ধর্মীয় শিক্ষা কেন বাধ্যতামূলক হবে?

0

সুষুপ্ত পাঠক:

মানেকা গান্ধী চালাকি করে হিন্দুদের একাডেমিকভাবে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে চাইছেন। হিন্দুরা এতকাল ধর্মীয়ভাবে সহিষ্ণু উদার এবং স্বধর্মীয় বিষয়ে উদাসীন ছিলো। এরকম ছিলো বলেই ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ হবার পরও তারা সাংবিধানিকভাবে সেক্যুলার এবং ভারত স্বাধীন হবার পর অহিন্দু নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যেটা উপমহাদেশের পাকিস্তান বাংলাদেশের থেকে ভিন্ন চিত্র ছিলো।

কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা তাদের রাজনীতির স্বার্থে হিন্দুদের ধর্মের আফিন খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। ফলও মিলছে হাতে-নাতে। হিন্দুরা ধর্মীয়ভাবে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। খ্রিস্টান বৌদ্ধ ইহুদীরা তাদের ধর্ম থেকে দূরে সরে এসেছিলো বলেই ঐ সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠদের দেশগুলো মানবিক সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক হতে পেরেছে। চিন্তা প্রগতির খোলা জানালা দিয়ে তারা বিশ্ব মানবতার দিকে হাত বাড়াতে পেরেছে।

মানেকা গান্ধী ভারতের শিশুদের কুরআন বাইবেল গীতা স্কুলে পাঠদানের সুপারিশ করেছেন। এসব পাঠ না করার কারণেই নাকি অন্য ধর্মের প্রতি সন্মান করতে শিখছে না। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে এই বইগুলোর কারণেই পৃথিবীতে মানুষ নানা রকম ধর্মীয় পরিচয়ে আটকে পড়ছে- মানুষ হতে পারছে না। খ্রিস্টানদের বাইবেল ইহুদীদের চিরকালিন দুষমন, যীশুর হত্যাকারী হিসেবে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কুরআন সরাসরি ইহুদী খ্রিস্টান হিন্দু বৌদ্ধদের (পৌত্তলিক) বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই চালিয়ে যাবার ওয়াদা আদায় করে নিয়েছে।

শ্রেণী কক্ষে এসব পাঠদান কি করে ভারতীয় শিশুদের অন্যের ধর্ম সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল করে তুলবে? আঠারো শতকে কোলকাতার রেঁনেসার নায়ক বিদ্যাসাগর শাস্ত্রীয় শিক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় বলে পাশ্চত্যের আধুনিক দর্শন শিক্ষাদানের তাগিদ দিয়েছিলেন। হিন্দু কলেজে সেটাই পাঠদানের ব্যবস্থা হয়েছিলো। অপরদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ একইভাবে মুসলিমদের আধুনিক পাশ্চত্য শিক্ষাদানের লক্ষ্যে গঠন করেন আলীয়া মাদ্রাসা। আঠারো শতকে ধর্মীয় শিক্ষাকে অগ্রাহ্য করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ বস্তুবাদী শিক্ষা যেখানে অবিভক্ত ভারতীয়দের এগিয়ে দিয়েছিলো, সেটাই একুশ শতকে এসে ফের শিক্ষাকে ধর্মাশ্রয়ী করার নানা ফন্দিফিকির সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে না, পিছিয়ে নিবে।

মানেকা গান্ধী একটা কথা বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে কয়জন নিজ নিজ ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েছেন? আমি কোরআন পড়েছি। আপনারা কতজন জানেন যে মুহাম্মদ (সা.) যুদ্ধ-বিরোধী’? তার কথার উত্তরে বলতে হয় আমাদের সৌভাগ্য যে পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ ধর্মীয় গ্রন্থগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করে না তাই এখন পর্যন্ত মানব সভ্যতা টিকে আছে। মুহাম্মদ যুদ্ধ বিরোধী ছিলেন এটা বিশ্বাস করাতে হলে যথা সম্ভব কুরআনকে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। ধর্ম কাউকে ঘৃণা করতে শেখায় না- এরকম মিথ্যাকে সাধারণের কাছে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে ধর্ম শিক্ষা রাষ্ট্রীয়ভাবে বিলুপ্ত করতে হবে। কিন্তু ধর্মালয়ের মোল্লা ফাদার পুরোহিত ঘৃণার ডালি নিয়ে বসে আছে। কুরআন হাদিস তাফসির থেকে বিধর্মীদের কল্লা নামাবার আহ্বান আপনি কিভাবে মুছে ফেলবেন?

ধর্মে ধর্মে মেলবন্ধনের বহু চেষ্টা অতীতে হয়েছিলো যা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলো। কোনো ধর্ম বিশ্বাসীর পক্ষে বিধর্মীর জন্য নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব নয়। কোনো ধর্মের পক্ষেই অপর ধার্মীকদের পথকে স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব নয়, কারণ এতে সে নিজের বিলুপ্তিই ডেকে আনবে।

আপনি একটি শিশুকে তার নিজ ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে অপর ধর্মের মানুষকে ভালোবাসতে শেখাবেন এটি কাঁঠালের আমসত্ত্ব তত্ত্ব। কেমন করে আপনি একটি শিশুকে বেদ থেকে পরধর্ম সহিষ্ণুর শিক্ষা দিবেন যেখানে বেদে লেখা থাকে, ‘যারা তোমাকে পূজার উপহার দেয় না, তাদের প্রত্যেককে হত্যা করো; যাদেরকে বোঝানো কঠিন, যারা তোমাকে তৃপ্ত করে না। ওদের সম্পদ আমাদেরকে দাও’ (ঋগ্বেদ ১:১৬:৪)।

গসপেল পড়ে একটি শিশুকে তারই বয়েসী ইহুদী সহপাঠিকে অপরাধী ভাবতে শেখাবো আমরা? কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত এইসব ধর্মীয় বই ইহুদীদের যীশু হত্যাকারী খুনি হিসেবে ইহুদীদের ঘৃণা করতে আদেশ দিয়েছে। গোটা বিশ্বজুড়ে ধর্ম বিশ্বাসী মুসলমানদের অমুসলমানদের জাহান্নামী অভিশপ্ত ঘৃণিত পতিত হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছে তাদের কুরআন হাদিসের প্রচার।

একজন শিশুকে আমরা কুরআন থেকে কেমন করে মানুষকে ধর্মের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে শেখাবে, যেখানে কুরআন বলে, অতএব যারা কাফের হয়েছে, তাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি (কুরআন:৩:৫৬) দেবো। যারা ইসলামে বিশ্বাস করবে না, আল্লাহ তাদের আগুনের পোশাক পরিয়ে দিবেন। হাতুরি দিয়ে পিটাবেন (কোরান-২২:১৯-২২)। যারা আমার আয়াতে অবিশ্বাস করে তাদের আগুনে দগ্ধ করবোই (কোরান-৪:৫৬)। এসব পড়ে কোনো মুসলমান অন্য ধর্মালম্বী সম্পর্কে সহিষ্ণু হবে? ভালোবাসবে? তার মতই একই মার্যাদার মানুষ ভাবতে পারবে?

কোনো সম্প্রদায়কে ধ্বংস করতে চাইলে তাদের উপর তাদের ধর্মকে পোক্ত করে চাপিয়ে দাও। মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে, আত্মঘাতি সংঘাতে গোটা সভ্যতা শেষ করে দিতে এই ধর্মগ্রন্থগুলো খুবই বড় ভূমিকা রাখছে। সভ্য দুনিয়ার উচিত এই বইগুলোর চর্চা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করা। গায়ের জোরে নয়, কৌশল আর সময়ের নিমিত্তে…।

শেয়ার করুন:
  • 150
  •  
  •  
  •  
  •  
    150
    Shares

লেখাটি ৫৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.