ভিডিও করে মেয়েদের অপমান করা কেন?

একটা ভিডিও ভাইরাল হতে দেখলাম, যেখানে একটি মেয়ে সিগারেট খাচ্ছে বলে একটি ছেলে এসে তাকে প্রকাশ্যে ধমকই দিচ্ছে না, রীতিমতোন চ্যালেঞ্জ করছে এবং খুবই আক্রমণাত্মক ভাষায় আচরণ করছে। মেয়েটি যখন নিজেকে ডিফেন্ড করতে চাইছে তখনই নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতেও পিছপা হয়নি ছেলেটি। এক পর্যায়ে কথায় না পেরে সে এই ঘটনাটি ভিডিও করে ছেড়ে দেয় সামাজিক মাধ্যমে এবং তা ভাইরাল হয়ে যায়। শেষে একটা বক্তব্য ছিল যেন রাস্তাঘাটে মেয়েদের ধুমপান করতে দেখলে সবাই তা ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। মোটামুটি এই ছিল ভিডিওটির বার্তা।

অনেকেই ভিডিওটি নজরে আনে উইমেন চ্যাপ্টারের।

খুবই হতাশ লাগছে এই ভেবে যে, ভিডিওটি বানিয়েছে এই প্রজন্মের কয়েকজন তরুণ। যখন তাদের লেখাপড়া নিয়ে জীবনকে ওপরের দিকে টেনে তোলার অদম্য স্পৃহা থাকার কথা, যখন তাদের স্বপ্ন থাকার কথা আকাশ ছোঁয়ার, তখন তারা মেতে আছে মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা নিয়ে, আর তারই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে নারীকে কীভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেবে, কীভাবে অপমান করবে! জেন্ডার বৈষম্য না বুঝেই নারী-পুরুষের সমানাধিকারের দাবিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে যে উদাহরণগুলো টানা হয়েছে, এতেই বোঝা যাচ্ছে, ওদের জ্ঞানের দৌড় কতদূর!

যে বানিয়েছে ভিডিওটি তার নাম সাব্বির অর্ণব, তার প্রোফাইলে গিয়ে দেখলাম যে, সে নিয়মিতই ভিডিও বানাচ্ছে এবং তা ফেসবুকে ভাইরাল করছে। এগুলো দেখার জন্য কি কেউ নেই এইদেশে? আমরা যারা ইতিবাচকভাবে কোনো পরিবর্তন আনতে চাই, তখন আমাদের ওপর খড়গ নেমে আসে, অথচ খারাপেরা দিব্যি নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য কোথাও কোনো আইন বা কেউ নেই।

এই ভিডিওটির প্রতিবাদ জানিয়ে একজন একটি লেখা পাঠিয়েছে, নিচে তা তুলে ধরা হলো:

দীপংকর সাহা:

একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে প্রকাশ্যে ধূমপান করছে, যা দেখে একজন মা তার ছেলেকে বলছে “কীরে বাবা, ঢাকার মেয়েরা এতো খারাপ”?? একটা বাচ্চা ছেলে বলছে “কাক্কু দেখো মেয়েটা সিগারেট খাচ্ছে”।

এরপরে দেখা যাচ্ছে একটা ছেলে গিয়ে মেয়েটাকে বলছে, পাবলিক প্লেসে আপনি সিগারেট খাচ্ছেন কেনো?
-মেয়েটা বললো, আপনি আপনার বন্ধুরা খাচ্ছেন, আমরা খেলে কী সমস্যা?
উনি বলছে “আমরা শার্ট খুলে হাঁটতে পারবো,আপনি পারবেন”?
মেয়েটা বলছে, আমি একজন মেয়ে।
ছেলে জবাব দিলো এইভাবে, আপনারা সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান অধিকার চাইবেন, আর এইখানে নারী কেনো?
প্রকাশ্যে মেয়েরা সিগারেট খেলে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে।
-এই ছিলো ভদ্রলোকের যুক্তি।

#

ভদ্রলোকের আম্মু দুনিয়ার আর কিছু দেখে না। প্রতিদিন টেলিভিশন, পত্রিকা কিছুই পড়ে না, তাই দেখতে পারে না এই দেশে মাসে ৫০ শিশু ধর্ষিত হয়, ৪ হাজার নারী ধর্ষিত হয় বছরে। সেইদিক বিবেচনা করলে তো বলা যায় ঢাকা না, পুরা বাংলাদেশের পুরুষই ধর্ষক? কি বলা যায় না?

একটা মেয়ে সিগারেট খেতেই পারে, তাই বলে সে খারাপ হয়ে যাবে?? শুধুই মেয়েরা খেলেই পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে?? সিগারেট খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং প্রকাশ্যভাবে ধুমপান অপরাধ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অপরাধ করে আসছি আমরা পুরুষরা। অপরাধকে একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে এবং মেয়েদের প্রকাশ্যে ধুমপানে উৎসাহ দেয়ার কাজটি কিন্তু পুরুষ করে যাচ্ছে, সেইদিকে উনার আম্মুর আর উনার খেয়াল নেই।

#
এবার ব্যাপারটা হলো পুরুষ শার্ট খুলে রাস্তায় চলতে পারলে মেয়েরা নয় কেনো?? যেহেতু সবাইর সমান অধিকার।
এইটার মতো কুযুক্তি আর হয় না। শার্ট খোলা কি আদৌ অধিকার এর মধ্যে পড়ে??
ডাক্তারের এর বাসার ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার করে দিলো,এখন ডাক্তার কেনো ইঞ্জিনিয়ার এর বাসা ডিজাইন করতে পারবে না?? যেহেতু দুইজনই সরকার থেকে সমান অধিকার পাচ্ছে।
হাস্যকর লাগলেও এইরকমভাবে নারীদের অপমান করছে এক শ্রেণীর শিক্ষিত ইউটিউবার,লজ্জা হওয়া উচিত এদের।

#
ভিডিওতে আরো দেখা যায় প্রকাশ্যে মেয়েরা সিগারেট খেলে তা যেনো ভিডিও করে রাখে এই রকম কিছুও বলা হয়েছে।
এইসব কোন ধরনের কথাবার্তা? কেউ সিগারেট খাবে কী খাবে না, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি কোন অধিকারে অনধিকার চর্চা করবেন?? আপনি বাধা দেয়ারও কেউ না।

আমাদের গ্রামের দাদী নানীরা এখনো বিড়ি খায় খেয়াল করে দেখবেন। তারা কোন স্মার্টনেসের জন্য খায় কেউ বলতে পারেন? বিড়ি আমাদের দেশের নারীদের হাতে নতুন নয়। তাই শুধু নারীদের বিড়ি/সিগারেট পান করা নিয়ে কথা উঠলে অতীতে ফিরে যান, শিক্ষা নিয়ে আসতে পারবেন।

#

ঢাকার বাসগুলোর প্রসঙ্গ আনতে ভুললেন না তিনি, ছোটলোকের মতো বললেন নারীদের দেখলে তিনি জায়গা ছেড়ে দেয়। কিন্তু কখনো নারীদের জন্য নির্ধারিত ৯ সিটে বসতে পারেনি। দুঃখিত আমি, জনাবের এই কথার সত্যতা আমি কখনই পাইনি। যেদিন বাসে উঠেছি নির্ধারিত আসনগুলোতে দুই-তিনজন নারী ছাড়া বাকিগুলোতে পুরুষ বসে থাকতেই দেখেছি। আমার মতো অন্যরাও দেখে থাকবেন একই দৃশ্য পরে নারীরা পিছনের আসনগুলোতে গিয়ে বসে। অনেক বাসে নারীরা পুরুষের কী কী ধরনের অপমান করে তা বলে পুরুষদের আর লজ্জা দিতে চাই না। কারণ উনারা আর লজ্জা পান না, বরং বাসে নারী নির্যাতন করে গর্ববোধ করে।

https://www.youtube.com/watch?v=FfPDpOvU0ao

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.