এই দাসত্বের শেষ কোথায়?

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

পরিবারের প্রধান কে? এতোটুকু না ভেবেই আমাদের মাথায় যে উত্তর আসে তা হলো, পিতা। ধরুন তার পরের প্রশ্ন, মায়ের ভূমিকা কী? এবার কিন্তু চট করে এক বাক্যের কোনো উত্তর খুঁজে পাবেন না, একটু ভেবে বলতে হয়, হ্যাঁ পিতাই পরিবারের প্রধান, তবে মাও অনেক কিছু করেন, আসলে পরিকল্পনা পিতার হলেও তা বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রেই মায়েদের সহায়তা নেয়া হয়। হয়তো সে কারণেই কিছু কিছু পরিবারে নারীকে ততোটাই দাপুটে মনে হয়, ঠিক যতটা পুরুষকে মহাপুরুষ।

যুগে যুগে এভাবেই পরিবার নারীকে ব্যবহার করেছে, আর সৃষ্টি করেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের।
দুর্বল জাতি প্রভু বিনা অসহায়। ঘরে বাইরে প্রভুর প্রভুত্বকে শিরোধার্য ধরেই যাদের জীবন অতিবাহিত হয়, তাদের পরিবার নিশ্চয়ই প্রভুহীন নয়?

হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে আমাদের সমাজে পিতা শুধু পরিবারের প্রধান নন, বিবেচিত হয় পরিবারের প্রভু হিসেবে, তিনি এক, আর তিনিই পরিবারের সকলের ভাগ্য নির্ধারক। তার ইচ্ছা অনিচ্ছাই পরিবারের ইচ্ছা অনিচ্ছা। তাই সন্তান গর্ভে ধারণ এবং জন্মের পর লালন পালনের সবটুকু দায়িত্ব পালন করেও মাতা আইনত সন্তানের অভিভাবক নন। মাতা কেবলই তার স্বামীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গী, সভ্য ভাষায় তাকে সঙ্গিনীই বলে। কিন্তু সামাজিক অনুশাসন আর রাষ্ট্রের আইন বিশ্লেষণ করলে বোঝা স্ত্রী স্বামীর বৈধ দাসী ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রভু আর দাসীর মধ্যে সমতা আনা সম্ভব নয়। আপনি দাসীকে খাস-দাসী বানাতে পারেন, তাকে প্রাচুর্য্য দিতে পারেন, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সে দাসী, কখনোই সঙ্গিনী কিংবা রাণী নয়।

তাহলে প্রশ্ন যুগে যুগে নারীকুলের কি দাসত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার বিন্দুমাত্র আকাঙ্খা হয়নি? নাকি তা উপলব্ধি করার জ্ঞানই অর্জিত হয়নি কোনদিন? শিক্ষা, দক্ষতা, বুদ্ধি, কোন কিছুই তাকে দাসত্ব প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার অনুপ্রেরণা দেয়নি?

একদল নারী তা উপলব্ধি করার আগেই পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন বা বেঁচে থাকার ইচ্ছে হারিয়েছেন। আরেক দল দাসত্বের শেকল থেকে মুক্তিলাভের আন্দোলনে (ঘরে-বাইরে) প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ভীত সন্ত্রস্ত নারীকুল; যাদের কাছে পরিবর্তিত হাওয়ার উত্তাপ সহ্য করার চেয়ে অসম লৈঙ্গিক সমাজে বেঁচে থাকাই সহজ মনে হয়।

প্রকৃতিতে পরিবর্তন কখনই সহজভাবে আসে না। যখনই প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করা হয়েছে, হেঁটে যেতে হয়েছে এক দীর্ঘ প্রতিকুল রাস্তা। হয়তো যুগ যুগ ধরে সে রাস্তা ধরে হাঁটবার পর সফলতার দেখা মেলে। ভীত-সন্ত্রস্ত নারীকূলের পরাজয় সেখানেই, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার কারণে তারা বাকি নারীদেরও ঠেলে দিয়েছে অভিশপ্ত সমাজের দুর্গন্ধময় জীবনে।

কিন্তু কতদিন? যতদিন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী তার অবস্থানের পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম পথ পাড়ি দেবার সাহস অর্জন করতে ব্যর্থ হবে ততদিন। ততদিন পর্যন্ত নারীর সম্মান ঠুনকো কাঁচের মতো ভঙ্গুর হবে, তার কন্ঠস্বর হারাম হবে, তার পদচারণা অন্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। চলনে- বলনে, কাপড়ে-সাজনে আধুনিকতা নারীর জীবনে পরিবর্তন বয়ে আনবে না। নতুন মোড়কে পুরানো মালের মতোই সে পড়ে থাকবে অন্ধকারে আর নিজের ভেতরে লালন করবে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বীজ। মান্য করবে তার প্রভুকে – “শিরোধার্য্ প্রভুর আদেশ”।

এই অসম লৈঙ্গিক সমাজের দায়ভার কার? নারী হিসেবে আমার? পুরুষ হিসেবে আপনার? নাকি ঐ সকল ভীত দুর্বল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা লালন করা নারীদের, নাকি তার পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভু পুরুষের?

আমরা যারা এসবের ঊর্ধ্বে, যারা প্রতিকূল পথে হাঁটছে বহুদিন, প্রথা ভাঙ্গা মানুষগুলো, যারা নিজেদের অবস্থান লিঙ্গ দ্বারা নির্ধারণ করিনি, যে দলে নারী-পুরুষ পাশাপাশি অবস্থান করছে, পরিবর্তনের আশায় দীর্ঘ পথ হেঁটে চলছি আর ভাবছি, এই লৈঙ্গিক বৈষম্যের শেষ কোথায়?

শেয়ার করুন:
  • 132
  •  
  •  
  •  
  •  
    132
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.