কবুল শেষেও বিয়ে একটি চুক্তিই

শিল্পী জলি:

এক বুয়েটে পড়ুয়া আর্কিটেক্ট মেয়ে ফাইনাল ইয়ারে থিসিস জমা না দিয়ে কবুল পড়ে বসলো। স্বামী আমেরিকায় ইঞ্জিনিয়ার, এইচ ওয়ান ভিসা। মানে যতদিন চাকরি, ততদিন ভিসা। বিয়ের কয়েক মাস যেতে না যেতেই বরটির চাকরি চলে যায়। চাকরি যেতেই সে বন্ধুদের পরামর্শে তড়িঘড়ি করে বউ নিয়ে এলো দেশ থেকে, যদি আবার বউ বরের বিপদ দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। মেয়েটির আর পড়া হলো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেক সুন্দরীকে দেখেছিলাম সাইন্সের সাবজেক্টে পড়া সত্ত্বেও থার্ড ইয়ারে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যেতে, ব্যস তারও পড়া চাঙ্গে ওঠে। হাজারও মেয়ে আছে যারা ভালো ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ে বা পড়ার মাঝপথে বাদ দিয়ে বিয়েতে জড়িয়ে পড়া এবং ক্যারিয়ার দু’টোকেই বিসর্জন দিয়ে পরনির্ভরশীলতাকে বেছে নেয়– সংসার, স্বামী, শ্বশুরবাড়ি, এবং সন্তানের খাতিরে। অথচ মানবসন্তান এমন ধরনের সন্তান, যারা সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল হয়ে জন্ম নিলেও যতদিন যায় ততই বড় হয়, আর ততই বাবা-মায়ের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে– পড়া, প্রতিষ্ঠা, এবং জীবন যাপনের খাতিরেই। তাদের আলাদা একটি জগৎ তৈরি হয়। একটি সময়ের পর চেয়েও আর বাবা-মায়ের পক্ষে তাদের ধরে রাখা সম্ভব হয় না, আঁচলের বাঁধনে ঢিলা দিতে হয়।

ঐ যে আঠারো-উনিশে একটি সন্তান ঘর ছাড়ে, সে আর সচরাচর বাবা-মায়ের ঘরে ফিরে আসে না। বরং ওটাই তার নিজের জীবনে নিজের ঘরে প্রবেশের সূচনা। অথচ অনেক বাবা-মাই অতি আত্মত্যাগে ভালোবাসায় বিভোর হয়ে অতি ইনভেস্টমেন্ট করে বসেন। তাদের জীবনে স্বামী, সন্তান, সংসার ছাড়া আর কোনো কিছুই থাকে না। তারা ভুলে যান সন্তান হলেও সেও একটি আলাদা মানুষ, আলাদা সত্তা, আপন হলেও নিজের নয়। এতে সন্তানের দায়বদ্ধতাও বাড়ে, মানসিক চাপে থাকে সন্তান। তাছাড়া অতি আদরের মাঝে কম ফ্রিডম থাকায় সন্তানের আত্মনির্ভরশীল হবার সুযোগও কম থাকে। তাই তারা জীবনের বাঁধাবিপত্তিও সহজে কাটিয়ে উঠতে শেখে না, পদে পদে হোঁচট খায়।

মানুষের যার যার জীবন তাকেই বয়ে বেড়াতে হয়, নিজের খাওয়া নিজে খেতে হয়, নিজেকেই অসুখ-বিসুখ হ্যান্ডেল করতে হয়, যার জন্যে আগে থেকে প্রস্তুতি থাকলে জীবনের বাঁধা অতিক্রম করা সহজ হয়। অথচ অধিকাংশ বাবা-মাই মেয়েদের ক্ষেত্রে শিক্ষা এবং প্রতিষ্ঠার বিষয়টিতে ততটা গুরুত্ব দেন না। বরং বেশির ভাগেরই লক্ষ্য থাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েকে একটি ভালো বিয়ে দিয়ে দেয়া। এই ভালো বিয়ে মানে হলো পাত্রের শিক্ষা, প্রতিষ্ঠা, কাড়ি কাড়ি টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ি থাকা, মদ-গাঁজা-ভাঙ না খাওয়া, আর বড়জোর মেয়ে মানুষের পেছনে না ছোটা। দু’জনার মাঝে মিল বা একজন আরেকজনকে বোঝা বা জানার গুরুত্ব এখানে থাকে না।

একটি মেয়ের জীবনে বিয়ে করে বিলীন হয়ে যাওয়াই কী সব? তারও তো একটি আলাদা সত্তা থাকে? মনের কিছু চাওয়া থাকে? একটি ছেলের কী সেই ক্ষমতা আছে যে একটি মেয়ের সারাজীবনের সব চাওয়া-পাওয়াকে পূরণ করে দেবে? আর দেবেই বা কেন? মেয়ের নিজের ক্ষমতা নেই?
নাকি পরের উপর নির্ভর করে থাকা-খাওয়াই একজন নারীর জীবনে সবকিছু?
একজন পরনির্ভরশীল নারীর স্বামীর দাপটও কি বেশি হয় না?

আমার শ্বশুরের পুরো টাকাই শাশুড়ির হাতে থাকতো আজীবন। কখনও তাকে খরচের জন্যে জবাবদিহিতাও করতে হয়নি। শ্বশুরের আয়ও মন্দ ছিল না। তথাপি দেখেছি শাশুড়ি মেয়েদের পড়ালেখাকে অতি পছন্দ করেন, সর্বাধিক গুরুত্ব দেন, কেন? মেয়েদের পরনির্ভরশীলতার মাঝে ত্যাগ থাকলেও অর্জনের স্বাধীনতা অনুভূত হয় না, নিজের পায়ের নিচে মজবুত মাটির ছোঁয়া মেলে না, সর্বোপরি নিজের জীবনের কন্ট্রোল থাকে অন্যের হাতে। তাই নিজের ইচ্ছেকে পদে পদে বিসর্জন দিয়ে পর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। অথচ সবারই জীবন একটিই, একটিবারের।

তাছাড়া সব বরই কি ভালো হয়? নাকি, তার কোন নিশ্চয়তা আছে?
এমনও বর দেখেছি যার লক্ষ লক্ষ টাকা আয় সত্ত্বেও বউয়ের জন্যে একটি পেট্রোলিয়াম জেলিও কিনে দিতে চায় না, যদিও বউ দিনরাত বিনে পয়সায় রান্নাবান্নাসহ বাসার যাবতীয় কাজ করে। বিয়েতে আসলে একটি মেয়ের কী জোটে যে অনেক বাবা-মাই ঝটপট অতি আদরের মেয়েটিকেও বিয়ে দিয়ে দেন?
এমনকি পড়ালেখা শেষ না হতেই?
কত পারসেন্ট বাঙালি মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে নানাবিধ গঞ্জনা সহ্য না করে থাকতে পারে?
কত পারসেন্ট পদে পদে মার-গালি খেয়ে ভূট্টো হয়ে যায়?
আর কত পারসেন্ট যৌতুকের চাপে থাকে সেগুলো আমাদের সবারই কমবেশি জানা।

আমাদের মেয়েরা পড়ালেখাতে যতই দক্ষতা দেখাক না কেন, তারা চাকরি করুক বা না করুক, বাবা-মায়ের অতি আদরের হোক বা না হোক বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যেতেই ঝটপট হাঁড়ি ঠেলতে শিখে যেতে হয়। তাও প্রতিদিন নিয়ম করে তিন বেলা। তখন মেয়ের বয়স কত, বাচ্চা কিনা অথবা কত সুন্দরী, তা আর বিবেচনায় রাখা হয় না। বরং কবুল বলার সাথে সাথেই হাজারও দায়িত্ব এসে চাপে কাঁধে, নো মার্সি। সেই সাথে শ্বশুরবাড়িতে চালু হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে রকমারি দূরত্ব তৈরির কারসাজি, কূটকৌশল।

তদুপরি বিয়ে কিছুটা পুরোনো হতেই স্বামীজিরও ঘোর ছুটে যায়। সারাদিনের নিঃশর্ত সার্ভিস শেষে আক্ষরিক অর্থে বিয়েতে বাঙালী মেয়েদের মূল পাওয়া হিসেব করলে দেখা যাবে, আদরহীন সেক্স এবং দুই-তিনজন সন্তান, তাও যদি স্বামীর সুস্হতা বজায় থাকে। অথচ সামাজিক চাপে পিছিয়ে থাকায় অধিকাংশ বাঙালি ললনা প্রেম বুঝলেও বত্রিশের আগে তেমন সেক্সের প্রয়োজন অনুভব করে না। তাহলে যে সময়টি একটি মেয়ের জীবন গড়ার কাজে লাগানো যেতো, যে সময়টি শুধু একটি মেয়ের প্রেমে পড়ার, দূর থেকে চোখে চোখ রেখে একটু মিষ্টি হাসি বিনিময়ের, ঠিক তখন তাকে এমন কঠিন দায়িত্বের বাঁধনে বেঁধে দেবার ফজিলত কী? অন্তত জীবন গড়ে নেবার সময়টুকুতো তাকে দেয়া যেতো। বিয়েতো একদিন হবেই তাহলে মেয়েদের ক্ষেত্রে কেন এতো বেশি তাড়াহুড়া যে, জীবন বোঝার আগেই দায়িত্বের ফাঁদে আটকে ফেলা?

ছেলে সন্তানের মতই মেয়ে সন্তানেরও জীবন গড়ে দেবার দায়িত্ব বাবা-মায়ের এবং এর জন্যে নিজের বাড়িতেই মেয়েকে পর্যাপ্ত সময় এবং সুযোগ দেয়া জরুরি। ভুলে গেলে চলবে না যে বিয়ে একটি ভঙ্গুরযোগ্য চুক্তি। সেইসাথে ভার্জিনিটিও খোয়ানো। তদুপরি সেটিতে যদি থাকে হৃদ্যতার অসংযুক্তি তাহলে তাতে ঝুঁকিই বেশি। কবুল শেষেও বিয়ে একটি চুক্তিই, প্রেমের গ্যারান্টি নয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.