বৈষম্যে প্রকট ‘বৈষম্য’

0

সেবিকা দেবনাথ:

বলা যায় প্রায় প্রতিটি নারীর জীবনেই শ্রেষ্ঠ পুরুষ তার বাবা। আমার জীবনেও তাই। তারপরই আসে ভাইয়ের প্রসঙ্গ। আমার ভাইকে এখনও পর্যন্ত কোনো মেয়ে সম্পর্কে বাজে কথা বলতে আমি শুনিনি। যে ছেলেটিকে আমি ভালবাসি সেও মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সত্যি বলতে কী ওই গুণের জন্যই তাকে পছন্দ করি। তাই পুরুষ সম্পর্কে নেতিবাচক কথা যখনই মনে আসে তখনই তাদের মুখগুলো চোখের সামনে ভাসে।

আমি কখনও ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। সব মানুষ সমান নয়। ভালো-খারাপ সবখানেই আছে। তবে নারী-পুরুষের সম অধিকারের কথা বললেই বেশিরভাগ পুরুষ অতি নিম্নমানের বস্তা পঁচা কয়েকটা ডায়ালগ দেন। নারীকে বড় করে বা শ্রদ্ধা দেখাবার ছলে তারা প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দেন। ঠারেঠুরে না, সরাসরিই তারা বোঝাতে চায়, ‘মেয়ে তুমি যা পেয়েছো/যেটুকু পেয়েছো ও-ই যথেষ্ট। যথেষ্ট দেয়া হয়েছে তোমাকে। এবার ক্ষান্ত হও।’

ফেসবুকের ইনবক্সে অনেক বন্ধু বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলের অংশবিশেষের ভিডিও দেন। সেখানে নারীদের সম্পর্কে অনেক অবমাননামূলক উক্তি থাকে। নিজ কানেও দুই-একবার অমন বক্তব্য শোনার অভিজ্ঞতা আমার জীবনে হয়েছে। তবে গতকাল ফেসবুকে শর্টফিল্ম ‘বৈষম্য’ নামের একটি ভিডিও দেখলাম। ওয়াজের আপত্তিজনক বয়ানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি আপত্তিজনক ছিল ওই শর্টফিল্ম। মহাভারতে ভীষ্মদেবের সমস্ত শরীর অর্জুন যেমন বাণে বাণে জর্জরিত করেছিলেন, ‘বৈষম্য’ দেখার পর কয়েটা প্রশ্নে আমি জর্জারিত হচ্ছি। জামা-কাপড় খোলা আর প্রকাশ্যে ধূমপান কেমনে এক হয়? সম-অধিকার কী জিনিস?

‘বৈষম্য’ যিনি নির্মাণ করেছেন তার নাম হায়াত মাহমুদ রাহাত। তার মানসিকতা, পারিবারিক ও একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে যথেষ্ট মাত্রায় প্রশ্ন আছে আমার। একটি মেয়ের প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া নিয়ে একজন কিশোর/তরুণের মুখে তিনি যে ভাষায় ও সুরে কথা বসিয়েছেন, তা সত্যিকার অর্থেই স্তম্ভিত হবার মতো।

এন্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্সের (আত্মা) একজন সদস্য আমি। আত্মার সদস্য হিসেবেই শুধু নয়, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও আমি চাই, দেশ ধূমপান ও তামাক মুক্ত হবে। ধূমপান বা তামাক বিরোধী কাজে খুব সানন্দেই অংশ নেই। তামাকের বিরুদ্ধে কোথাও প্রতিবাদ হলে ভালোই লাগে। কিন্তু বৈষম্যের এই বৈষম্যমূলক প্রতিবাদে আমি আতঙ্কিত।

যারা বলেন, পুরুষ খালি গায়ে ঘুরতে পারে। মেয়েরা কি পারবে? আমার কথা হলো, কেন পারবে না? মেয়েরাও খালি গায়ে হাঁটতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হলো, পুরুষ খালি গায়ে কেন, নেংটা হয়ে হাঁটলেও মেয়েরা দ্বিতীয়বার ওই লোকটার দিকে তাকাবে না। সেটি তাদের লজ্জা বা শালীনতাবোধ যাই হোক না কেন। কিন্তু কোনো মেয়ে যদি ওই অবস্থায় হাঁটে (সে যদি মানসিক ভারসাম্যহীন নারীও হয়) তখন কিছু পুুরুষ দ্বিতীয়বার তাকাবে কী কাজ-কর্ম সব বাদ দিয়ে ওই মেয়ের পিছু পিছু হাঁটাও শুরু করবে।

এই কথা কেন বললাম, সেই প্রসঙ্গে এবার আমার দেখা একটি ঘটনা বলি। তখন আমি ইডেন কলেজে মাস্টার্সের ছাত্রী। রাজিয়া হলের পাঁচ তলায় থাকতাম। রাতে হলের গেইট বন্ধ হবার পর যখন বিদ্যুৎ চলে যেতো, আমরা তিন তলার খোলা ছাদে গিয়ে আড্ডা দিতাম। রাস্তার সারি সারি সোডিয়াম লাইটের আলোয় পলাশীর মোড়, ব্যানবেইসের সামনের দিকের রাস্তায় চলাচল করা মানুষজন দেখতাম। ওই এলাকাতেই মানসিক ভারসাম্যহীন একটি মেয়ে ঘোরাফেরা করতো। ঠিক ঘোরাফেরা না, ওই এলাকার রাস্তাতেই থাকতো। মাঝে মাঝে মেয়েটা ছেঁড়া নোংরা জামা গায়ে চাপাতো। তবে বেশিরভাগই তাকে জামা-কাপড় ছাড়াই ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। দৃশ্যটি অবশ্যই খুব একটা শোভন নয়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অশোভন ও অশ্লীল দৃশ্য আমি এবং আমার বন্ধুরা দেখেছি। মেয়েটি যখন উলঙ্গ অবস্থায় আপন মনে হেঁটে যেতো, তার পেছন পেছন অনেক পুরুষকে হাঁটতে দেখেছি আমরা। কাঠি দিয়ে তাকে খোঁচা মারতেও দেখেছি। কয়েক মাস পর তাকে গর্ভবতী অবস্থায়ও দেখেছি। এমন পুরুষও আমাদের চারপাশে রয়েছে।

যারা জামা খুলে হাঁটার মধ্যে নারী-পুরুষের সমতা দেখেন, তাদের যদি প্রশ্ন করা হয় মেয়েরা সন্তান জন্ম দিতে পারে। পুরুষ কি তা পারে, না কোনকালে পারবে? পিতা ছাড়াও সন্তান জন্ম দেয়ার কথা আমরা জানি। মাতা মেরী তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু কোনো পুরুষ কি সন্তান জন্ম দিয়ে সেই বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করতে পেরেছেন? যে কাজে অহংকার করার মতো কিছু নেই, সেই ফালতু কাজ (খালি গায়ে চলা) দিয়ে কীভাবে সম-অধিকার যাচাই করা যায়?

সব ফালতু কথা বলে বা প্রচার করে যারা সস্তায় নাম কামিয়ে জাতে ওঠতে চান তাদের বলছি, এসব করে জাতে ওঠা যায় না। জাতে ওঠতে গেলে জাতের লোক হতে হয়। আগে নিজেকে মনুষ্য জাতির একজন হিসেবে প্রমাণ করুণ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 465
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    465
    Shares

লেখাটি ১,১৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.