শর্টফিল্ম বৈষম্য ও নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ

ঈহিতা জলিল:

শর্টফিল্ম বৈষম্য দেখলাম। ১২ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের সিনেমাটিতে অভিনয়, পরিচালনা সব ভালো ছিলো। কিন্তু আর সবার মতো আমিও এটি যে ম্যাসেজ দিয়েছে, তার ঘোরতর প্রতিবাদ করছি। আমি তো টেকনিক্যাল বিষয়গুলো ভালো বুঝি না, তাও আমি এর ডিটেলস আগে বলে নিচ্ছি।

আমি যতক্ষণ দেখছিলাম তখন এর ভিউ ছিলো- ২৭৮কে, লাইক- ১৫ কে, ডিসলাইক- ২কে, শেয়ার আলাদা করে ছিলো কিনা আমি বুঝিনি। তবে সিনেমার নামের পাশে ৪কে একটা বিষয় ছিলো। ধরে নিলাম ওটি শেয়ার সংখ্যা। আর হারিকেন প্রডাকশনের সাব্সক্রাইবার হচ্ছেন – ১৭ কে।

এখন আসি এর ভিতরের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। একদম প্রথম থেকে শুরু করি। “Following the trend doesnt make you smart” আমি যদি ভুল না দেখে থাকি লেখাটা এমন ছিলো। খুব সুন্দর এবং অর্থবহ লেখা। আমার যদি ভুল না হয় does not এর শর্টফর্ম doesn’t. doesnt নয়। এরপর কিছু কথা আসে ওটার টেকনিক্যাল নাম আমার জানা নেই। ওখানে ‘ব্যাপার’ বানান ভুল। যা খুব চোখে লাগছিলো। বাক্যগঠনেও ভুল আছে ওখানে। ওখানে বলা হয়েছে, “আমরা কোনভাবে দায়ী নয়”, এটা হবে “দায়ী নই”।

যদি বলা হতো “হারিকেন প্রডাকশন দায়ী নয়” তাহলে ঠিক ছিলো। সিনেমাটিতে বাসের মহিলা সিট নিয়ে কথা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে আসলে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। আমার নিজেরও আছে যেটি ২০১২ সালে দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত হয়েছিলো, সম্প্রতি উইমেন চ্যাপ্টার সেটি পুন:প্রকাশ করেছে। তাই এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে আমি আমার লেখাকে দীর্ঘায়িত করতে চাই না। তবে মনে করিয়ে দেই, বাসে কিন্তু নয়টি সিট মহিলাদের না। এই ইনফরমেশনটা ভুল ছিলো। বাসে তিনটি সিট মহিলাদের। তিনটি শিশু-তিনটি প্রতিবন্ধী-তিনটি মহিলা। মোট নয়টি।

এবার আসি আমার খারাপ লাগার কারণে। আমি এমনিতেই স্বপ্নবিলাসী আর আশাবাদী মানুষ। আর আমার পরবর্তী প্রজন্ম নিয়ে আমি ভীষণ রকম আশাবাদী। আমি বিশ্বাস করি তাঁরা সবাই অত্যন্ত মেধাবী। এবং ওরা যে এতো কিছু করে ফেলতে পারে, এটাও আমার ভালো লাগে। আমি প্রায়ই ভাবি, আমাদের ছোট ভাই-বোন-ছেলে-মেয়ে সবার কতো বুদ্ধি!! ওরা কত কিছু পারে!! ওদের বয়সে আমাদের হাতের নাগালে এতো কিছু ছিলো না, আর থাকলেও বোধ হয় এতো কিছু আমরা পারতাম না। ওদের ড্যামকেয়ার এটিটিউডটিও বিশেষ বিশেষ সময় আমার ভালো লাগে।

কিন্তু বাবারা, তোমরা তো আমাকে হতাশ করলে। তোমরা এটা কী করলে!! যা কিছু খারাপ তাতো সবার জন্যেই খারাপ!! শুধু সেটা মেয়েদের জন্য কেনো হবে!! প্রকাশ্য ধূমপান সবার জন্যই খারাপ। আর একি খোঁড়া যুক্তি, “একটা ছেলে কাপড় খুলে হাঁটতে পারবে, একটা মেয়ে তো তা পারবে না”!!

এখন আমিও একটা খোঁড়া যুক্তি মনে করিয়ে দি, “একটা মেয়ে তো পেটে বাচ্চা নিয়ে সব কাজ করতে পারে, ছেলেরা তা পারে না”! ধরো এখন যদি মেয়েরা বলে, ‘না, আমি এতো কষ্ট করে আমার ফিগার নষ্ট করে সন্তান জন্ম দিবো না। মা ডাক শোনা তো দরকার!! আমি সন্তান পালতে আনবো। এখনও যত অনাথ শিশু আছে এতে বাংলাদেশের প্রতিটা পরিবার যদি তাঁদের এডপ্ট করে তাহলে তাঁরা একটা সুন্দর জীবন পাবে। নতুন করে বাচ্চা জন্ম দেয়ার প্রয়োজন নাই’। তাহলে কী হবে!!

আর এই যে বলা হলো, ছেলেরা কাপড় খুলে হাঁটতে পারবে। আমি তো আমার ছেলে বা ভাইকে নিয়ে ঠিক ততটাই ভয় পাই যতটা আমার মেয়ে আর বোনকে নিয়ে পাই। ছেলেদের শারীরিক নির্যাতনের হিসাবটা একটু জেনে নিও। হিন্দি সিনেমায় একটা শব্দ শুনেছিলাম, “কাস্টিং কাউচ” এটা সম্পর্কে যতটুকু বুঝেছি সিনেমায় রোল পেতে সেক্স রিলেটেড কোন কম্প্রোমাইজ। ওটা নাকি আজকাল ছেলেদেরও পোহাতে হয়!! রাস্তায় কাপড় খোলার আগে এই বিষয়গুলো একটু ভেবে দেখো বাবারা।

এবার আসি ভিডিও করে ভাইরাল করার বিষয়টা। তোমরা যে আহবান জানিয়েছো, “মেয়েদের খোলা জায়গায় ধূমপান করতে দেখলে ভিডিও করে ভাইরাল করে দেয়ার”। ঐ দুই একটাই হবে!! মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল। তাঁরা সব ভুলে যাবে। আর একটা সময় অভ্যস্ত হয়ে যাবে, যে মেয়েরাও এখন ওপেন স্মোক করে!! এই সিনেমার কারণে কী হবে জানো, যারা স্মোক করতো না তাঁরাও স্মোক করবে!! ভাববে যে কী হবে!! পুরো সিনেমা দেখে আমার একটা কথাই মনে হয়েছে, আর হাসি পেয়েছে, ঐ যে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বলে না, তর্কের খাতিরে তর্ক না করে আসুন আমাদের সাথে একই সুরে বলুন… ব্লা ব্লা ব্লা…

পুরো সিনেমাটিতে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া ছাড়া আমার আর কিছু মনে হয়নি এবং পুরোটাই একটা ছেলেমানুষী প্রয়াস ছাড়া আর কিছু ছিলো না। তবে তাঁরা চাইলে অনেক ভালো কিছু করতে পারতো। এই সিনেমাতেই যদি থাকতো ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেনো, পাবলিক প্লেসে কেউ স্মোক করতে পারবে না। তাহলে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।আর কারো অজান্তে ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা অন্য কোনভাবে ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে নিশ্চয়ই ধারণা আছে!! তাই যে বা যারা এই সিনেমা দেখে এই কাজে আগ্রহী হবে, তাঁরা আইসিটি অ্যাক্ট সম্পর্কে ধারণা নিয়ে তারপর করো। আরেকটা বিষয়, এই সিনেমা নিয়ে এতো মাতামাতির কিছু নাই। ফেম সবারই ভালো লাগে!! সেটাতে পরিচালক সফল। আর একটা বয়সে মানুষ হুটহাট অনেক কিছু করে ফেলে, পরে পরিণত হলে লজ্জা পায়। এই পরিচালক-ই যখন আরো অনেক বড় সিনেমা বানাবে, ভালো সিনেমা বানাবে, যেখানে মানুষের কথা থাকবে। সেইদিন সে অনুশোচনা করবে তাঁর এই ১২ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের সিনেমাটির জন্য।

আর আমাদের মেয়েদের কী, আমরা তো যুদ্ধ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এখন আর এসবে গুরুত্ব দেয়ার সময় নাই। কত বড় বড় ঝড় থেকে বেঁচে আসলাম। এইসব বাতাসকে পাত্তা দিলে আমাদের চলবে কেনো!! কী যেনো কথা আছে না হিন্দিতে… আমি আবার বলিউডের ভক্ত কিনা!! “কারাম কার্ ফাল কি আশা মাত্ কার্!! একটু তো খারাপ আমারো লেগেছে, তবে আমি আশা ছাড়িনি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের জন্য অস্কার আনবেই!!

তবে মনে রাখতে হবে, যুদ্ধে যে পক্ষ নারী ও শিশু হত্যা করে, নারীর অসম্মান করে, সেই পক্ষ কখনও বিজয়ী হয় না। ইতিহাস কিন্তু তাই বলে।

আবার তোমাদের কথাতেই ফিরে যাই। তোমরা প্রথমেই বলেছো, “Following the trend doesn’t make you smart” তোমরা তাহলে কী করলে? এখনো আমাদের দেশে মেয়েদের নির্যাতন করা, হয়রানি করা এটাই ট্রেন্ড। তোমরাও তো সেই সো কলড ট্রেন্ড-ই ফলো করলে!! এবার তোমরাই ঠিক করো, তোমরা স্মার্ট, নাকি আনস্মার্ট।

আর দর্শকবৃন্দ, আপনারাও ভাবুন আসলে স্মার্টনেস কাকে বলে? আপনারা নিশ্চয়ই আনস্মার্ট হতে চান না?

সবশেষে রবিবাবুর কবিতা আওড়াই,

“ওরে চারিদিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর—
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।।

১৪.০১.১৮
রবিবার
সময়: বিকাল ০৩.১৩ মিনিট।

শেয়ার করুন:
  • 252
  •  
  •  
  •  
  •  
    252
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.