সুমনার পথে হাঁটেনি নয়না

0

ফারজানা নীলা:

নয়না জানে তার টাকার প্রয়োজন কতোটুকু। টাকা ছাড়া সে  ছারখার হবে, সাথে তার পরিবারও ধ্বংস  হবে। নিজের ক্ষতি মেনে নেওয়া যায়, পরিবারের ক্ষতি মেনে নিবে কীভাবে? কী না করেছে এই পরিবার তার জন্য!

তার মা মানুষের বাসায় কাজ করে তার পেট ভরেছে, পড়ালেখার খরচ জুগিয়েছে। হোস্টেলে থেকে পড়াশুনার সময় নিজের খরচ নিজেই যোগাতো সে, তবু তার মা তাঁকে প্রতিবার আসার সময় ৫০০ টাকা ধরিয়ে দিত হাতে। হাজার বারণ করা সত্ত্বেও এই টাকা না নিয়ে সে কখনো আসতে পারেনি। নিজে ছেঁড়া সোয়েটার পরে মেয়ের জন্য ভালো সোয়েটার কেনার টাকা জমিয়েছে।

একটাই আশা ছিল তার মায়ের, মেয়ে বড় হয়ে তাঁকে একটা ভালো বাড়িতে রাখবে। আজ নয়নার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার সময় এসেছে। নয়না বড় হয়েছে, পাশ দিয়েছে, চাকরি নিয়েছে। চাকরির বয়স ছয় বছর হয়েছে। কিন্তু ভালো বাসা কেনার টাকা হয়নি। কীভাবে হবে? কখন হবে? এই চিন্তায় তার চোখের নিচে রেখা জমছে। একটা উপায় আছে, উপায়টা সে দেখছে সুমনার কাছে। তার জুনিয়র। মাত্র এক বছর হয়েছে জয়েন করেছে। কিন্তু কী চমৎকার উপরে উঠে যাচ্ছে সে।

কীভাবে? 

নয়না জানে কীভাবে! যদিও বুঝে পায় না সুমনার এতো লেনদেনের কী দরকার ছিল? খুবই সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছে সে। স্বামীও অনেক বড়লোক। স্বাভাবিকভাবে কাজ করে স্বাভাবিক আয় তার জন্য প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। তবু কেন এই দেওয়া নেওয়া? কীসের অভাবে সুমনা নিচে নেমে গেলো?

নয়না জানে না। জানতে চায়ও না। তার অভাবের বিপরীতে জগতের কোনো নৈতিকতার, কোনো সততার দাম নেই তার কাছে। সততা দিয়ে সুখ না মিললে সততার সে ধার ধারবে না।  

প্রতিদিনের চেয়ে আজ একটু বেশি সেজেছে নয়না। আলাদাভাবে দেখা করবে সে স্যারের সাথে। সময় গড়াচ্ছে। স্যারের ডাক সে পাচ্ছে না। অস্থিরতায় তার ঘাম বেয়ে যাচ্ছে । ডাক পায় অবশেষে। ডেস্ক থেকে বের হতেই দেখে সুমনা বের হয়েছে স্যারের রুম থেকে। ঠোঁটের  লিপস্টিক কি সামান্য ছড়ানো? কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা রাগ মাখানো চোখে আগাগোড়া দেখে নেয় সুমনাকে। 

“ও পারলে আমিও পারবো। আমি এতোদিন কাজ করেও যা পাচ্ছি না, তা সুমনা এক নিমিষেই এসে পেয়ে যাবে? কিছুতেই না। আমার প্রাপ্য আমি বুঝে নিবো, যেভাবেই হোক” মনে মনে কথাগুলো রোবটের মতো বলে বলে নয়না ঢুকে স্যারের রুমে। 

দরজা বন্ধের সাথে সাথে বুকটা ধক করে উঠলো। কী বলবে, কীভাবে অগ্রসর হবে, কী করতে হয়? যে ফাইলটা ধরে রেখেছে সেটি মনে হয় এখনই পড়ে যাবে নিচে। স্যার কথা বলছে। কী বলছে কিছুই শুনছে না নয়না। কানে শোঁ শোঁ  শব্দ ছাড়া কিছুই ঢুকছে না। পৃথিবী শব্দ শূন্য। এতো আলোর মাঝেও সে চোখে অন্ধকার দেখছে। পৃথিবী আলোহীন। ব্ল্যাকহোলের অসীমতা নয়নাকে গ্রাস করছে। তলিয়ে যাচ্ছে অতলে। তার পানি দরকার। এক গ্লাস বরফ শীতল পানি। 

“সম্ভব না, এ সম্ভব না আমার পক্ষে। ক্ষমা করো মা, তোমাকে হয়তো দিতে পারবো না তোমার স্বপ্নের বাসা”। 

হঠাৎ সম্বিত ফিরে পায় স্যারের কথা কানে গেলে। 

“ব্যাপার কী? কথা শুনছো না? এভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছো কেন? শরীর খারাপ নাকি? 

“জ্বী স্যার?”

“ কী বলেছি এতোক্ষণ শুনেছো? ঠিক আছো তুমি? 

“জ্বী স্যার?”

“আরে হলো কী তোমার? তোমার প্রমোশন হয়েছে। কথাটা কানে গিয়েছে? তুমি এখন জেনারেল ম্যানেজার”।

জীবনে এর চেয়ে বেশি কি বিস্মিত হয়েছে নয়না? এর চেয়ে চমৎকার কোনো কথা কি শুনেছে আগে? তার সমস্ত ইন্দ্রিয় এর চেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছে কখনো? 

একটি তৃপ্তির ঢোক গিলে নয়না স্যারকে ধন্যবাদ দেয়। টলতে টলতে রুম থেকে বের হয়ে ডেস্কে যায়। 

ফোন করে মাকে। “মা তোমার স্বপ্নের বাসা নেওয়া হবে এবার”।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 239
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    239
    Shares

লেখাটি ২,১০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.