বডি শেমিং আর আপনার আত্মবিশ্বাস

0

রনিয়া রহিম:

আমার এক বান্ধবী আছে, যখন স্কুল/কলেজে একসাথে পড়েছি, দেখতাম ক্যাম্পাসের অনেক ছেলে তার জন্য পাগল থাকতো। তাকে একদিন ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলো, তাকে দেখতে কুটনি লাগে। আরেক বান্ধবী, তাকে বিয়ে করার জন্য অনেকেই উৎসাহী, কিন্তু সে একা থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে আপাতত; তাকে সেদিন শুনতে হলো, সে মুটিয়ে যাচ্ছে বলে তার বিয়ে হচ্ছে না।

পরিচিত এক শুকনো গোছের তরুণটিকে শুনতে হলো, তাকে ড্রাগ এডিক্টের মতো লাগে দেখতে। কালো মেয়েটিকে শুনতে হলো, সে কালো হলে কী হবে, দেখতে সুইট আছে (আপাতদৃষ্টিতে কমপ্লিমেন্ট মনে হলেও এটাও তার গায়ের রং নিয়ে বডি-শেমিং)।

আমার নিজের গালে জন্মদাগ আছে, আমি এতোরকম কথা শুনেছি আর চাহনি দেখেছি যে, হিসেব রাখিনি।

যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন ভাবতাম আমার গালের দাগটা আর কারো নেই বলে বোধহয় আমাকেই এমন প্রশ্ন আর চাহনির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু না, কেউ না কেউ কখনো না কখনো কাউকে না কাউকে বডি-শেমিং করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। যে আপনার চোখে পারফেক্ট, আপনার যখন মাঝে মাঝে মনে হয়, আহা, তার চেহারাটা যদি পেতাম, সেই মানুষটাকেও দেখেন কত খোটা শুনতে হয়েছে তার কোনো শেষ নেই!

(ঐশ্বরিয়াকে দেশ বিদেশে সবাই অনিন্দ্য সুন্দরী ভাবি না? ইনাকেও শুনতে হয়, উনি ‘প্লাস্টিক বিউটি’, তাঁর প্রেগন্যান্সির আগে পরে কতো আজেবাজে আলোচনা হয়েছে তাঁর শরীর নিয়ে, সেটাও সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকলেই জানেন)।

যেখানে যা’ই হোক, আপনি নিজে করবেন না; আপনার আশেপাশে কেউ করলে আপনি তাকে থামাবেন (হয় সরাসরি, নয়তো, সেটির সুযোগ না থাকলে, আপনার নীরবতায়, সে হাসিঠাট্টাতে নিজে অংশ না নিয়ে, সেই আলোচনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে)।

আর সবচেয়ে বড় কথা, আপনার নিজের আত্মবিশ্বাস যেন আকাশছোঁয়া হয়, এমনভাবে নিজেকে গড়ে তুলবেন। আপনার আত্মবিশ্বাসের সামনে যেন তার ফালতু ঠাট্টাগুলো অচল হয়ে যায়। আমার জন্মদাগ আমার নিজের কাছে এতো নরমাল, যে আর কেউ যখন সেটাকে এবনরমাল করার চেষ্টা করে, আমার স্বাভাবিক থাকা দেখে সে আলোচনা তারা এগিয়ে নিতে পারে না। আমি সহানুভূতি থেকে সার্জারির উপদেশ, সব পেয়েছি; কিন্তু আমি যখন হাসিমুখে বলি, এটা আমার পছন্দ, তাই এটা আমি রাখবো, তখন পাল্টা তাদের ভ্যাবাচেকা চাহনি দেখতে উল্টো আমারই মজা লেগে যায়।

একজন বড় আপু খুবই কুৎসিত কিছু কথা বলেছিলো, আমি নিজেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। তারই ছোটবোন (যাকে তার বড় বোনের কটুকথা আমি কখনো বলিনি), সে সেদিন আচমকা এসে বললো, তার খুব মেয়ের শখ, মেয়ে হলে আমার নামটা তার সন্তানকে দেয়ার সাধ তার। তার কাছে ‘রনিয়া’ নামটা যেমন সুন্দর, তেমনই, আমি রনিয়া মানুষটা সুন্দর – এই কারণে। এটি আমার জন্য ভীষণ সম্মানের; আর, একই সঙ্গে, কিছুটা বিজয়েরও। একদিন যার বড় বোনের ‘বডি শেমিং’-এর মন্তব্যে আমার আত্মবিশ্বাসে টাল ধরেছিলো, আজ তারই ছোটবোন চাইছে তার সন্তান আমার নামটি ধারণ করুক – কী মিষ্টি না এই অনুভূতি?

নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন না, এই টুকরো টুকরো বিজয়গুলো হবে তখন বোনাস; আসল আনন্দ অনুভূতি আসে নিজের আত্মসম্মানবোধটি থেকেই, –
সেটি রীতিমতো এক অমূল্য সম্পদ!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 140
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    140
    Shares

লেখাটি ৮২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.