ধর্ষণ প্রমাণ করা নির্যাতিতা নারীর জন্য এক বিভীষিকা

0

শেখ তাসলিমা মুন:

যে মেয়েটি ধর্ষণের শিকার, সেই মেয়েটিকেই সেটি প্রমাণের ভার অর্পণ করে যখন আইন ও সমাজ, সেটি কতোটা কঠিন ও বেদনার সেটি আমরা কেবল বাইরে থেকে অনুমান করার ভান করি, আমরা আদৌ সে বিষয়ের একটি বিন্দুও জানি না। প্রথমত, সে একটি লোমহর্ষক ঘটনার ভেতর দিয়ে যায়। সে ভয়াবহতা নিয়ে সেটা প্রমাণ করতে তাকে যে প্রসেসগুলোর ভেতর যেতে হয়, সেটিও ধর্ষণের থেকে এক বিন্দু কম নয়।

ধর্ষণের পর, পরিবার বা সমাজ থেকেই সে যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সেটি তো তার সারা জীবনের। সারা জীবনের জন্য সিলগালা দেওয়া দণ্ড হয়ে চেপে থাকে তার কপালে, কিন্তু আইনগত যে প্রসেসের বীভৎসতা সারভাইভ করা হয় তা এক বিশাল বিষয়। একটি ধর্ষণ বাংলাদেশের প্রায় কোনো থানাতেই গ্রহণ করা হয় না। কিছুদিন আগে একটি মেয়ে পাগলের মতো ১১টি থানা ঘুরেছিল। কোনো থানা তার অভিযোগ নেয়নি। ১২ নাম্বার থানা তার অভিযোগটি লিপিবদ্ধ করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে ধর্ষকরা অনেকদূর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

সে কেইস মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু কেউ প্রশ্ন তোলেনি। ঐ যে ১১ টি থানা যে তার কেইসটি গ্রহণই করেনি, তাদের কোনো বিচার হবে কিনা। কিছুদিন আগে এমনই একজন ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়ে তার মাকে নিয়ে থানায় গেলে, উলটে থানার দারোগা থেকে শুরু করে পুলিশ কনস্টেবল সবাই মিলে মেয়েটিকে মায়ের সামনে গ্যাংরেইপ করে।

ধরা যাক অভিযোগ গ্রহণ করলো, তাকে এমন সব প্রশ্ন করা হবে যেন সে ইচ্ছে করে এক গ্রুপ মানুষের সাথে সেক্স করে শুধু শুধু অভিযোগ করতে এসেছে। প্রশ্নগুলো তার সমস্ত অস্তিত্বকে কয়েক দফায় আরও ভয়ঙ্করভাবে ধর্ষণ করে।

নমুনা সংগ্রহে সে মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করে আরও এক নাইট্মেয়ার। তার যোনির উপর চলে দফায় দফায় অত্যাচার। নারী ডাক্তারের পরিবর্তে পুরুষ ডাক্তারের কাছে এ পরীক্ষা দেওয়া তাদের মনের উপর যে চাপ সৃষ্টি করে, সেটি আমলে আনার কথা সমস্ত পদ্ধতি থোড়াই কেয়ার করে।

সমস্ত বিচার পদ্ধতিতো গায়ে কাঁটা দেবার মতো। পুলিশের প্রশ্নবাণের থেকে আদালতের প্রশ্নবাণ থাকে অনেক বেশি নির্লজ্জ পাশবিক হিংস্র। শতবার এ ইউরোপ এবং আমেরিকায় দেখেছি, গ্যাংরেইপড হওয়া মেয়েটির অভিযোগের বিরুদ্ধে বিপক্ষ উকিল মেয়েটিকে অভিযোগ করছে, রেইপ নয়, তুমি ছিলে গ্রুপ সেক্সে মত্ত। ধরে নিলাম, এটি আদালতের উকিলীয় একটি রুটিন, যেখানে বিপক্ষ উকিল তার মক্কেলের পক্ষ নিতে এমন যুক্তি তর্ক কোর্টে উত্থাপন করে। কিন্তু একবারও আমরা ভেবে দেখি সেই মেয়েটির কথা? যে মেয়েটি অলরেডি এক ভয়ঙ্কর বিভীষিকার ভেতর দিয়ে গেছে সে অপরাধের ভার আবার তাকেই অর্পণ করা হচ্ছে!

কী নির্লজ্জ ভয়ঙ্কর এ পদ্ধতি! কী অনুভব এ মেয়েটির হতে পারে? এমন তো হাজার হাজার কেইস যেখানে মেয়েটি আদালতে প্রমাণ করতে পারেনি, বরং পরাজয়ের কালিমা নিয়ে আদালত থেকে বেরিয়ে আসে। ‘মিথ্যে অভিযোগ এনে কিছু ভালো মানুষকে হয়রানি করেছে’ – এমন অভিযোগ মাথায় নিয়ে আদালত থেকে বেরিয়ে এক নরক জীবন-যাপন করছে। অনেক মেয়ে সে বেদনা সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। আর যারা আত্মহত্যা করতে পারেনি, তারা সমাজে, পরিবারে, জীবনে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

সদ্য স্বাধীন হওয়ার পর, বয়সে ছোট ছিলাম, দেখতাম আমার মায়ের কাছে কিছু মেয়ে আসতেন। তাঁরা আমাদের ছোটদের আড়াল করে কথা বলতেন। আমরা গেলে মা-ফুপু অন্য ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। আমরা ‘আন্টি’ বলতাম না এখনকার মতো, আমরা খালাম্মা বলতাম তাদের।

এখন বুঝি, তাঁরা ছিলেন যুদ্ধে ধর্ষণের শিকার ‘বীরাঙ্গনা’। দেশ স্বাধীন হলে তাঁরা ফিরে এলে তাদের তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে দেয় তাঁদের পরিবার। আমাদের ছোটবেলায় মানুষ বুরকা পরতো না। পরলেও সংখ্যায় খুব কম। একজন খালাম্মা আমার মার সাথে কথা বলতে আসতেন, মনে আছে তিনি সাদা বুরকা পরে আসতেন। তার সংসারে তার নির্যাতনের কথাই মাকে বলতেন যতটুকুন বুঝতাম। বড়দের সে টুকরো কথাগুলো মনে করে এখন আরও পরিষ্কার হয়, অপরাধ তার একটিই, যুদ্ধের নয় মাস তিনি বন্দী ছিলেন ক্যাম্পে। তাঁর স্বামী তাঁকে প্রায় ত্যাগই করেছিল। বউ এর সাথে দেখা করাই ছেড়ে দিয়েছিল। মেয়েটি কাঁদতো, স্বামীর পা ধরে কাঁদতো। মেয়েটি বেঁচে ছিল এক পাহাড় পরিমাণ অপরাধ নিয়ে। যে অন্যায় তাঁর উপর হয়েছিল, সে অন্যায় কিভাবে তাঁর হয়ে গেল। যেন সে পাহাড় পরিমাণ অপরাধ তাঁর, সে অপরাধ সে করেছে সে শ্বশুরবাড়ির প্রতি, স্বামীর প্রতি। মহান স্বাধীনতার একজন ‘বীরাঙ্গনার’ জীবন যদি এমন হয়, অন্যদের কথা কি আমরা ভাবতে পারি?

পূর্ণিমার কথা আমাদের কারও মনে আছে? ”বাবারা তোমরা একজন একজন করে যাও, আমার মেয়ে ছোট’। আজ মেয়েটি বড় হয়েছে। সেই মেয়েটিকে এমন কোনো কুৎসিত কথা নাই যা বলা হয় না। এমন কোনো ঘৃণিত প্রশ্ন নাই যা করা হয় না। এমন প্রশ্নও করা হয়, ‘তোমার রেট কত?’

একটি ঘটনা আমার নিজের পরিবৃত্তের। মেয়েটি ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু পরিবারের। এ পরিবার বংশ পরম্পরায় আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। এমপি নির্বাচনে সেবার নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে ধানের গোলা খুলে দিয়ে সাহায্য করেছে পরিবারটি। এমপি নির্বাচিত হয়ে এমপি তখন কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছেন। তাকে ঘিরে থাকে যারা, তাদেরই একজন সেই হিন্দু পরিবারের একটি মেয়েকে স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে। মেয়েটির বাবা কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটিকে নিয়ে থানায় গিয়ে ওসি সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে। ওসি সাহেব ধর্ষকের নাম শুনে হম্বিতম্বি করে বলেন, তাঁর বাবারও ক্ষমতা নাই অভিযোগ নেওয়ার। ওসি তাঁকে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলে। লোকটি পায়ে ধরে পড়ে থাকে।

ওসি সাহেব জানে, ধর্ষক এমপি সাহের ডান হাত। ওসি সাহেব নবনির্বাচিত এমপি সাহেবকে ফোন করে। কিছুক্ষণ পর এমপি সাহেব তার ধর্ষক ডানহাত নিয়ে সরকারি গাড়িতে চড়ে থানায় হাজিরা দেন! হাঁক দ্যান, ‘এ কী কথা কাহা, (কাকা) একটা সমস্যা হয়েছে বুঝলাম, আমি আছি যেখানে, সেখানে তোমার থানায় আসার কী দরকার?’ এরপর এমপি সাহেব মহামান্য ধর্ষককে কান ধরে একটা থাপ্পড় দিলেন। বললেন, ‘হারামজাদা, যা কাকার পায়ে ধরে মাফ চা!’

ধর্ষক কাহার পায়ের কাছে পড়ে বললো, ‘কাহা ভুল হয়ে গেছে মাফ কইরে দেন। আর এমন হবে না।’ এমপি সাহেব কাকাকে মেয়ে নিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলে গাড়িতে উঠে বসলেন। দশ হাজার টাকার একটি বান্ডিল কাকার হাতে তুলে দিলেন। মেয়ের বাবা তাঁর দু হাত জড়ো করে টাকা ফেরত দিয়ে বললেন, ‘বাবা আমি টাকা চাই না, আমি আমার মেয়ের উপর জুলুমের বিচার চাই। আপনি ওসি সাহেবকে বলে দিন’। ওসি সাহেব খাতা বন্ধ করে কাজে বেরিয়ে গেলেন। মানুষটি কাঁপতে কাঁপতে মেয়েকে নিয়ে থানা চত্বর ত্যাগ করলো। তাঁর সে চেহারার কথা ভাবলেও পৃথিবীটা একটি অসহ্য জায়গা মনে হয়।

অনেক টাকা জরিমানা দিয়ে তার বাবা মেয়েকে ‘পার’ করেছেন। মেয়েটিকে নয়, টাকার বিনিময়ে মেয়েটির একটা ‘ব্যবস্থা’ হয়েছে। মেয়েটির সারা জীবনের লাঞ্ছনা পোক্ত করেছে মেয়েটির বাবা। তবু মেয়েটির ভাগ্য ভালো। এমন কেইসে অনেক মেয়ের কোথাও জায়গা হয়নি বলেও জেনেছি। অনেক মেয়ে এখানে-সেখানে কাজ করে খেয়ে ক্লান্ত হয়ে এক অন্ধকার গলিতে মিশে গেছে শুনেছি।

সেই মেয়েটি এখন কোথায় জানি না, কেবল মেয়েটির মুখটি যতবার আমার মনে ভেসে ওঠে আমি মাথা নীচু করি। আমার ঘাড় উঁচু করতে ভয় করে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  • 1
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

লেখাটি ৯৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.