হিজাব বিভ্রান্তির এক টুকরো বস্ত্রখণ্ড

শেখ তাসলিমা মুন:

ধর্মীয় আইডেন্টিটি প্রকাশে সব ধর্মেই কিছু না কিছু পোশাক বা চিহ্ন আছে। পুরোহিত, র‍্যাবি, প্রিস্ট, মৌলানা, সাধু গুরুর পোশাক, ইউনিফর্ম ইত্যাদির মেজরিটি পুরুষ। নারীর ক্ষেত্রে হিন্দু এঁয়োতি নারীর সিঁদুর-শাঁখা, মুসলিম নারীর হিজাব বুরকা নিকাব।

দুটো দু ধরনের পুরুষতান্ত্রিক বিধান। হিন্দু রমণীদের তাদের স্বামীদের দীর্ঘায়ু কামনা করে পালন করতে হয় এ চিহ্ন। মুসলমান নারীকে আপাদমস্তক ঢেকে চলতে হয়, তার শরীরের প্রতি যাতে পুরুষেরা আকৃষ্ট হতে না পারে। এ নিয়ে আমি বেশ কয়েকবার লিখেছি। আজ আমি হিজাব কী সে বিষয়ে আর বলতে চাই না, বরং হিজাব কীভাবে আজকের তরুণ মুসলিম জেনারেশনের কাছে আন্ডারস্টুড এবং ব্যবহৃত, সেটি নিয়ে কথা বলবো।

ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক রিফিউজি আগমনের কারণে এখানে হিজাব দৃশ্য খুব কমন। বাংলাদেশ থেকে আগত বিপুলসংখ্যক বাঙালি নারী যে তাদের ‘কায়দায়’ হিজাব পরতে শুরু করে অনেকটা প্রভাবিত হয়ে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। রিফিউজি অধ্যুষিত এলাকায় বাস করলে এ ধরনের প্রভাব ব্যক্তি জীবনে পড়ে।
তবু এটি সত্য, তারা আমাদের শাড়ি নেয়নি, আমরা তাদের হিজাব নিয়েছি। গত কয়েক বছরে দেশেও এ ঢেউ পৌঁছে গেছে যখন, তখন এখানকার ‘গেটো’ জীবন যে ইমিগ্রান্টদের মেইন্সট্রিম থেকে বিচ্ছিন্ন সেখানে তাদেরকে কিছু বলার নেই।

আমার উপরতলায় এক সময় মরক্কোর এক পরিবার থাকতো। মহিলার নয় বাচ্চা। এক বিকেলে গরুর মাংসের পাতলা ঝোল, পিটা ব্রেড আর একটি গলা আটকানো হিজাব নিয়ে হাজির হলো। ‘তোমাকে উপহার দিলাম’। জিনিসটি গেঞ্জি ধরনের একটি টাইট টুপির মতো। টাইট হয়ে মাথায় চেপে থাকে। মাথা এবং গলা টাইট করে ঢেকে রাখে। এ বিষয়টির উপর প্যাঁচাতে হয় আড়াই মিটার কাপড়। সেটি সেপারেট। আমি টুপিটি রেখেছিলাম। এর আগে আমি জিনিসটি হাতে নেড়ে দেখিনি।

বলছিলাম, ইউরোপে হিজাব এখন খুব কমন। এখন অফিস আদালতের জবেও হিজাব খুবই সাধারণ পোশাক হয়ে গেছে। বড়রা ছাড়াও এখানে জন্ম নেওয়া একটি বড় গ্রুপ অল্পবয়সী মেয়েরা এটি পরে। যাদের জন্ম ইউরোপে। কেন আমি এ গ্রুপটি নিয়ে লিখতে বসেছি তার কারণ, হিজাব বিষয়টি তারা ধর্মীয় বিধান হিসেবে ব্যবহার করে না, ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’ হিসেবে পরে। দুটোই একজন মুসলিম নারীর জন্য দরকারি, এবং অবশ্য পালনীয়, বুঝলাম, কিন্তু এ কাপড়টির তাৎপর্য তারা মিস করে যাচ্ছে, সেটাই মূল কথা।

ন নামের মেয়েটির এদেশে জন্ম। পরিবার যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসে এদেশে আশ্রয় গ্রহণ করা অভিবাসী। ন স্কুল শেষ করেছে। চার বছর থেকে হিজাব পরে। ন নেট ডেইট করে। তার বেশ সংখ্যক বয়ফ্রেন্ডস। সে হিজাব পরেই তাদের সাথে মিট করে।

ম এর বাবা-মা ম কে হিজাব দিয়েছে তার পাঁচ বছর বয়সে। স্কুলে সঙ্গীতে তার প্রতিভা প্রকাশ হয়। মেয়েটি গানের একটি গ্রুপে যায়। খুব ভালো গান করে সে। হিজাব পরে।

স এর বয়স ১৭। সে একটি ড্যান্স ব্যান্ডে আছে। মাথায় কালো হিজাব পরে স্টেজে ছেলেদের সাথে নাচে সে।

প এর জন্ম ইউরোপে। তার মাথায়ও কালো হিজাব। তার ইউরোপিয়ান সাদা বয়ফ্রেন্ড। তারা কেবল ওর‍্যাল সেক্স করে। কারণ সে বিয়ের রাত পর্যন্ত তার ভার্জিনটি রক্ষা করতে বাধ্য।

আমি নেটে কিছু মুসলিম নারীর পর্নো পাতা খুঁজে পেলাম। তারা শরীরকে প্রদর্শন করছে, কিন্তু মাথায় হিজাব।

বিষয়টি ক্লিয়ার হবার জন্য আমাকে এ কেইসগুলো স্টাডি করতে হয়েছে। আমি গভীর সঙ্কটে পড়েছি। এদের সকলকে আমি জিজ্ঞেস করেছি, তুমি হিজাব পরো কেন? সাথে সাথে উত্তর, ‘আমি মুসলিম’। তাদের মুখের অভিব্যক্তিতে ইসলাম বিষয়ে তারা এর থেকে বেশি জানে বলে মনে হয়নি।
‘আমি মুসলিম তাই হিজাব পরি।’
আমার পরবর্তী প্রশ্ন, তুমি কি জানো, হিজাব কেন পরা হয়? তুমি কি জানো, মুসলিম মেয়ের ডেইটিং নিষিদ্ধ? মিউজিক এবং ড্যান্স? অন্য পুরুষদের সাথে স্টেজে ড্যান্স করা কি ইসলাম এলাও করে? উত্তর ‘মে বি নট!’

তাহলে করছো কেন?

একেক জনের উত্তর একেক রকম। কিন্তু হিজাব তাদের ‘আইডেন্টিটি’। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। আমার বক্তব্য, তাহলে ধর্মের নামে কেন? ধর্মীয় বিধানের নামে কেন? মূলত, সে উত্তর আমি পেয়েও যাচ্ছি। সে মিউজিক করছে, সে স্টেজ ড্যান্স করছে, সে ডেইটিং করছে, নিজের জন্য যেটি গ্রহণযোগ্য তেমন টাইপের সেক্সও করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘হিজাব পরে’। হিজাব তার ধর্ম মানার একটি বর্ম হয়ে গেছে। মাথায় হিজাব মানে সে মুসলিম। ধর্মীয় ‘পরিচয়’। এ পরিচয়ই আসল কথা। মূল কথা।

কিন্তু হিজাব যদি ‘ইসলামিক অনুশাসন’ হবে, তাহলে উপরের কাজগুলো হিজাবের সাথে ১০০% কন্ট্রাডিকটরি। নাজায়েজ।

আবার ইসলামে সঙ্গীত নিষিদ্ধ। একমাত্র আল্লাহর গুণগান খালি গলায় গাওয়া মুসলমানের জন্য জায়েজ। সেটি নারী পুরুষের উভয়ের জন্য। কেবল নারীর কণ্ঠস্বর বাইরে আসার বিষয়ে নিষেধনামা আছে। এমনকি আল্লাহর গুণগান হলেও।

মিউজিক এবং ড্যান্স এমন একটি অ্যাটমসফেয়ার তৈরি করে, যা মানুষকে আল্লাহকে ভুলিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে। তারা আল্লাহ থেকে দূরে সরে যেতে পারে। সে সম্ভাবনার কারণে একজন মুসলমানের নাচ গানের সুযোগ নেই। মিউজিক মুসলমানের জন্য সুরার মতো নিষিদ্ধ। সুরা পানে যে অনুভব আসে, সেটিও তাকে আল্লাহকে ভুলিয়ে দিতে পারে বলে আল্লাহ মনে করেন। সে কারণে এ বিষয়গুলো মুসলমানের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আর এ বিষয়গুলো না মেনে মুসলমান হওয়া সম্ভব নয়।

প্রশ্ন, হিজাব কি পুরোপুরি সৎভাবে তবে মুসলিমরা তাদের ছেলেমেয়েদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে? নাকি একটি সাইনবোর্ড এবং এক ধরনের পলিটিক্যাল ‘পাওয়ার’ হিসেবে ‘ব্যবহার’ করছে তারা? এই যে ‘আইডেন্টিটি’, এটি কতোটা ধর্মীয় আর কতোটা রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের? ইসলামের বিধান হিসেবে হিজাব কি আদৌ সার্থক? কেন এ প্রবঞ্চনা? প্রতারণা?

শেয়ার করুন:
  • 503
  •  
  •  
  •  
  •  
    503
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.