”দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ…মরণের সাথে লড়িয়াছে”

শেখ তাসলিমা মুন:

(লেখাটা সদ্য প্রয়াত চিত্রশিল্পী আফ্রিদা তানজীম মাহির উদ্দেশ্যে উৎসর্গিকৃত)

Jean-Paul Sartre মৃত্যুকে absurd বলে অভিহিত করে বলেছেন, যেহেতু মৃত্যুকে আমরা পূর্ব থেকে জানি না, সেহেতু মৃত্যুকে আমরা নির্বাচন করতে পারি না। তাই ‘আমি মরতে স্বাধীন নই।’ এ রকম কথা বলেছেন। যদিও পরে এটি প্রশ্নের সম্মুখীনও হয়েছে। মানুষ যদি মরতে স্বাধীন না হবে, তাহলে কীভাবে মুহূর্তে একজন মানুষ আত্মহননের মাধ্যমে নিজের জীবনাসবসান ঘটিয়ে ফেলেন?

মূলত সার্ত সারাজীবন মানুষের স্বাধীনতাকে অসীম করে দেখে গেছেন, মৃত্যুকে তিনি সে স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবেই দেখেছেন। স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে দেখেছেন। সেই তিনিই বলেছেন “আমরা মরতে স্বাধীন নই” আর আমাদের জীবনানন্দ তখন কলকাতায় একটি ট্রামের সামনে দাঁড়ান। লেখেন, “চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বত্থের কাছে একগাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা একা;…”।

মানুষের অস্তিত্বের টানাপোড়ন ও তার মনস্তাপ মৃত্যুর উপসংহারে এসে মিলতে চায় সেটি একটি বড় আলোচনা। আমি অত বড় আলোচনায় ঢুকবো না। কেবল সামান্য উল্লেখ করে বলবো, মৃত্যু অস্তিত্বেরও সমার্থক। ভয়, উদ্বেগ, মনস্তাপ, একাকিত্ব, দুঃখ বা সাফারিং এবং মৃত্যু শব্দগুলো মানুষের অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত। মানুষ যত স্বাধীন হয়েছে, তত সে তার ক্ষমতা টের পেয়েছে, তত তার নিজের দায়িত্ব বেড়েছে, মানুষের ভাবনা বেড়েছে। মানুষের সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তার সাথে পরিচয় ঘটেছে। মানুষের ভীতি, অ্যাঙ্গুইশ, উদ্বেগ, একাকিত্ব সাফারিংস বেড়েছে।

এখানে ‘বিয়িং’ ‘সত্বা’ ‘অস্তিত্ব’ শব্দগুলো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ বিষয়ে হাইডেগার ও সার্তের বিতর্ক বিষয়ে না গিয়ে শুধু বলবো, অস্তিত্ব এবং বিয়িং এক সূত্রে গাঁথা এবং অস্তিত্ববাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সার্ত তার Being and Nothingness এ নিজেই এ বিষয়ে ক্লিয়ার করেছেন। ‘বিয়িং’কে জানতে হলে আমাদের ‘নিজেদের’ জানতে হবে এবং এই নিজেদের জানাই অস্তিত্বকে জানা। সে আলোচনা দর্শনের এবং কঠিন। এসব নিয়ে হাইডেগার, সার্ত, কিয়ারকেগারডের প্রচুর ঝগড়া আছে। আমি শুধু অস্তিত্বের এই টানাপোড়েনটুকু বলতে চাই। মনস্তাপে কিভাবে পরিণত হয়?

‘মানুষ স্বাধীন এবং মানুষ স্বাধীনতা বিষয়ে সচেতন হয় মনস্তাপের মাধ্যমে।’ আবারও সার্ত। সার্তের মতে, মানুষ একই সাথে স্বাধীন এবং ‘নাথিং’! তাঁর কাছে মানুষ হওয়া এবং স্বাধীন হওয়া সমার্থক। তাঁর মতে, যে স্বাধীন নয়, সে মানুষ নয়। কিন্তু সঙ্কট হলো, তিনি বলছেন মানুষ একই সাথে অপূর্ণ ও ‘নাথিং’।
কীভাবে? তিনি বলছেন, একটি জড়ো বস্তু অপূর্ণ নয়, যেমন একটি টুল বা চেয়ার। একটি চেয়ারের শুধু চেয়ার হবার ক্ষমতা আছে, কিন্তু একজন মানুষ তা নয়। বস্তু সীমাবদ্ধ। মানুষ অসীম। মানুষের স্বভাব অনবরত সম্ভাবনার। এ সম্ভাবনা একটি ‘অপূর্ণতা’, যা মানুষের ভেতর অনবরত বিদ্যমান। অর্থাৎ যখনই সে সম্ভাবনাপূর্ণ তখনই সে ‘অপূর্ণ’। মানুষ হওয়া ও অপূর্ণ থাকা সেজন্য সমার্থক। আর যেহেতু মানুষ অপূর্ণ তাই সে ক্রমাগত সে অপূর্ণতাকে ওভারকাম করার যুদ্ধ করে যায়। এটি মানুষের অস্তিত্বের একটি বড় যুদ্ধ।

এ যুদ্ধ তাকে ক্রমাগত জীবনান্দের ভাষায়

”অর্থে নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।” অবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আসল প্রসঙ্গে আসি। আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে যাওয়া আসলে কতটা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক? আত্মহত্যা এক মুহূর্তের বা দীর্ঘ সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, জীবনকে বহন করার ক্ষমতা সে হারিয়েছিল এটাই একটি মহা সত্য।

মা হয়তো বকা দিয়েছিল। বাবা হয়তো তার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিল। পৃথিবীর যেখানেই গেছে হয়তো পেয়েছে অন্যায় অবিচার অবহেলা। ভালবাসা হয় প্রতারিত হয়েছে। কিংবা জাগতিক কোনো গ্লানি! কিংবা সম্পূর্ণ ফিজিওলজিক্যাল বা জেনেটিক। তাকে কুরে কুরে খেয়েছে। জীবনের প্রতি এসেছে তাৎক্ষণিক বিতৃষ্ণা। বাঁচার উপজীব্য কিছু সে খুঁজে পায়নি।

কিন্তু সকল জাগতিক ও অন্য কারণের সাথে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কটকে মোকাবেলা করা মনে হয় সবচাইতে কঠিন। জ্ঞাতসারে বা অবচেতনে “তার জানালার ধারে
উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে দাঁড়ায়”- তাকে মোকাবেলা করা জীবনের জন্য সবচাইতে কঠিন।

“দুরন্ত শিশুর হাতে ফড়িঙের ঘন শিহরণ…মরণের সাথে লড়িয়াছে;”

ডিপ্রেশন একটি সিরিয়াস অসুখ। এটি বিষয়ে আমরা যতটা বুঝি, যতটা অনুমান করতে পারি তার থেকে ভয়ঙ্কর এ ব্যাধি। জেনেটিক, ফিজিওলজিক্যাল বা সাইকোলজিক্যাল এবং অনেক কারণ থাকে ডিপ্রেশনের। ‘আমি ডিপ্রেসড’ এটি বুঝতে এবং মেনে নিতে পারলে সেটা থেকে বেরুনোর পথ তৈরি হয়। ডিপ্রেশনের কাছে আত্মসমর্পণের স্পৃহা আসতে পারে। অনেকটা নির্ভরশীলতা এসে পড়ে। অনেকটা এডিকশনের মতো। অব্যাহতি চায় মন সবকিছু থেকে। সে অবস্থার আগে নিজেকে সেখান থেকে উদ্ধার করতে হবে। এটি একটি কনস্ট্যান্ট জব। উঠে দাঁড়িয়ে বারবার পিছলে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু হার মানা চলবে না। ডিপ্রেশন জীবননাশী, শক্তিনাশী! তাকে ডিফিট করতেই হবে! ওটা পার হলে কেবল একটি গোলাপের জন্য বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করবে। মাথার উপর আকাশটা নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করবে।

একটি সরল উদাহরণ ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ মানব মনের এ সঙ্কট মৃত্যু অবধি।
শুধু বলবো, নিজের বরাদ্দ সময় এ অর্থে পূর্ণ করে যাওয়া জীবনের প্রতি দায়িত্ব! এ দায়িত্ব জীবনের প্রতি! নিজের প্রতি! মৃত্যুকে বরণ করতেই হবে, অন্ধকার ফুঁড়ে একটি আলোর শিখা তাকে ধরতে হবে।

জীবন আসলে কী? অর্থহীন অর্থপূর্ণতার সাথে যুদ্ধ করে যাওয়া। জীবন কেবল সফলতা নয়। সকল উত্তর পাওয়ারও নয়। আলবেয়ার কামুর “মিথ অফ সিসিফাস” এর মতো এ জীবন। দেবতারা সিসিফাসকে চিরকাল একটা পাথর পাহাড়ের চূড়ায় উঠানোর শাস্তি দেন, যেখান থেকে পাথরটা নিজের ভরেই আবার নিচে পড়ে যাবে। সিসিফাস তখন আবার উঠে দাঁড়াবে। আবার যাত্রা শুরু করবে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠার আগে আবার গড়িয়ে পড়বেন। আবার উঠে দাঁড়াবেন। এটি জীবনের একটি প্রতীকী রূপ।

সার্তের কথা দিয়েই শেষ করি। সার্ত মানুষের অসীম স্বাধীনতার কথা বলে গেছেন। এও বলেছেন, মানুষ তাই যা সে অভিপ্রায় করে। কিন্তু মৃত্যু আর কিছু না, সে মানুষের সে অভিপ্রায় ও পরিকল্পনাকে হরণ করে মানুষের স্বাধীনতাকে কেবল সীমিতই করে না, প্রকৃতপক্ষে সব স্বাধীনতার অবসান ঘটায়।

সবশেষে, কাজই স্বাধীনতা। স্বাধীনতাই জীবন। আর কর্ম ছাড়া স্বাধীনতা অর্থহীন, অস্তিত্বহীন। ”কাজের মাধ্যমে যা প্রকাশিত হয় তার বাইরে আর কোন সত্যতা নেই। মানুষ যা অভিপ্রায় করে তা ছাড়া সে কিছু নয়। তার কাজের সমষ্টি সে। তার জীবন। আর তার জীবন যা তার বেশী সে কিছু নয়।”- Jean-Paul Sartre

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.