ডিজিটাল বাংলাদেশে খলিফা এখন মিয়ারাই

শামীমা জামান:

ডাঃ মোহাম্মাদ রিয়াদ সিদ্দিকী। সৌম্য, শান্ত, নিপাট ভদ্রোচিত চেহারা। সমাজের মানুষের কাছে তিনি ভদ্রলোক বলেই পরিচিত। চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ (যার যে বিষয়ে আগ্রহ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া ভোলায়ও রয়েছে তার একটি চেম্বার যেখানে তিনি নিয়মিত রোগী দেখেন। ঘটনার সূত্রপাত ওখানেই।

সতের বছরের কলেজ ছাত্রীটি (ভিক্টিম এর নাম না বলার অভ্যাস করি, অপরাধীর নাম বার বার বলি) সেখানেই গিয়েছিল তার চর্ম রোগের চিকিৎসা নিতে। ডাঃ সাহেব পরম যত্নে মেয়েটিকে মৃদু ধমকে নিজে হাতে মলম লাগিয়ে দেন ক্ষত স্থানগুলোতে। আহা ! কী মানব দরদী ডাঃ। ফাদার তেরেসা! সাথে তার ভিতরের শেয়ালটি খুব খেয়ালে একটু বেখেয়ালী অজুহাতে মেয়েটির নারী অঞ্চলে হাত বুলিয়ে নেয়। এ আর এমন কী! ডাক্তার হলে এমন একটু করাই যায়। ঘটনা এ পর্যন্ত হলে তা ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। যা মেয়েরা লজ্জায় অপমানে চেপেই যায়। পত্রিকার পাতায় কোনদিন ছাপা হয় না।

মেয়েটিও তাই করেছিল। লজ্জায় কাউকে বলেনি ঐ কুৎসিত অভিজ্ঞতার কথা। দ্বিতীয় দিন চিকিৎসা নিতে গেলে মেয়েটির সাথে একই ঘটনা ঘটে। এবার মেয়েটি বাঁধা দিয়ে চিৎকার করতে গেলে তাকে তার ওড়না দিয়ে চেপে মুখ বন্ধ করা হয়। তবে এবার শুধু মেয়েটির কাপড় খুলে মলম লাগিয়ে আপত্তিকর স্পর্শ করেই ছাড়া হয়নি। ধর্ষণ করে মোবাইল ফোনে ভিডিও করে রাখা হয়। কাউকে বলে দিলে সে ভিডিও ছাড়া হবে বলে মেয়েটিকে হুমকিও দেয়া হয়।

ওদিকে মেয়েটির অশিক্ষিত বাবা-মাকে বলা হয় মেয়েটির মরণব্যাধি হয়েছে। ঢাকায় নিয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন। সেই মতো তাকে ঢাকায় আনা হয়। মেডিকেল বোর্ড বসানোর কথা বলে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বি ব্লক এর চতুর্থ তলার নির্জন কক্ষে। ওপর থেকে ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়ে আবারও ধর্ষণ করা হয় সেখানে।

মামলা হয়েছে। অসুস্থ মেয়েটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ এর ২২ ধারা মোতাবেক উপরোক্ত জবানবন্দী দেয়। ডাঃ সাহেব পলাতক। ঘটনাটি মাত্র দুদিন আগে পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়। তবে এ নিয়ে তেমন তোলপাড় তোলেনি সুশীল বা নারীবাদী মহল। যেমনি তোলপাড় হয়নি কদিন আগে ঘটে যাওয়া আরো একটি ধর্ষণ এর ঘটনায়। যার আসামী ছিলেন সংগীত শিল্পী আনুশেহ আনাদিল এর ভাই। বরং এক নারী লেখককে দেখলাম ভিক্টিম মেয়েটি কেন উক্ত ছেলেটির সাথে শুতে গিয়েছিল বা ছেলেটিকে পাওয়ার জন্য ফাঁদ পেতেছে এইসব যুক্তি দিয়ে একটি লেখা লিখেছেন। ঠিক যেমন করে সঙ্গীত শিল্পী কৃষ্ণকলির স্বামীকে নিয়েও সবাই চুপ ছিলেন। আসলে অপরাধীর ক্ষমতার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে।

সম্প্রতি পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া শিশু জয়নাব ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে গোটা বিশ্ব তোলপাড়। সিএনএন, আল জাজিরা গুরুত্বের সাথে দেখাচ্ছে নিউজটি। অথচ খোদ পাকিস্তানে এমন ঘটনা আরও অনেক ঘটে থাকলেও জয়নাব এর পরিবারের অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার কারণে বিষয়টি এতো আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে।

আমাদের দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই যে এতো এতো ধর্ষণ, এতোসব গা শিউরানো কাহিনী, বাসে, ট্রেনে, স্কুলে, হাসপাতালে। কর্পোরেট অফিসগুলোতে তো উন্নতি করে ফেলা মেয়েগুলো এক প্রকার জীবনের অংশ বলেই যৌন হয়রানিকে মেনে নিয়ে তর তর করে উপরে উঠে যায়। যারা মেনে নিতে পারে না তারা পিছে পড়ে রয়। নতুবা সাধের চাকরিটাই খুইয়ে দেয়।

সে আরেক অধ্যায়। কিন্তু কর্মস্থল বা স্কুল, কলেজ , এমনকি চলন্ত বাসে এমন সব ব্যস্ত পরিবেশে যেখানে আসলে মানুষ কেবল তার প্রয়োজনে ছুটে চলেছে, এই ছুটে চলার সময়ে মানুষের কেন অদম্য যৌন জাগরণ ঘটবে? এর কারণ কী? মেয়েদের অশ্লীল পোশাক? কিন্তু তনু তো হিজাবী মেয়ে ছিল। আর এদেশের ৮০ ভাগ মেয়ে এখন হিজাবধারী হয়ে হিজাবকে জাতীয় পোশাকে রূপান্তরিত করার যাত্রায় ধেয়ে চলেছে। তারপর ও পুরুষের জিহবা কেন নারীকে তেঁতুল ভেবে লালা ফেলে!

একটা বিষয় তো অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। স্মার্ট ফোন ছাড়া এখন আমাদের জীবন বলতে গেলে অচল। যার পেটে তিন বেলা ভাল খাবার জোটে না, তারও একটি স্মার্ট ফোন আছে। থাকতেই হবে। চালের দাম বাড়লেও ফোন এর দাম দিন দিন নিম্নগামী। ওয়াই ফাই সুবিধা এখন সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। বলতে গেলে বিনা পয়সায়, লোকের অগোচরে যে কাজটি এখন করা যায় সেই কাজটি আগে করতে গেলে মানুষকে নানা আয়োজন করতে হতো।

ভিসিআর এর যুগে ,পাড়ার ভিডিও ক্লাব এ ঢুকে ডানে বায়ে তাকিয়ে ‘ভাই একটা ইয়ের ছবি দেবেন?’ এই কথাটি কজন বলার বদ সাহস রাখতো? অথচ আজ বাসের মধ্যে ঢুলতে ঢুলতে ও সামনে বসে থাকা অসহায় মেয়েটিকে দেখে হাতের মুঠোর মিয়া খলিফা, সানি লিওনদের কথা মনে পড়ে যায়। বাসের ড্রাইভার বা সভ্য ডাক্তার সবাই তখন মানুষ থেকে পশু হয়ে ওঠে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে। এখন মানুষের বিনোদন এর প্রধান মাধ্যমই এই স্মার্ট ফোন।

বই বলতে যে একটি বিনোদন এর কোনো মাধ্যম কোন কালে ছিল, তা কেবল ইতিহাস। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ আজ আর নেই। নীতি নৈতিকতা শূন্য একটা ভোগবাদী সমাজ এই আমরাই তৈরি করে ফেলেছি। এ থেকে উত্তরণের পথ কী? জৈবিক চাহিদা পশুকেও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পশুকে বুদ্ধি, বিবেক দেওয়া হয়নি। তাই পশু, ধরুন কুকুর একটা নির্দিষ্ট ঋতুতে কুকুরীর পিছু ছোটে। আপনি পুরুষ, আপনি কেন পশুর আচরণটি করবেন?

আপনাদের কেউ সন্ন্যাসী হতে বলেনি। তিনবেলা খেলে একবেলা আপনি হাগতেই পারেন। সেক্ষেত্রে টয়লেট এ না গিয়ে আপনি কি রাস্তা ঘাটে গু ছড়ান?
ভুলে যাবেন না, আপনাদের যাদের সঙ্গী অথবা বিবেক নেই তাদের জন্য ব্রথেল আছে। কেন অন্যের নিরীহ জীবনকে এভাবে বিপন্ন করে নিজের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলে সমাজকে কলুষিত করে চলেছেন?

শেয়ার করুন:
  • 7.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.4K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.