউ এ পরিস্থিতির শিকার না হচ্ছে।

মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত সৎ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এসব চলতেই থাকবে। লুকোচুরি, ধরা পড়া, কুৎসা, ছবক, লেসন, বাণী, উপদেশ, গলাবাজি।

সমস্যাটার গোঁড়া খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এগুলো চলতেই থাকবে।

শেয়ার করুন:
  • 691
  •  
  •  
  •  
  •  
    691
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.