আমরা নিজেরাও বৈষম্য সৃষ্টি করছি …

0

শাফিনেওয়াজ শিপু:

আমাদের দেশে নারীর উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হচ্ছে ‘বৈষম্য’, সেটি কর্মক্ষেত্রে হোক, কিংবা পরিবারে। হয়তো আজকে নারী হওয়ার কারণেই এই শব্দটি আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যা চাইলেও বিলোপ করা যাচ্ছে না বা এর থেকে মুক্তিরও আপাতত কোনো উপায় দেখছি না।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়াতে আমরা নারীরাই অধিকাংশ সময় বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। কিন্তু বিলেতে আসার পর ধারণা কিছুটা পাল্টে গেছে। আগে ধারণা ছিলো শুধুমাত্র পুরুষদের দ্বারাই আমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি, প্রবাসে আসার পর দেখলাম, নিজেরাও এর পিছনে কম কারণ নই। কেন বলছি এবং কী কারণে বলছি, কিছু কথা শেয়ার করার পর আপনারাও বুঝতে পারবেন।

আমি যেখানে আগে কাজ করতাম সেখানে অনেক বাঙালী নারী কলিগ পেয়েছিলাম। ও তার আগে আরেকটি কথা বলে নিই, সেটি হলো ইংল্যান্ডে ডিপেনডেন্ট ভিসায় যারা আসেন, তারা কিন্তু এইদেশে ফুল টাইম জব করতে পারবেন, সে নারী হোক, কিংবা পুরুষ। এই কথাটি বলার কারণ হলো, আমার কর্মক্ষেত্রে এই রকম অনেক নারী বা স্ত্রী আছেন, যারা এই ভিসায় এসেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যেই অনেকে শুধুমাত্র ভাষাগত ভিন্নতার কারণে এশিয়ান বিশেষ করে বাঙালীদের দ্বারাই নানারকম বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। অথচ তাদের অনেকেই দেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসেছেন। একে তো নিজেরই অক্ষমতা বলবো, তাই না?

আমার এক কলিগ জবে ঢোকার পর দেখতাম, সে প্রায় সময় আপসেট থাকতো। কারণ তিনি কাজগুলো ভালভাবে শিখতে পারছিলেন না, এমনকি কারও সাথে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। তার প্রধান কারণ হলো তিনি ইংরেজি ভাষায় একেবারে দুর্বল। শুধুমাত্র ভাষার কারণে তিনি সবকিছু থেকে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে বললাম, ইংরেজি ভাষার উপর কোর্স করে আপনার জবে ঢোকা উচিত ছিলো, এখানে ইংরেজি ছাড়া উপায় নেই। আর তাছাড়া আপনি তো সপ্তাহে এখন চার দিন কাজ করছেন, সুতরাং সহজে আপনি ভাষা শেখার জন্য সময় বের করতে পারবেন।
এই কথাটি বলার পর তিনি বললেন, এখন আর ভাষা শিখে কোনো লাভ নেই। যেভাবে কাজ করছি, ঐভাবেই কাজ করবো, আর তাছাড়া এখন আর সেই ইচ্ছেটুকুও নেই। তখন আমি বললাম, তাহলে তো আপনার কখনো প্রমোশন বা কর্মক্ষেত্রে উন্নতি হবে না, আর ভাষা না জানার কারণে যখন-তখন অনেক বাজে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। আপনার জায়গায় আমি হলে যেভাবেই হোক সময় বের করে নিতাম ভাষা শেখার জন্য। তবে লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে, একমাত্র ভাষার কারণেই আপনি নিজদেশীদের সাথেই পিছনে পড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দেখুন ইংরেজ কলিগদের দ্বারা কিন্তু বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন না।

ঠিক এই রকম অনেক বাঙালী নারী আছেন এইদেশে, যারা নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখছেন নিজেদের অক্ষমতার কারণেই, এতো সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও। তবে সব নারী কিন্তু এক রকম নয়। আমারই একজন পরিচিত আছেন, যিনি এইদেশে এসেছিলেন অষ্টম শ্রেণী পাস করে, কিন্তু তাঁর কথাবার্তা, কাজকর্ম ও চাল-চলন দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি কোন পরিবেশ থেকে এসেছিলেন। তিনি কিন্তু আমার কলিগের মতো বসে থাকেননি, বরং এইদেশে আসার পর সবার আগে তিনি ইংরেজি ভাষাটি ভালোভাবে শিখে এরপর কর্মে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি খুব ভালো করে জানতেন, এইদেশে থাকতে হলে এইদেশের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে, এবং তিনি আমাকে এটাও বলেছেন, এইখানে কিন্তু অনেক নারী আছেন, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদেরকে বন্দি করে রাখছেন চার দেয়ালের মধ্যে। এইক্ষেত্রে নিশ্চয় পুরুষকে দোষ দেওয়া যাবে না, তাই না।

ওনার কথাগুলো শোনার পর মনে হলো আসলেই তো তাই। সব সময় পুরুষকে দোষারোপ করে তো লাভ নেই, বরং নিজেদের পথ নিজেদেরকেই বের করে নিতে হবে এবং সেইসাথে সকল ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে লক্ষ্য অর্জনের দিকে নিজেদেরকেই এগিয়ে যেতে হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 82
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    82
    Shares

লেখাটি ২২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.