আপনার টিনএজ সন্তানের খবর রাখছেন তো!

0

সুরমা রহমান:

বাবা-মা হিসেবে একটা সন্তান জন্ম থেকে পূর্ণ বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তার দেখাশোনার দায়িত্ব আপনার। একটা বাচ্চার কিশোর বয়সটা খুবই সেনসেটিভ। এ বয়সে সে যেকোনো কিছু করে বসতে পারে। তাই আপনার কাজ হচ্ছে সন্তানের প্রতিটা মুভমেন্ট নজরদারি করা। সে কোথায় গেল, সে যাদের সাথে বন্ধুত্ব করছে তারা কেমন, তার চলাফেরা কেমন, তার স্কুল কখন শুরু, কখন শেষ, অন টাইমে স্কুলে যাওয়া আসা করছে তো! ইত্যাদি।

কিশোর বয়সে বাচ্চাদের যথেষ্ট সময় দেয়া প্রয়োজন। Psychiatric Daniel Siegel এর মতে, “it’s time to rethink adolescence as a time of great opportunity, as well as a challenge.”

Dr.Daniel তার ‘Brainstorm’ নামক বই এ উল্লেখ করেন যে, একটা মানুষের পরিবর্তন শুরু হয় ১৩ বছর বয়স থেকে এবং তা কার্যকর থাকে ২৪ বছর বয়স পর্য়ন্ত। এর পরে সবার মাঝেই একটা স্থিরতা কাজ করে। এ সময়টাতে ছেলেমেয়েরা তাদের নিজস্ব গণ্ডি থেকে বের হয়ে বৃহৎ পরিসরের মাঝে তাদের দেখতে চায়। নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করতে, নিজেকে যাচাই করে দেখতে চায় তারা। সুতরাং এ সময়টাতে কিশোরদের বুঝতে শিখুন। এদের শাসন করুন ভালবাসার মধ্য দিয়ে। তাদের প্রতিটা ইমোশনের উত্তর দিন আপনি পজিটিভভাবে।

Teenagers Are ‘Crazy’ But Expert Says, “Behaviour Is Vital To Development”. কিশোর বয়সটায় আপনার সন্তান উৎশৃঙ্খল থাকবে, আপনার শাসনগুলোকে উপেক্ষা করবে, আপনার আড়ালে আপনার অপছন্দনীয়, কিন্তু তার পছন্দনীয় কাজ করবে। কিন্তু ঐ সময়টাতে আপনি তাকে পর্যাপ্ত সময় দিলে, তার দিকে ভালবাসার হাত বাড়ালে, তার বিশ্বস্ততা অর্জন করলে সে আর বাইরে যাবে না তার সংগী খুঁজতে, কিংবা আপনাকে আড়াল করবে না ভাল/মন্দ যে কাজগুলো সে করছে সেগুলো।

কয়েকদিন আগেই পত্রিকায় পড়লাম, ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়ায় জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযান চালানোর সময় মো. নাফিস উল ইসলাম নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়, যার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। মর্গে লাশ দেখে নাফিসকে শনাক্ত করেন তার বাবা নজরুল ইসলাম। তার বাবা বলেন, সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় লকার থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে বের হয়। নাফিস তিন মাস ধরে নিখোঁজ ছিল। একটা অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে তিন মাস ধরে উধাও? এ ঘটনায় তার বাবা চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। জিডি করার পরে পুলিশ নাফিসকে খুঁজতে গিয়ে জানতে পারে সে নব্য জেএমবিতে জড়িয়ে পড়েছে। সংগঠনে তার নাম পরিবর্তন করে আবদুল্লাহ রাখা হয়।

দেশের বিভিন্ন স্কুলে শুরু হয়ে গেছে রাজনীতি। চট্টগ্রাম নগরীর কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফার, বয়স মাত্র ১৫ বছর। সে নাকি আবার তার স্কুলের বড় নেতাও ছিল। অপরপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হয় আদনান ইসফার।
তার নাকি আবার একঝাঁক সহপাঠিও ছিল যারা তার কর্মী হিসেবে কাজ করতো।

কথা হচ্ছে, আদনান ইসফার খাগড়াছড়ি জেলায় স্থানীয় সরকার বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী আখতারুল আজমের বড় ছেলে। তার মানে যতদূর বুঝলাম পরিবারের সদস্যরা সচেতনই হবার কথা। কারণ আর যাই হোক, বাবা একজন প্রকৌশলী যখন, তখন তো অন্তত ছেলের মন বোঝার যথেষ্ট যোগ্যতা তিনি রাখেন। অথচ ছেলে যে রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে, তা নাকি ওনার জানাই ছিল না।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের আরেকটা ঘটনা শুনলাম, স্কুলের অধ্যক্ষকে রিভলবার দিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে একই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির এক ছাত্র। বয়স কত হবে? ১৫/১৬ কিংবা ১৭ বছর? ভারতে হরিয়ানার যমুনানগর এলাকার স্বামী বিবেকানন্দ পাবলিক স্কুলে এই ঘটনা ঘটে। তারই কৃত অপকর্মের জন্য তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। আর এর জের ধরে সে এ ঘটনা ঘটায়। ভাবতেই তো ভয় লাগে। কিশোরের হাতে রিভলবার?

তাদের এই সময়টা ওরা একটু ক্রেজি থাকবে, নিজেদেরই সব সময় সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করবে। আপনাকে তখন হতে হবে খুবই শান্ত, ধীর এবং স্থির মনের অধিকারী। অন্তত তার এ সময়টা পার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়াটা বা তাকে আয়ত্তে রাখা অনেক চ্যালেঞ্জের হলেও আপনাকে তা করতে হবে। ‘Raging hormone’ নামে একটা Hormone আছে মানব শরীরে, যা কিশোরদের আচরণ পরিবর্তনে সাহায্য করে। এই হরমোন যখন বেড়ে যায়, এর প্রভাবে এরা সহজভাবে কিছু চিন্তা করতে পারে না, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে।

তাদের এসব উচ্ছৃঙ্খলতা, একগুয়েমি দূর করতে, তাদের মাঝে সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। এবং সেক্ষেত্রে আপনাকে অনেক সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তার প্রতিটা মুভমেন্টে। আপনার একটু গাফিলতির কারণে সে ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসতে পারে। জড়িয়ে পড়তে পারে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ জগতের সাথে।

তাকে শেখাতে হবে মেয়েদের/বড়দের সাথে তার সম্মান করে কথা বলতে, ছোটদের প্রতি দায়িত্বশীল/যত্নশীল হতে। কোনো মেয়েকে যে কোনো ধরনের প্রস্তাব করার আগে তার মাইন্ডে থাকতে হবে মেয়ে যদি হ্যাঁ বলে, তবেই তা হ্যাঁ, আর না বললে না। হোক সে বন্ধুত্বের সম্পর্ক কিংবা অন্য যে কোনো সম্পর্ক। কারণ আপনার এখনের দেয়া শিক্ষাটাই তার ব্রেইনে থাকবে সারা জীবন। ভবিষ্যতে সমাজে নারী নির্যাতন বা সব ধরনের অপরাধপ্রবণতা কমাতে হলে আপনাকে এখনই সজাগ হতে হবে।

আপনার ব্যবহার্য কৌশলের উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে আপনার সন্তানের আচরণ কেমন হবে। অন্যের/ সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধাবোধ এবং কর্তব্য কেমন হবে।

Surma Rahman
Teacher, London

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 503
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    503
    Shares

লেখাটি ১,৫৫৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.