‘বৈষম্য’ যুব সমাজের অবক্ষয়েরই প্রতিরূপ

শিল্পী জলি:

মাঝেই মাঝেই ইউটিউবে শর্ট ফিল্ম দেখি। এক কথায় অতি চমৎকার সেগুলো, একটির চেয়ে আরেকটি উন্নত। মূলত হিন্দি অথবা ইংলিশ। এই ফিল্মগুলোর পরিচালক, পাত্র-পাত্রীরা খুব বেশি নামকরা নয়, আবার তাদের বাজেটও কম। তথাপি দেখতে বসলে কেমন যেন নেশা ধরে যায়। অধিকাংশ গল্পের কাহিনীই (প্লট) অসম্ভব ভালো, উন্নত চিন্তার ফসল। এতে সমাজের জন্যে শক্তিশালী মেসেজও থাকে, যা মানবিকতা বৃদ্ধির সহায়ক। দেখলে মনে হয়, ইশ্, আমি কখন বানাবো?

বাংলায় এখনও তেমন কোনো শর্ট ফিল্ম দেখিনি, যা মনে তেমন দাগ কেটেছে।

একবার একটি শর্টফ্লিম দেখেছিলাম ডিমেনশিয়ার উপর–এক বৃদ্ধা রাতে অতিথিকে ফার্ম হাউজে থাকতে দিয়ে লক করে চলে যায় ভ্যাকেশনে। ফিল্মটির শেষে ছিল মহা চমক, ভয়ে শরীরের পশম শির শির করে ওঠে, এবার কী হবে ভেবে! আবার কয়েকটি শর্ট ফিল্ম দেখলাম এ্যারেঞ্জড ম্যারেজ, কিছু আবার নানাবিধ রোগব্যাধির উপর। সবই উন্নত ভাবনা, আন্তরিকতা, এবং সৃষ্টিশীলতার ফসল–ভালো না লেগে পথ নেই।

কিছুদিন আগে হিরো আলমের একটি সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম। যেখানে তিনি তার জীবন সংগ্রামের কথা বলেছেন, লোকে তাকে নিয়ে কেমন হাসিঠাট্টা করে সেসব বললেন, অতঃপর নিজের মতামত দিলেন। তাঁকে নিয়ে লোকে যতই হাসাহাসি করুক না কেন, তার কথা শুনলে আপনা-আপনিই তার প্রতি শ্রদ্ধা জেগে ওঠে। উপলব্ধি হয়, মানুষ হিসেবে তিনি মানবিক গুণাবলীর অধিকারী, পরিণত, এবং উন্নত মানের। তার জীবনবোধ আছে, যদিও একাডেমিক পড়ালেখা তেমন নেই। আর মানুষের প্রধান গুণাবলীও মানবিক গুণাবলীই।

সম্প্রতি, ‘বৈষম্য’ নামের একটি বাংলা শর্ট ফিল্ম দেখলাম। যার কাহিনীতে একটিও যৌক্তিক তথ্য নেই, কোনো মানবিকতার আহ্বান নেই, সৃষ্টিশীলতারও কোনো নামগন্ধ নেই। সমাজকে বিপথগামী করতেই যেনো ফিল্মটির সৃষ্টি। ফিল্মটি যেসব যুবকরা মিলে বানিয়েছে, তাদের না আছে যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা, না আছে উদারতা, না আছে সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা।

ফিল্মটি মূলত লৈঙ্গিক বৈষম্য বৃদ্ধিতে উস্কানির কাজ করবে। ওদিকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী তাদেরকে ফলো করছে, উৎসাহিত করছে। তাই তারা বুঝতেও পারছে না সমস্যা কোথায়? তাদের চিন্তাধারায় লজিক্যাল চিন্তা করার কোনো ক্ষমতাও নেই। তাদের উদ্দেশ্য যদি মহৎ হতো, তাহলে অবশ্যই ভালো কিছুর সৃষ্টি হতো। কিন্তু মেয়েদের প্রতি তাদের রক্তে কোন রেসপেক্ট না থাকায় তারা বুঝতেও পারছে না কী বলছে তারা? কেন লোকে ছিঃ ছিঃ করছে? অক্ষমতা কিসের? কোথায়?

ফিল্মটি রাখবে কী রাখবে না সেটাই এখন তাদের মূল চিন্তা। যদি অধিক সংখ্যক জনগণ বলে, রাখো, তাহলে তাদের রাখতেও তেমন আপত্তি নেই। বরং ভবিষ্যতেও তারা আরও বানাবে এভাবে সমাজ উন্নত করতে। হায়, যাদের লজিক এমন, চিন্তার ভাবধারা এমন, ভবিষ্যতে তারা আর এমন কী বানাবে যদি না নিজেদের সংস্কার ঘটায়?

ফিল্মটিতে বলা হয়েছে, কোনো মেয়ে পাবলিক প্লেসে যেন স্মোক না করে, মেয়েরা পাবলিক প্লেসে স্মোক করলে পরিবেশ নষ্ট হয়, এবং কোনো মেয়েকে স্মোক করতে দেখা গেলেই তার ভিডিও করে ছড়িয়ে দেবার আহ্বান করা হয়েছে। আবার বার্তা দেয়া হয়েছে, ছেলেরা পাবলিক প্লেসে শার্ট খুলতে পারলেও মেয়েরা যেহেতু শার্ট খুলতে পারবে না, অতএব তারা পাবলিক প্লেসে ধূমপান করতে পারবে না, সেইসাথে মেয়ে হিসেবে বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে সুবিধাও চাইতে পারবে না। বাসের সিটসহ মেয়েদের সুবিধা নিয়েও রকমারি কটাক্ষ করা হয়েছে। সেইসাথে দেখানো হয়েছে একই বয়সের একটি ছেলে একটি মেয়েকে কন্ট্রোল করতে কিভাবে মরীয়া হয়ে উঠতে পারে, যেনো শুধু মেয়ে হবার কারণে সমাজে মেয়েদের নিজেদের কোন স্বাধীনতা থাকতে নেই।

তাই সমাজের একজন তৃতীয় শ্রেণির বাইরের পুরুষও চাইলে তাকে তার ইচ্ছেতে দমন করতে পারে, চলতে বাধ্য করতে পারে। এক কথায় লিঙ্গ বৈষম্য কাকে বলে, কত ভয়াবহ দেখতে হলে, বুঝতে হলে ফিল্মটির জুড়ি মেলা ভার। অথচ তারা জানেই না স্মোকিং কোনো মানুষের খারাপ বা ভালোর পরিমাপক নয়। এর কোন লিঙ্গভেদ নেই। এটা শুধু স্বাস্হ্যের জন্যে ক্ষতিকর। তাই নারীপুরুষ কারোরই সবখানে সবসময় ধূমপান করা উচিত নয়। তাই নিজেরা বন্ধ করতে পারলে ভালো। আবার না করলেও যেন অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখা সবার কর্তব্য।

আমেরিকাতে ডাক্তার দেখাতে গেলে নারী-পুরুষ সবাইকেই জিজ্ঞেস করা হয় তারা স্মোক করে কিনা? মদ খায় কিনা? ড্রাগ আসক্ত কিনা? সেক্স লাইফ একটিভ কিনা? পার্টনার মেইল না ফিমেল? এসবের কিছুই মানুষের চরিত্রের পরিমাপক নয়, তবে কিছু কিছু বিষয় হয়তো ক্ষতিকর। এগুলোর কোনো লৈঙ্গিক ভেদাভেদও নেই। তবে সমাজে যেনো সবাই আরও ভালো থাকতে পারে এ কারণে নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ করা হয় যেনো ভবিষ্যতে সহায়তা আরও বাড়ানো যায়, সমাজে সবাই উপকৃত হয়।

‘বৈষম্য’ ফ্লিমটি যারা বানিয়েছে তাদের কথাবার্তায় মনে হলো তারা জানেই না আমাদের দাদি-নানিরও দাদি-নানির যুগ থেকেই গ্রামে-গঞ্জের অনেক নারী বিড়ি-হুক্কা-তামাক খেতো এবং লোকজনের সামনেই। শহরেও এমন দেখা যেতো, এখনও দেখা যায়, এবং এটাই স্বাভাবিক। ধূমপান ব্যক্তিগত একটি বিষয়, যেখানে এরিয়া নির্ধারণ করে দেয়া গেলেও আইন নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই একইভাবে প্রযোজ্য।

যাই হোক, তারা শুধু ইউটিউব ভিডিওই বানাননি। এখন লাইভে এসে মতামতও দিচ্ছেন ঐ ভিডিওর স্বপক্ষে। বললেন, আমেরিকাকে অনুসরণ করা হলে মুসলিম কান্ট্রি সৌদি আরবকে কেন অনুসরণ করা হবে না, তারাও তো কম উন্নত নয়? আবার মুসলিমও!

সমস্যা ওখানেই। দেশে পরতে পরতে সৌদি ধারার চিন্তা ঢুকে গিয়েছে কিশোর-কিশোরী এবং তরুণদের মগজে। তাদের মাথা ওয়াশ করা বলতে গেলে শেষের পর্যায়ে। জঙ্গিবাদ তারই ফসল আমরা অলরেডি দেখেছি। অতি ইসলামিক ভাবধারার প্রবাহিত হয়ে নারীকে অবদমন করতে গিয়ে নিজেদের অধঃপতন দেখতে হলে সৌদির ধামাধরা হওয়ার বিকল্প হলো পাকিস্তান, আফগানিস্তান….তেমনই চলছে, হয়তো চলবেও।

তারা বললেন, ভিডিও ছড়াছড়ির পর তাদের নাকি কোনো কোনো চ্যানেল ডাকছে। খাইছে! খুশীতে তারা আটখানা। অথচ বুঝতেই পারছে না, এই ডাকার মানে কী?

লোকে ভিডিওর বিপক্ষে বলায় যুক্তি দিতে লাইভে গিয়ে তারা যে যুক্তিগুলো দেবার চেষ্টা করছে, সেগুলো শুনলে মাথা খারাপ হবার দশা। একযোগে দেশবাসী টিভিতে তাদের দেখলে কী ভাববে?
আর বিদেশীরা তাদের দেখলে, বুঝলে, দেশকে কী ভাববে?
এরা কারা? বাংলাদেশীই তো?

একজন না পড়ুয়া মানবিক রিক্সাচালকও বোঝে মানবিকতা কী, লৈঙ্গিক সমতা কী এবং কেন, অথচ তারা বোঝে না।
দেশে বাবা-মায়েরা আজকাল ধর্মের নামে কী শেখাচ্ছে তাদের সন্তানদের?
শুধু নারীকে কন্ট্রোল করা?
এভাবে নারীকে কন্ট্রোল করে কি সমাজ টিকে থাকবে?
কতদিন?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.