কেন এতো হত্যাকাণ্ড?

অনুপম মাহমুদ:

নবম শ্রেণীর একজন ছাত্রের গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় শ্রেণী শিক্ষক তার স্কুল ব্যাগ দেখতে চাইলেন। পাওয়া গেলো ইয়াবা, শিক্ষক হতভম্ব হয়ে গেলেন। সাথে সাথেই ছাত্রের প্রচ্ছন্ন হুমকি, স্যার যা দেখেছেন ভুলে যান, হেড স্যার পর্যন্ত যাবেন না… শিক্ষক থামলেন না। প্রধান শিক্ষককে জানানো হলো। গুরুতর অন্যায় বিবেচনা করে অভিভাবককে ডেকে পাঠানো হলো, ছাত্রটিকে বহিষ্কার করা হলো স্কুল থেকে। ঘটনা এখানেই শেষ হলে ভালো হতো, কিন্তু না, তা হয় নি। স্কুল শেষে শিক্ষক মহোদয় যখনই রাস্তায় নামলেন তখনই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হলেন। বহিষ্কৃত ছাত্রটি ছুরি নিয়ে আঘাত করলেন শিক্ষককে… ঘটনাটি সত্য। আক্রান্ত ব্যাক্তি আমার শিক্ষক আর আমারই মতোন একজন ছাত্র তাকে রক্তাক্ত করেছে প্রকাশ্যে।

সম্প্রতি চিটাগাং শহরে আদনান নামে একটি স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে প্রকাশ্যে রাজপথে অস্ত্র হাতে। সমবয়সী পাঁচজন গ্রেফতার হয়ে ইতিমধ্যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে আদালতে। খেলার মাঠের দখল ও এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ে এই দ্বন্দের সূত্রপাত্র। অস্ত্র তারা পেয়েছিলো এলাকার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে। খুনের পর আশ্রয় নিয়েছিলো সেখানেই। বছর কয়েক আগে এই শহরেই হিমু নামে আরেকটি ছেলেকে পোষা কুকুর দিয়ে কামড়িয়ে ও ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছিলো তারই বন্ধুরা…

গতকাল খুলনায় মাত্র ১৩ বছরের কিশোর খুলনা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ফাহমিদ তানভীর রাজীম খুন হয়েছে। স্কুলের ৩১ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চের ঠিক পেছনেই। আততায়ীরা তার বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। খালিশপুর থানার ওসি মোশাররফ হোসেন সন্দেহ প্রকাশ করেছেনঃ “মেয়েলি ঘটনার জেরে ধরে হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।” মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেয়েলি ঘটনা নিয়ে হত্যা যদি সত্যি হয়, তবে আমাদের সতর্ক হতে হবে এখনি…

গেলো বছরে উত্তরায় দুই দল কিশোরের মারামারিও হত্যায় গিয়ে ঠেকেছিলো। সদ্য কৈশোর পেরোনো ঐশী এই মুহূর্তে যাবতজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে। তার ফাঁসির রায় হয়েছিলো বাবা মা হত্যার অভিযোগে, কিন্তু ডেথ রেফারেন্সে ও আপিলে তার দন্ড কিছুটা কমিয়ে দেয়া হয়। তবে রায় ও পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিলো। এই হত্যার জন্য বাবা মা পরোক্ষ ভাবে দায় এড়িয়ে যেতে পারেননি যদিও তাদের মৃত্যু হয়েছিলো নিজের সন্তানের হাতেই।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার ওয়ারিতে মধ্যরাতে উচ্চস্বরে গান বাজনার প্রতিবাদ করায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে মৃতের স্বজন। নিহত ভদ্রলোকটি সম্প্রতি হার্টের বাইপাস করিয়েছেন তাই উচ্চ স্বরে গান বাজনায় কষ্ট পাচ্ছিলেন, তাই ছেলে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন। সুউচ্চ ভবনটিতে তখন একটি বিয়ের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান চলছিলো। সকালে এই নিয়ে হট্টগোল, অনুরোধ করতে কেনো ছেলে গিয়েছিলো সেই জন্য তার উপর চড়াও হয় বিয়ে বাড়ির লোকজন। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ বাবাকেই আঘাত করে বসেন বিয়ের পাত্রসহ অভিভাবক। একজন অভভাবক যদি এইভাবে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন সন্তান সমেত, তবে সন্তানেরা বেয়াড়াপনায় জড়িয়ে গেলে দোষ কী?

রাস্তায় প্রায়শ:ই দেখা যায়, বাইক কিংবা প্রাইভেট কারের সাথে সাইলেন্সার পাইপ যুক্ত করে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে অতিরিক্ত গতি নিয়ে ছুটে চলে একদল কিশোর তরুণ। কেন এমনটা করেন তারা আমি জানি না, হয়তো গতির নেশা তাদের পেয়ে বসেছে। তবে পথচারীদের মুখে গালি শুনেছি হরহামেশা, আর সেই গালাগালের তীর যতোটা না বাইক রাইডার কিংবা গাড়ি চালকদের দিকে তার চেয়েও বেশী তাদের বাবা মায়ের দিকে… কোমলমতি সন্তানদের আচার আচরন কেমন হবে তার দায়ভার পিতা মাতার আছে বৈকি। অনেক সময় আমাদের প্রশ্রয়ে সন্তানেরা বিপথেও পা বাড়াতে পারে, একটু ভেবে দেখা দরকার।

সন্তানদের জেদের কাছে আমরা হার মেনে যা চায় অনেক সময় তাই দিয়ে দেই। বিশেষ করে এখন মোবাইল, ট্যাব, গ্যাজেট এর যুগে সবচেয়ে আপডেট ভার্সনই চাই তরুণদের। অবারিত মুক্ত মাধ্যম ও মুক্ত সংস্কৃতির আকাশে উড়তে পাঠানো পাখিরা অনেকে হাঁটতেই শিখে উঠেনি। তাই প্রয়োজন একটু যত্নবান হওয়া। যোগাযোগের জন্য মোবাইল খুব জরুরী নিশ্চিত, কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু এর ব্যবহার ও অপব্যবহার সম্পর্কে আমাদেরই সচেতন হতে হবে আগে।

অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কোনভাবেই কাম্য নয়। কিশোর বয়সের একটু ভুল সারাজীবনের বোঝা হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি নাখালপাড়ার জঙ্গি আস্থানায় তিনটি লাশ পাওয়া গেছে, নিহত একজনের পরিচয় নিশ্চিত হলেও বাকী দুজনের ছবি প্রকাশ করেছে র‍্যাব, যাদের একজন একেবারেই কিশোর।

নগরায়নের ক্রমাগত বিস্তারে ভেঙ্গে গিয়েছে যৌথ পরিবার। বাবা মায়ের ব্যস্ত জীবন সূচীতে সন্তানেরা বড় হচ্ছে একাকী। পাড়া প্রতিবেশী কিংবা মফস্বলের মহল্লা সংস্কৃতি এখন অনুপস্থিত। আমরা সামজিক মানুষেরা সত্যিই জানি না পাশের ফ্ল্যাটে কে আছেন? আর এই কারণেই আনন্দ উল্লাসে কারো বিরক্তি সৃষ্টি হচ্ছে কিনা, তাও জানি না।

আমরা অভিভাবকেরা যদি একটু বেশী সময় দিতে পারি সন্তানদের, তবে তারা হয়তো বিপথে যাবে না, প্রতিবেশীও দুঃখ পাবে না। সমাজে কিছুটা হলেও শান্তি আসবে নেমে, আর আমরাও সন্তানদের জন্য কাঁদবো না। পরম মমতা নিয়ে লাগাম পরাতে হবে তারুণ্যর গলায়, তা না হলে পাগলা ঘোড়ার উন্মত্ততায় বিপন্ন হবে মানবতা ও অনাগত ভবিষ্যৎ…

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.