প্রেম ও ঝাড়ু ট্রিটমেন্ট

শান্তা মারিয়া:

হতাশ হয়ে লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। অনেকদিন উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকরা আমার অখাদ্য লেখা পড়ার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। তা প্রশ্ন হতে পারে, হতাশাটা কীসের? লেখার মাধ্যমে জবাবটা আপনা-আপনি পেয়ে যাবেন আশাকরি।

সাংবাদিকতা করি। তাই বিরক্ত হয়ে যে পত্রিকা পড়া বন্ধ করে দিব তার উপায় নেই। চাকরির খাতিরে নিজের এবং আরও দশটা পত্রিকা পড়তেই হয়। এমন একটি দিনও যায় না যেদিন কোনো না কোনো ধর্ষণের খবর ছাপা না হয়। বাড়িতে ঢুকে নারীকে ধর্ষণ করছে দুর্বৃত্তরা। তারপরও কোনো প্রতিকার নেই। আর বখাটের নির্যাতন তো সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিজয় দিবসের রাতে দিরাইতে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়াকে তার বাড়িতে ঢুকে পড়ার টেবিলেই খুন করলো বখাটে ইয়াহিয়া। আগে থেকে র‌্যাবে অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হলো না, জীবন বাঁচলো না মেয়েটির। তারপরও সেই বখাটে খুনিকে ধরা সম্ভব হয়নি। এই তো সেদিন রূপগঞ্জে বখাটের নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় মেয়েটির ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেললো বখাটেরা।

এখনও সুরাহা হয়নি রিশা হত্যার। আরও অনেক মামলা জমে আছে পাহাড় হয়ে। মনে হচ্ছে কোনো প্রতিকার নেই কোনো নির্যাতনের। তনু হত্যার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি, মিতু হত্যারও না।
এমনিতেই নারী ঘরে-বাইরে সর্বত্র প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কেউ এক পা এগোয় তো তাকে চারদিক থেকে টেনে ধরে পিছিয়ে দেওয়ার মহড়া শুরু হয়ে যায়। তার উপর যদি নারী নিজেই নিজের আবেগে অস্থির হয়ে মরার পথ পরিষ্কার করে, তখন হতাশ লাগবে না তো কী লাগবে?

কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিত তরুণী প্রেমিকের উপর অভিমান করে নিজের হাতের রগ কেটে ফেলেছে। মেয়েটি অবশ্য মরেনি। সে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বলে, প্রেমিক নাকি মোবাইল ফোনে তার কল ধরেনি। কল কেটে দিয়েছিল। এক ঘন্টার মধ্যে কলব্যাক করেনি। তার উপর কিছুক্ষণ পর সে প্রেমিকের ফোন ‘বিজি’ পায়। ওই সময়ে তাদের আরেক বান্ধবীর ফোনও ‘বিজি’ পায়। ব্যস, সে ধরে নেয় ওরা দুজন নিশ্চয়ই প্রেমালাপ করছে। মেয়েটি একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। তাকে ঘিরে বাবা-মায়ের কতো স্বপ্ন। এই মেয়ে যদি সত্যিই মরে যেতো, তাহলে বাবা-মায়ের জীবনটা কি শূন্য হয়ে যেতো না?

এই মেয়েটির তো তবু বয়স কম। আরেকটি ঘটনার সাক্ষী আমি। সেটি বলি।

দুই সন্তানের জননী চাকরি করতেন একটি প্রতিষ্ঠানে। স্বামী ছিলেন অন্য পেশায়। ভীষণ ব্যস্ত। বলতে গেলে স্বামী তাকে সময়ই দেন না। অন্যদিকে তার এক সহকর্মী বেশ ভালোই সময় দেন। এই সময় দেনেওয়ালা ভদ্রলোকটিও বিবাহিত। তার স্ত্রী হাউজ ওয়াইফ। তিনি নাকি স্বামীর সুখ-দুঃখ মোটেই বোঝেন না। যাই হোক একসময় দুজনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলো। নারীটিও সব ভুলে প্রায় দেওয়ানা হয়ে উঠলেন। এই দেওয়ানাপনার সংবাদ লোকটির স্ত্রীর কানে যেতে দেরি হয়নি। স্ত্রী অফিসে এসে কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ দিলেন। নারীটির চাকরি গেল। সেই সঙ্গে স্বামীও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে তালাক দিতে কসুর করলেন না। প্রেমিক লোকটি নিজের ভুল বুঝতে পেরে বস এবং স্ত্রীর হাতে পায়ে ধরে চাকরি ও সংসার রক্ষা করলেন। অন্যদিকে শ্যাম ও কুল দুই হারিয়ে নারীটি এখন মনোরোগী।

অবিবাহিত এক তরুণী। চাকরিতে ঢুকেই স্থির করলেন দ্রুত উন্নতি করতে হবে। এই টার্গেটে বিবাহিত বসের কুপ্রস্তাবে বেশ আগ্রহের সঙ্গেই রাজি হলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই অফিসে শক্ত অবস্থান গড়লেন। অন্য কয়েকজনের চাকরিও খেলেন। ক্যারিয়ার যখন বেশ রমরমা, তখন ঘটলো বিপর্যয়। অফিসে আরেক সুন্দরীর আবির্ভাব। এবার বসের সুয়োরানী হলেন নতুন সুন্দরী। আর পুরনো সুন্দরী অবধারিতভাবে দুয়োরানী। এই মেয়েটিও এখন বেশ হতাশায় ভুগছে। ‘বুদ্ধি’ খাটিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বসের স্ত্রী মিটিমিটি হাসছেন।

প্রশ্ন হলো, এতো প্রেম, এতো আবেগ, এতো বুদ্ধি মেয়েরা পায় কই? কেন প্রেমিকের প্রতি এতো অভিমান, এতো ভালোবাসা, ভরসা? এত আস্থা? নিজের মেধা, নিজের যোগ্যতার উপর আস্থা নেই কেন? কেন একা চলতে এতো ভয়, এতো নিঃসঙ্গতার আকুতি? নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে যে জীবন গড়া হয়, প্রাথমিকভাবে তার চাকচিক্য কম থাকলেও সেটা মজবুত হয়। সেটা এতো সহজে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে না।
স্লো এন্ড স্টেডি উইনস দ্য রেস – এটা তো আজকের কথা নয়। অথচ অনেক মেয়েরই এখনও প্রেমে পড়ে বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পায়। প্রেমের প্রাথমিক অবস্থায় বান্ধবীদের কাছে প্রেমিককে নিয়ে অহংকার করাও চলতে থাকে পুরো দমে। তারপর বাড়ি খেয়ে মন ভাঙে। ততোদিনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত কুয়াশাচ্ছন্ন।

এইসব দেখেশুনে আজকাল আমার ‘আবেগপ্রবণ’ নারীদের বিষয়ে ভীষণ হতাশ লাগে। ওইসব প্রতারক প্রেমিক যে লুচ্চা গ্রুপ অব কোম্পানিজের এমডি, সেকথা তারা কেন বোঝেন না? প্রাথমিক অবস্থাতেই এদের প্রস্তাবের মুখে ঝাড়ুর বাড়ি মারা দরকার। নিজের আবেগের উপরও নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। প্রেমে একেবারে ভেসে গেলে তখন নিজেরই ক্ষতি।
মনে রাখতে হবে উন্নতির কোনো ‘ইজি মেথড’ বা ‘শর্টকাট’ পথ নেই। বসের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে উন্নতি করলে শেষ পর্যন্ত নিজের মর্যাদা তো যায়ই, উন্নতিটাও স্থায়ী হয় না।

নারীদের বলতে চাই, বোন, তোমার জীবনের যুদ্ধটা তোমাকেই চালাতে হবে। নিজের শক্তিতেই উন্নতি করতে হবে। নিজের মেধা দিয়েই ক্যারিয়ার গড়তে হবে। কোনো প্রেমিক রাজপুত্র এসে তোমাকে রানী বানালেও সেটার উপর খুব বেশি ভরসা করা যায় না। নিঃসঙ্গতাকে ভয় পেলেও চলবে না। নিজের সঙ্গকে উপভোগ করতে শিখতে হবে।

চলার পথে যদি সত্যিই কোনো ভালো মানুষের দেখা মেলে, যদি দেখো তার কমিটমেন্ট ঠিক আছে, তাহলে যৌথ জীবনটা বেছে নেওয়া মন্দ নয়। কিন্তু তার উপর ভরসা করে নিজের ক্যারিয়ার, নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিতে যেও না প্লিজ। যে সত্যিকারের প্রেমিক বা সঙ্গী বা বন্ধু, সে কখনও তোমাকে অশ্রদ্ধা করবে না, অনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার লোভও দেখাবে না, তোমার উন্নতিতে বাধা দিবে না, তোমাকে পরনির্ভরশীল করে হাতের মুঠোয় পুরতেও চাইবে না। সে বরং তোমার জীবন সংগ্রামে শক্তি সাহস যোগাবে, পাশে থাকবে। নিজের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিজের জীবনটা গড়ে তোলো। আর সুখের পায়রা লুচ্চা প্রেমিকদের জন্য তৈরি রাখো শক্ত শলার ঝাঁটা।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক, কবি ও লেখক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.