২০১৮ সাল: যৌন বিকৃতি আর হয়রানির নতুন অধ্যায়

সাদিয়া রহমান:

বৃদ্ধা, বালিকা, তরুণী, কিশোরী অর্থাৎ নারী মাত্রেই তাকে গণিমতের মাল বলে মনে করা এবং তার ওপর আধিপত্য চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস একটা বিশ্বজনীন সমস্যা। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে, পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে এর মাত্রাভেদ হতে পারে মাত্র কিন্তু এই মনোভাবের অস্তিত্ব সদা বিরাজমান।

ঘুরে-ফিরে সেই মধুমিতা পান্ডের গবেষণালব্ধ ফলে ফিরে যেতে হয়।
এই যে মনোভাব, এই যে চিন্তা চেতনা তা কি প্রকৃতিগতভাবে সমাজ তথা পুরুষেরা পেয়ে থাকে নাকি একটা সমাজ ব্যবস্থা এই জাতীয় ধারণার জন্ম দেয়! বহু বছরের সামাজিক অভ্যাস এই চেতনাকে শাণ দেয় নাকি কিছু পুরুষ বিকৃত হয়ে জন্মায় বলেই এমন হাস্যকর ধারণা লালন করে ক্ষান্ত হয় না, বরং তা বাস্তবায়নেও উদ্বুদ্ধ হয়।

২০১৮ সাল শুরু হয়েছে মাত্র ১৪ দিন, কিন্তু দিক দিগন্ত থেকে নারীদের ওপর জোরপূর্বক অধিকার চর্চার কুৎসিত রূপ ইতোমধ্যেই পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। জানুয়ারির পাঁচ তারিখ, নিউ ইয়ার ইভ এর রেশও হয়তো তখনো পুরোপুরি কাটেনি সেরকম একটা সময়েই পাকিস্তানের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো জয়নাবের জন্য। মাত্র সাত বছর বয়সী জয়নাব তাকে ধর্ষণ করে খুনের পরে ফেলে রাখা হয়েছিলো আবর্জনার স্তুপের ভিতরে।

তবে হ্যাঁ পাকিস্তানও প্রতিবাদের ভাষা শিখে নিয়েছে। পুরো পাকিস্তান উত্তাল হয়ে ওঠে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে। জয়নাবের বাবা-মা ঘোষণা দেন তারা খুনিদের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সন্তানের লাশ দাফন করবেন না। আন্দোলন, প্রতিরোধ প্রায় দাঙ্গার পর্যায়ে চলে যায় এমনকি থানা জ্বালাও পোড়াও-ও হয়ে যায়। সেই প্রতিরোধের আগুন এখনো জ্বলজ্বল করছে, তার মাঝেই পেশাওয়ারের ব্রেখনা হত্যাকাণ্ড নতুনভাবে সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে।

ব্রেখনা পেশায় একজন নৃত্যশিল্পী। আলী আকবর আফ্রিদী নামে এক ব্যক্তি তার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। ব্রেখনার বাবা যখন সেই প্রস্তাবে অসম্মতি জানায় তখন আকবর আফ্রিদী ব্রেখনার সামনেই তার বাবাকে আক্রমণ করে এবং হত্যা করে। বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর ভাবে আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে আলিংগন করেছেন ব্রেখনা। এই ঘটনার পর আকবর আফ্রিদী আত্মহত্যাকেই পথ হিসেবে গ্রহণ করেছে। একটা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখান। এটা মেনে নেয়া এমন কিছু কঠিন ব্যাপার কি? তবে কেনো তা একজন আকবর আফ্রিদীর পৌরুষত্বে তা এভাবে আঘাত হানে? কোন ব্যবস্থা তাকে এই আশ্বাস দেয় সে যা চাইবে ধরণীতে তা হতে বাধ্য?

এই অদ্ভুত ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নেপালি তরুণীর একঘরে হয়ে মৃত্যুর খবর বিশ্ববাসীকে সভ্যতা আর অগ্রগতি বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে হাজারো প্রচারণা সত্ত্বেও পিরিয়ডের সময়ে নেপালে অনেক অঞ্চলেই নারীদের “অশুচি” জ্ঞান করে একঘরে করে রেখে পরিবারের বাইরে দূরে সময় কাটাতে বাধ্য করা হয়। এই রীতির বিরুদ্ধে খোদ নেপালে আইন পাশ হওয়া সত্ত্বেও এই বছরের শুরুতেই এই নিয়মের বলি হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে এক তরুণীকে। নারীদের অবস্থান মানবিক এবং সামাজিক মানদণ্ডে কোথায় অবস্থিত যেখান থেকে তাদেরকে এখনো জোর করে একঘরে করে রাখা যায়?

বিদেশ থেকে চোখ সরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে চোখ রাখলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “ভাইরাল” হওয়া একটা ভিডিও পাওয়া যায় যেইখানে একটা ছেলে গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে একটা ছেলে সিগারেট খেলে পরিবেশ নষ্ট হয় না মেয়ে খেলে হয়। যুক্তি? ছেলেরা চাইলেই জনসম্মুখে জামাকাপড় খুলে ঘুরতে পারে, কিন্তু একটা মেয়ে সেটা করলে যেভাবে পরিবেশ নষ্ট হয়, ঠিক একইভাবে একটা “মেয়ে” সিগারেট খেলেও পরিবেশ নষ্ট হয়। কোন সমাজে কোন সভ্যতাতে মানুষ বাস করছে, যেইখানে একটা ছেলে এখনো জনসম্মুখে নিজে জামাকাপড় খুলে চলাটাকে সভ্যতার অংশ বলে মনে করে?

ভিডিওর প্রত্যেকটা শব্দ অক্ষর নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে কথা বলা সম্ভব। কিন্তু সেটা না বলে বরং ভিডিওর বক্তব্যে এবং জনপ্রিয়তায় সামগ্রিকভাবে যে মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে তা নিয়ে বলাটাই বরং এখন বেশি যুক্তিযুক্ত। গলার রগ ফুলিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন কেউ বলে, “মেয়েদের এত্তো এত্তো অধিকার দেয়া হইসে, বাসে সংরক্ষিত সিট দেয়া হইসে, অনেক ধরনের স্কলারশিপ দেয়া হইসে” তখন এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এটাই প্রকাশ পায় যে, সেই মানুষ সেই গোষ্ঠী কোনো এক বিচিত্র কারণে মনে করছে, তারা কোনো নারী জাতির ওপর চ্যারিটি বা দান খয়রাত করছে। যেকোনো রকমের এদিক-সেদিক করলে তাদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার আছে, সেই চ্যারিটি বন্ধ করে দিয়ে শাসন করার তাই এই দান নিয়ে নারীজাতির উচিত চিরকৃতজ্ঞ হয়ে যাওয়া।

এই ভিডিওতে যখন বলছে “খেলে খাবেন, পাবলিকলি কেনো?” অর্থাৎ অনৈতিক কিছু করলে করতে হবে লুকিয়ে। হ্যাঁ এমন উপদেশ এই জাতীয় মানবকূল থেকে পাওয়াটাই স্বাভাবিক বৈকি! তবে হ্যাঁ যখন সময় আসবে এরাই সবার আগে মেয়েদের দিকে আংগুল তুলে “বোরকার তলে ক্ষ্যামটা নাচ” “মেয়েরা হিপোক্রিট হয়” জাতীয় কথা বলে মেয়েদের তুলোধনা করতে লেগে যাবেন আরকি!

এই ভিডিওতে যখন উপদেশ দেয়া হয় “এরপর থেকে যেখানেই দেখবেন মেয়েরা সিগারেট খাচ্চে ভিডিও করে ছড়িয়ে দিবেন” তখনো এই মানসিকতাই প্রকাশ পায় মেয়েরা আমাদের গণিমতের মাল এবং তাদের অনুমতি ব্যতিত তাদের ভিডিও করার মাঝে অপরাধের কিছুই নাই, বরং কৃতিত্ব আছে তাদের নৈতিক পথে আসতে বাধ্য করার!

এইখানে যখন বলা হয় “এইটা এগিয়ে যাওয়ার সিস্টেম না” তখন এটাই বুঝানো হয় মেয়েরা কীভাবে এগিয়ে যাবে সেই ছকটাও এই সুশীল ভায়েরা ঠিক করে দেবেন আরকি! কেনো একটা ছেলে আরেকটা মেয়ের সিগারেট খাওয়ার ভিডিও করবে, কেনোই বা সেটা ছড়িয়ে দেবার কথা উপদেশ দিবে এবং তা প্রচার করবে? মেয়েদের সাথে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যায়, তাদেরকে সম্পত্তি ভাবা যায় এমন ধারণা সে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ বলে জন্ম থেকে পেয়েছে, নাকি এই সমাজই তাকে দিয়েছে?

পেশাওয়ারের ব্রেখনা হোক অথবা বাংলাদেশের খাদিজা, পাকিস্তানের জয়নাব অথবা দিনাজপুরের ছোট্ট পূজা, নেপালের মাসিক বিষয়ক কুসংস্কারের শিকার তরুণী অথবা কেনিয়ার যৌনশুদ্ধির মতো সমাজ ব্যবস্থার শিকার বিধবা সকলে একই সুতায় গাঁথা। বাদ যায় না হলিউডের আপাত:দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ সুযোগ পাওয়া প্রভাবশালী নায়িকারাও।

সবক্ষেত্রে সমস্যা এক। মেয়েরা, নারীরা গণিমতের মাল। তাদের সাথে এবং তাদেরকে নিজের বাপের সম্পত্তি মনে করে যা প্রাণে চায় তা করা যায় এবং কোথাও তাদের সম্মতির প্রয়োজন নেই। সমস্যা সবখানেই এক। হয়তো এর তীব্রতা, মাত্রা ভিন্ন। প্রতিরোধের মাত্রা এবং ধরন ভিন্ন। মী টু নামক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এই সমস্যার ব্যাপ্তি যখন সারা বিশ্ব নতুন করে উপলব্ধি করলো, তখন একটা আশা জন্মেছিলো যে হয়ত নতুন বছরে একটা কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

কেনিয়ার যৌন হয়রানি মানসিক আঘাত থেকে বের হয়ে এসে নারীরা যখন ১৯৯০ সালে উমোজা নামক নারীশাসিত গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তারা নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। ২০১৮ সাল কি মী টু ক্যাম্পেইন এবং উমোজা গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন কিছু করতে পারবে, না কি সেই পুরোনো বিকৃত মানসিকতাকে আঁকড়ে ধরেই নতুন নতুন বিকৃত ঘটনার জন্ম দিবে? প্রতিরোধের ভাষা সবাই কি খুঁজে নিবে?

বর্তমান সময়ের দাবি এখন একটাই “নারীরা কারো সম্পত্তি না, নারীর অধিকার খয়রাতি না” এই মর্মে বিশ্বব্যাপি প্রচারণা চালানো। সামাজিক ব্যবস্থার, মানসিকতার আমূল পরিবর্তন এখন একান্ত কাম্য।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.