পারলে আরও পূর্ণিমাদের হাত ধরুন!

আলফা আরজু:

পূর্ণিমাকে নিয়ে একজনের একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং তার নিচে করা কয়েকটি কমেন্ট পড়ে ভীষণভাবে মর্মাহত হলাম এই ভেবে যে, সেই ফেসবুক স্ট্যাটাসদাতা কি সত্যি জানেন না বাংলাদেশে চাকরি পাওয়াটা কত দুষ্কর, যেই যে বিষয়ে পড়াশুনা করেন, সেই বিষয়ে চাকরি পাওয়া কতটা কষ্টকর!

না জানারই কথা। কারণ, উনি খুব মেধাবী মানুষ। উনার পরিচিত কোনো বন্ধু-আত্মীয়-প্রতিবেশী নিশ্চয় আমাদের মতো আমজনতা না, তাই চাকরি খোঁজার অভিজ্ঞতা নেই। চাকরির বিজ্ঞাপন লেখা, সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ৩৬/৩৭টা চাকরির আবেদন করেও চাকরি না হওয়া। এমন অভিজ্ঞতা নিশ্চয় উনাদের কারোর নেই।
কারণ, উনারা মেধাবী। বাড়ি থেকে খুঁজে এনে উনাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কোনো প্রকার lobbying/নেটওয়ার্কিং ও রেফারেন্স লাগেনি। হতেই পারে। সেই স্ট্যাটাসেই একজন নারী সেলিব্রিটির কমেন্ট পড়ে আরও বিব্রতবোধ করলাম। উনি পুরো ঘটনাটির সমালোচনা করতে গিয়ে পূর্ণিমাকেই যেন অপমান করলেন! সেটা কী বুঝে করলেন, নাকি না বুঝে?

সেই জন্য – উনাদের মতো খুব মেধাবীদের প্রতি সম্মান রেখে একটা অতীত অভিজ্ঞতা বলি।

ঘটনাটা ২০০১ সালের। আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স করে চাকরি খুঁজছে। ওই সময় তার আর্থিক অবস্থা এতোটাই নাজুক ছিলো যে আমার সাথে মাঝে মাঝে আফসোস করে বলতো, যদি দেখতে সুন্দর হইতাম তাইলে “শরীর নিয়ে ব্যবসা করতাম”।
হেসে হেসে বলতো ও কথাটা, কিন্তু আমি ওর ভিতরের কান্নাটা জানতাম।
কারণ সেই সময় আমার বন্ধুটা অন্ত:সত্ত্বা ছিলো। পালিয়ে বিয়ে করেছিলো বলে তখনও সমাজের, পরিবারের স্বীকৃতি মেলেনি। স্বামী তরুণটিও তখন ছাত্র। তাই তিনি তাদের বাসায় জানাতে পারেননি।

সেই দুঃসহ সময়ে আমার বন্ধুর খাবারের কষ্ট, ঢাকা শহরে টিকে থাকার যুদ্ধ – আমি কাছ থেকে দেখেছি।
তো, সেই বন্ধুর চাকরি খোঁজার গল্পটাই শুধু বলি। তখন একুশে টিভি’তে একটা প্রোগ্রাম “দেশজুড়ে” (নামটা সম্ভবত সঠিক)’র জন্য নতুন কর্মী নিয়োগ চলছে। আমার সেই বন্ধু পত্রিকা থেকে বিজ্ঞাপন পেয়ে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলো। তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হলো।

সেই সাক্ষাৎকারের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিল আমার সেই বন্ধুর অন্য এক ক্লাসমেট। সাক্ষাৎকার শেষ করে বের হয়ে আমার সাথে প্রথম যে কথাটা ও বলেছিলো – “আমার চাকরির সাক্ষাৎকার আমার ক্লাসের একজন সহপাঠী নিলো।”
ওর কণ্ঠ শুনেই আমার মনে হয়েছিলো, ও জেনে গেছে, এই চাকরিটাও ওর হবে না। আহা, আমার বন্ধুর যুদ্ধ। খাওয়ার কষ্ট, থাকার কষ্ট, সমাজের-প্রতিবেশীর তীর্যক চাহনির কষ্ট, অনাগত একটা সন্তানের জন্য বেঁচে থাকার কষ্ট। দেখেছিলাম খুব কাছে থেকে।

জানেন আপা, বন্ধুর “সহপাঠী” কিভাবে নিয়োগদাতা হয়েছিলেন? জানার কথা না। কারণ আপনারা মেধাবী। আমার সেই বন্ধুর সহপাঠীর পারিবারিক ক্ষমতা – ওকে নিয়ে “নিয়োগদাতার আসনে বসিয়েছে, আর আমার বন্ধুর চাকরিটাই হয়নি।”
ওই যে – কীসের যেনো মেধা (!!) লাগে? মামা/চাচা/শ্বশুর/ভাশুরের মেধা/ক্ষমতা- সেই সব সত্যি ছিলো না। যার জন্য -গুণে গুণে ৩৭ টা চাকরির আবেদন করেও আমার বন্ধুর চাকরি হয়নি। পরে এক ছোট-খাটো মামার জোরে বেসরকারি একটা কলেজে ঢুকেছিলো।

আমার সেই বন্ধুর ভাষাতেই বলি – “নিউজ নেটওয়ার্ক এর কন্ট্রাক্ট প্রায় শেষের দিকে। এর মধ্যে আমার খাবারের খরচ বেড়ে গেছে। আমার সারাক্ষণ খেতে ইচ্ছে করে। ভালো-মন্দ খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তখন আমার খুব আর্থিক দুর্যোগ – হাতে প্রায় টাকা নাই। বাসাভাড়া-খাবার খরচ। পারছিলাম না। কতবার মনে হয়েছে, আত্মহত্যা করবো। এই ভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক সম্মানের।”

অনেকবার – আমার বন্ধু আত্মহত্যার কথা বলতো। আমরা কয়েক বন্ধু ওর পাশে থেকে সাহস দিয়েছি, ভালোবেসে ওর হাত ধরেছি, ওর সাথে রাতদিন থাকার চেষ্টা করেছি। শুধু যা করতে পারিনি, সেটা হলো ওর জন্য একটা কর্মসংস্থান। যা খুব প্রয়োজন ছিল তখন।

আপনাদের মতো মেধাবীদের নীতিকথার প্রেক্ষিতে অন্য একটা সাক্ষাৎকারের কথা বলি।
BSS (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) এর প্রতিবেদক নিয়োগের কাহিনী। আমার বন্ধু BSS এ লিখিত পরীক্ষা দিয়ে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিলো বলে ওর সকল অরিজিনাল মার্কশিট ও সার্টিফিকেট জমা নেয়। আরো কী সব কাহিনী (এখন আর মনে নাই!) করে BSS। কিন্তু, শেষপর্যন্তও ওর চাকরিটা হয়নি।
কেন জানেন?

পরে তৎকালীন বাসস-এর কর্ণধারকে (ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রধান) জিজ্ঞেস করেছিলাম ওই সময়, অমুকের ওই চাকরিটা কেন হয়নি? উনি বলেছিলেন “চিনতাম না তখন!” আমার উত্তরে আর বলা হয়নি, “সার্টিফিকেট ও বাড়ির ঠিকানা নিয়েছিলেন – একটু খোঁজ করে দেখতেন – পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শ! তবুও কাজটা খুব দরকার ছিল আমার বন্ধুর”।
ওই সময় আমার বন্ধু যদি প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম আপার মতো একটা শক্ত হাত পেতো – ও একটা নতুন জীবন পেতো। জ্বী আপা, নতুন জীবন পেতো।

সেইজন্য পূর্ণিমার এই চাকরির খবরে আমার মতো কম মেধাবীরা কেউ কেউ খুব খুশি হয়েছে। আপনাদের মতো মেধাবী ও আত্মসম্মানওয়ালাদের বিষয়গুলোর সাথে, যাদের খাওয়া-পড়ার চিন্তা করতে হয় তাদের মিলবে না। শুধু শুধু এইসব মর্মবাণী দিয়ে মানুষটার মানসিক শান্তি নষ্ট করবেন না। পারলে অনেক পূর্ণিমা আছে, যাদের হাত ধরলে পৃথিবীকে দেখিয়ে দিবে ওরা কী এবং কী কী করতে পারে, তাদের হাতও ধরুন এবং খুব শক্ত করে ধরুন।

শেয়ার করুন:
  • 121
  •  
  •  
  •  
  •  
    121
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.