আমার রোজনামচা

হ্যাপি চাকমা:

আমাকে করা কমন প্রশ্নের একটি, “আপনি কী করেন?” এতে একটা স্পষ্ট মেসেজ পাই, “লেখালেখি করেন তো ভালো কথা, ওসবে তো পেট চলে না, ওটা চলে কী দিয়ে?” যেহেতু চাকরি করি না, আমি বলে দেই, বেকার। এতে কেউ যান ক্ষেপে, ভাবেন মজা করছি, কেউ ভাবেন, “ও জামাইয়ে খাওয়ায়?” তাই আমার প্রতি আর আগ্রহ না দেখিয়ে উনার সকল আগ্রহ চলে যায় ওই খাওয়ানেওয়ালার উপর। আচ্ছা, এই জনবহুল দেশে কি কোনো বেকার পুরুষ নাই? আমরা কি তাকে বলি, “ও আপনি তাহলে বেকার, তা ভাই, বউ কী করেন?”

যাক, মূল প্রসঙ্গে আসি। আমি টোটাল বেকার নই বলে আমার ধারণা। কারণ, আমি প্রতিদিন নতুন নতুন প্ল্যান করি। হ্যাঁ, বেলা শেষে ওসব ভ্যানিশ হয়, তাতে কী, বসে তো নেই! এতো এতো ভ্যানিশের পরও আমি নতুন নতুন স্বপ্নে দিনতো শুরু করতে পারি। একগাল হাসি নিয়ে নেমে পড়ি ব্যস্ত সড়কের অলিগলিতে। বুকে এই বিশ্বাসটুকু রেখে, যে কোথাও আমার জন্য ভালোকিছু অপেক্ষা করছে জাস্ট আমি খুঁজে পাচ্ছি না, আমাকে ওটা খুঁজতে হবে।

তারই অংশ হিসেবে কদিন আগে গুলশান গেলাম, নামকরা একটা অফিসে। আমার ধারণা এটা এমনই যে এক নামে যে কেউ চিনবে। কিন্তু, আমার বিধি বাম। আমাকে যিনি ঠিকানা দিয়েছেন তিনি রোড নং আর বাসা নং উল্টেপাল্টে দিয়ে ফোন বন্ধ করে, গুম। গুগলের ভরসায় হাঁটলাম, পৌঁছে দেখি উনারা মাস তিনেক আগে অফিস চেঞ্জ করেছেন, গুগলকে না জানিয়ে। আমার ততক্ষণে তিনশ টাকা রিকশা ভাড়া শেষ, চটিজোড়া বলে, আমিও শেষ হতে বেশি দেরি নাই। ভাঙা পাও খানা বলে, “মাফ কর না আজ, আরেকদিন আয়, আজতো ছাড়।”
আমি ছাড়ার পাত্রী নই, গুলশানের পাঁচ কি.মি.র ভেতর এক একটা বাড়ির নেমপ্লেট মুখস্থ করে ফেলেছি ততক্ষণে। ওইদিনের মতো বিস্মিত আমি জীবনে হইনি, এক বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি গার্ড পাশের বাড়ির নাম্বার জানে না! যে বিল্ডিংএ ডিউটি করছে, সেখানে কোন কোন অফিস, সেটাও জানে না!

অথচ, গাঁও গেরামে হলে পাড়ার ওই মাথায় কার বাড়ি, তার বাসার পঙ্গু মানুষটা কেমন আছে, সে খবরও রাখে। হায়রে, মেরুদণ্ডহীন জীবন! পাক্কা চার ঘণ্টা চক্করের পর ক্ষান্ত হলাম, কারণ, ততক্ষণে পাঁচটা বাজে, খুঁজে পেলেও আর লাভ নাই, অফিস বন্ধ হয়ে যাবে।

পরদিন আবার নব উদ্যমে নামলাম, ততক্ষণে ঠিকানায় যে শুভঙ্করের ফাঁকি হয়েছে সেটা খবর পেলাম, এবং আসল ঠিকানা উদ্ধার হলো। যথারীতি কাজ সেরে রাস্তায় দাঁড়িয়েছি, অমনি শিরিন হাজির। সে আমাকে ছিনতাই করে নিয়ে গেলো বাণিজ্য মেলায়। ঢুকে মনে হলো, কে বলে বাংলাদেশ উন্নয়শীল দেশ? শালা মিছা কথা কয়! এতো পুরোদস্তুর উন্নত দেশ! ইয়া বড় গাছের মাথায় রেস্টুরেন্ট! আম, আঙ্গুর ঝুলছে আমার বাড়ির সাইজ থেকেও বড় বড়। চিনিগুড়া চালের প্যাকেটে লেখা এক কেজি, কিন্তু সাইজটা আমার চেয়েও লম্বা এবং মোটা। আমি এক এক করে দেখছি আর দেখছি।

শিরিন ক্যানক্যান করছে, কিছু একটা পছন্দ কর। তাকে কেমন করে বলি, অত বড় আম, আঙ্গুর, চালের কেজি পছন্দ হলেও নেয়ার মতো ট্রাক আমার নাই। হঠাৎ পছন্দ হলো টুপিওয়ালা একটা টেডি। কী কিউট! আমি সাথে সাথে স্বপ্নের জগতে গেলাম, আহা! আমার শিয়রে রাখবো তারে, আলতো চুমু দেবো, রোজ জড়িয়ে ধরবো। আমার প্রিয় কম্বলও শেয়ার করবো তার সাথে। তখনি দোকানদার দুই হাজার বলে আমার সকল স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান করে দিলো।

শিরিন বললো, “নিয়ে নে।” আমি বললাম, “ধুর আমি বাচ্চা নাকি!” হায়রে আঙ্গুর ফল, তুই সদাই টক। শিরিনের দিকে তাকিয়ে দেখি, তার চোখে হতাশা, মুখে ক্যান ক্যান, “টাইম চলে যাচ্ছে তো, কিছু একটা পছন্দ কর।” (ওর আটটায় ট্রেন, দিনাজপুর থাকে সে, সেদিনই চলে যাবে।)

কিছুক্ষণ পর কাউবয় হ্যাট একটা কিনে চলে এলাম গেটে। বাকিদের জন্য ওয়েট করছি। এমন সময় দেখি দুটো পুঁচকে মেয়ে, বয়স যথাক্রমে দশ, সাত হবে। মলিন ছেঁড়া কাপড়, হাতে কিছু খাবার। ভেতরে ঢুকতে চাইলো, সিকিউরিটি বাধা দিলো। ভেতরের এই ভুবন তাদের জন্য নয়। সিকিউরিটি যাওয়া যাবে না বলে ক্ষান্ত হলেন না, লাঠি উঁচিয়ে চোখ রাঙালেন।

ঠিক তখনি! ঠিক তখনি দেখলাম, একটা বছর দশেক মেয়ের উল্টো চোখ রাঙানি! ভাবটা এমন, “লাঠি তো চালিয়ে দেখ!” তার চোখে বাঘিনীর স্ফুলিঙ্গ, কুঞ্চিত চোখের কোণা, ঠোঁটে দ্রোহ, উত্থিত হাত!

উফ্! অস্ফুটে আমার মুখ থেকে বের হলো, “গুড বেবি!” আমি এমনই একজন নারী চাই, এমনই এক বালিকার উপর আমার সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করতে চাই। একে নারীবাদ বলে কিনা জানি না, এই বালিকা কখনো উইমেন্স ফেডারেশন দেখেছে কিনা জানি না। তবে হ্যাঁ, সে জেনে গেছে, এই পৃথিবীতে তাকে নিজের দমেই ঠিকতে হবে। সাব্বাশ শেরনী।

গেটের এপার-ওপার অবস্থানের কারণে তার অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ কোনোটাই নেয়া হয়নি আমার। নিয়েছি শুধু তার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আভাটুকু। সারাজীবন তার ওই রূপ আমার মনে গাঁথা থাকবে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.