মোনায়েম খানের উত্তরসূরিদের দায়িত্ব কেন নিতে হবে!

শাশ্বতী বিপ্লব:

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জানি সব বিষয়ে আপনার পক্ষে নজরদারি করা সম্ভব না। তবুও আবার আপনাকেই লিখতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো ঘটনায় আমাদের সেই ডুবন্ত মানুষটির মতো অবস্থা হয়, যাদের শেষ খড়কুটো হিসেবে আপনাকেই আঁকড়ে ধরা ছাড়া উপায় থাকে না।

কামাল হোসেন নামের পুরাণ ঢাকার আরমানিটোলার এক যুবককে আপনার মনে পড়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? সে ছিল আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির সহ সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু স্মৃতি চর্চা কেন্দ্রের শিক্ষা ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক কামাল হোসেন। সে ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছিলো “অগ্নিবার্তা” বইটি। আবার ১৯৯৭ সালের আগস্টে লিখেছিলো, “রাসেলের আর্তনাদ”। আপনাকে দিতে গিয়েছিলো সেই বই, আপনি নিয়েছিলেনও। সেই ছবি বাঁধানো আছে এখনো ফ্রেমে। কিন্তু সেই কামাল হোসেন আর নেই।

এই কামালকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল কুখ্যাত মোনায়েম খানের মেয়ে জামাই এবং যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর চাচা শ্বশুর জাহাঙ্গীর আদেলের ছেলেরা। ২০০০ সালের ১৪ আগস্ট, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে বাড়ির ছাদে পাকিস্তানের পতাকা উড়ানোর ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলো জাহাঙ্গীর আদেল পরিবার। এই ধৃষ্টতার প্রতিবাদ করেছিলো কামাল। ব্যানার হাতে মিছিল করেছিলো। যে ব্যানারে লেখা ছিলো, “স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে জাহাঙ্গীর আদেলের বাসায় পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে কেন, প্রশাসন জবাব চাই।” আর সেই প্রতিবাদই কাল হয়েছিলো কামালের। পরদিন ১৫ আগস্ট এর কাঙ্গালি ভোজ শেষ করে বাড়ি ফেরার আগ মুহূর্তে আদেল পরিবার খোলা রাজপথে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে গুলি চালায় কামালের উপর। বুকে ৮টি গুলি নিয়ে মারা যায় কামাল।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট এভাবেই বুকে ঘাতকের গুলি নিয়ে মারা গিয়েছিলেন এক কামাল, আর ২০০০ এর ১৫ আগস্টে মারা গেলেন আরেক কামাল। কী আশ্চর্য, তাইনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

বড় ভাই কামাল হোসেন বুকে আটটি গুলি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলো ছোটভাই নাজির হোসেনের কাছে। কামাল হোসেন মারা যেতে যেতে বলেছিলো, ‘নাজির তুই পালায়া যা’। না, সেই ছোটভাই নাজির পালায়নি। বড় ভাইয়ের স্মৃতি একজোড়া জুতা বুকে চেপে হত্যার বিচার চাইছে ১৮ বছর ধরে। ছুটে বেড়িয়েছে আদালতপাড়া। মামলার খরচ যোগাতে গিয়ে বেঁচে দিতে হয়েছে পুরাণ ঢাকার দুটো বাড়ি। তবুও ন্যায়বিচার মেলেনি। চোখের সামনে ভাইকে গুলি করতে দেখা খুনিরা পেয়েছে বেকসুর খালাস। যদিও সিআইডির ব্যালিস্টিক রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা আছে, জাহাঙ্গীর আদেলের লাইসেন্স করা বন্দুকের বাম ব্যারেলের গুলিতেই মারা গেছেন কামাল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেই কুখ্যাত আদেল পরিবারের দুই সহোদর সাজেক আদেল ও তারেক আদেল, যারা সরাসরি কামাল হোসেনের উপর গুলি চালিয়েছিলো, তাদের মনোনীত করা হয়েছে হকি ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটিতে। আর এই মনোনয়ন কে দিয়েছেন তা জানা আপনার জন্য খুব কঠিন কাজ না, কাগজপত্র তলব করলেই পেয়ে যাবেন। জেনে যাবেন, তার পারিবারিক পরিচয় ও আপনার দলে তার অবস্থান।

প্রথমে কথাগুলো আমারও বিশ্বাস হয়নি কথাটা, ভেবেছিলাম ভুল শুনেছি। কিন্তু আমি ভুল শুনিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের আমলে, সেই দলের একজন প্রভাবশালী প্রতিনিধি এই স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা করছেন! এই দুঃখ, এই হতাশা আমরা কোথায় রাখবো?

আদেল পরিবারের সেই ধৃষ্টতা কোনো লুকানো ঘটনা নয়, ছাপা হয়েছিলো প্রায় প্রতিটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়। তারপরও কেমন করে তারা আওয়ামী লীগের সমর্থন পেতে পারে? যখন এইদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়, তখন কীভাবে রাজাকারের বংশ পুনর্বাসিত হয়? আমরা এই সিদ্ধান্তের, এই পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

বেসরকারি একটি টিভিতে নাজির হোসেনের আর্তনাদ প্রচারিত হয়েছে। উঠে এসেছে ঘটনার নানাদিক, যা আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস। বিষয়টি প্রতিকার করুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

নাজির হোসেনের বক্তব্য:
“প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করছি, আমাদের একটু সহযোগিতা করেন। আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পরিবার। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। আমাদের কি এই অপরাধ? আমাদের কেউ খবর নেয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের লোক যদি তাদেরকে বড় বড় প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত করে, আমার ভাইয়ের আত্মার কষ্ট হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমি আপনার কাছে বিচার চাই।

রাষ্ট্রের জন্য যদি আমার ভাই জীবন দেয়, আমরা যদি পুরাণ ঢাকার দুইটা বাড়ি বিক্রি করে মামলা চালাই, রাষ্ট্রের কি সম্মান নাই? এখন রাষ্ট্র কি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা, কামাল হত্যার মামলা পরিচালনা করতে পারে না?”

(লেখাটি চ্যানেল আই অনলাইন থেকে অনুমতিক্রমে নেয়া হয়েছে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.