এক দুর্ভাগা মায়ের দিনলিপি লিখে যেতে চাই

0

নুসরাত শারমিন:

বিছানায় শুয়ে আয়মুনার সহজে ঘুম আসে না, এটি তার দীর্ঘদিনের ইনসমনিয়ায় পরিণত হয়েছে। কখনও পাশে শুয়ে থাকা স্বামী-সন্তানের ঘুমের ঘোরে নিঃশ্বাসের শব্দ কানে লাগে, ইচ্ছে হয় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে, তা আর হয়ে উঠে না। আয়মুনা বেগমের প্রথম সন্তানটি আজীবন শিশুই থেকে যাবে, ঘুমের ঘোরে সে মায়ের উপস্থিতি বুঝে নেয় হাতের স্পর্শে।

সারাদিন এর ব্যস্ততায় আর মনে জমে থাকা জীবনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া স্মৃতিরা ভিড় জমায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে। রাত হলে আরো গাঢ় হয়ে উঠে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এর ভাবনাগুলো।

তিন সন্তানের জননী আয়মুনার প্রথম সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হতেই নেমে আসে জীবনের ঘনঘোর আঁধার, প্রতিটি আসন্নপ্রসবা নারী অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে সুস্থ সুন্দর এক নবজাতকের। বিপরীতও ঘটে দুর্ভাগা মায়ের জীবনে। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখন অবাক হয়, এতো ঝড় এতো প্লাবনকে কী করে সামলে ছিল এক প্রত্যয়ী মা, অসুস্থ বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য সব অপরাধ এর দায়ভার বর্তেছিল তার উপর। অথচ আঠারোতে মা হয়ে গিয়েছিল যে কলেজ পড়ুয়া উচ্ছল তরুণী, তার উপর নেমে আসে এক পাহাড়সম অভিযোগ অপবাদ, কানাঘুষা চলে আশপাশে, এ নিশ্চয়ই মায়ের পাপের ফল, পাপের শাস্তি ভোগ করতেই এমনটি হয়েছে। এই তরুণী মায়ের পাশে নির্ভরতা আর আশ্বস্ততার কোনো হাত কেউ বাড়ায়নি।

এই আয়মুনা বেগম। আজ মনে পড়ে ডেলিভারি ডিলে হবার কারণেই বাচ্চাটির ব্রেইনের কিছু অংশ ড্যামেজ হয়। আর সতেরোতে গর্ভধারণ, যে বয়সে তার নিজেরই বাড়ন্ত শরীর, তার ভেতরে বেড়ে উঠা শিশুটিও পায়নি প্রয়োজনীয় পুষ্টি।
সমস্ত দায়ভার চাপিয়ে দেয়া সেই সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ স্ত্রীর প্রতি চরম উদাসীন আর দায়িত্ব জ্ঞানহীন উচ্চশিক্ষিত স্বামী বরটি কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন না। যথেষ্ট পরিপক্ক অভিজ্ঞ ব্যক্তি।

আয়মুনার ধারণা, সময়মতো সিজারিয়ান এর সিদ্ধান্ত নিলে আজ এই আয়মুনা আর তার ছেলেটির জীবন হয়তো বা অন্যরকম হতে পারতো। স্বাভাবিক জীবন। এরপরেও আয়মুনা বার বারই গর্ভধারণ করে, প্রথম সন্তানকে দেখে ভয়ে আর লালনপালন এর ভয়ে সেই সন্তানেরা পৃথিবীর আলোই দেখতে পায়নি। তরুণী আয়মুনার বিবাহিত জীবনে মাতৃত্ব বুঝে উঠার আগেই অনেক কিছু ঘটে যায়।

আজ এই পরিণত বয়সে আয়মুনা বুঝে এবং উপলব্ধি করে তার উপর চাপিয়ে দেয়া অভিযোগ ছিল কতখানি শঠতা। গর্ভধারণ এর দায়ভারও তাকেই দেয়া হতো। আজ এই সন্তানটিই তাকে কত আহ্লাদ আর কতো মধুর উচ্চারণ এ আম্মু ডাকছে, ডাকে। শিশু নিষ্পাপ নির্জলা পবিত্রতা দিয়ে আম্মুকে ডাকে তার ভাষায়, ঘুমানোর সময় আলাপচারিতা চলে। সারাদিনই আয়মুনার এই বিশেষ শিশুটি তাকে প্রফুল্লিত করে রাখে। হাসিখুশি আনন্দপ্রিয় সন্তানটি আসলেই আয়মুনার জীবনে বিশেষ কিছু।

মাঝে মাঝে আয়মুনা বেগম ভাবে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে, সমস্ত অপবাদ বা কষ্ট সয়েও সন্তানদের লালনপালন করে বড় করে তুলছে সে, তিন সন্তান বড় হয়ে যাচ্ছে, হয়তো বেশি দূর নয়, ওরা ওদের নিজেদের কাজের প্রয়োজনে মাকে ছেড়ে দূরদেশে চলে যাবে। তারপরও মায়ের কিছু চাওয়ার নেই, চাওয়া শুধু ওরা যেন ভালো থাকে।

আয়মুনা বেগম এখন কিছু জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে কণ্টকাকীর্ণ রুক্ষ ঝড়ো পরিবেশে লড়াই করে কীভাবে টিকেছিল তারই একটা দিনলিপি লিখে রেখে যেতে চায়, যদি আর কোনো মেয়ে বা মা একটু হলেও শক্তি পায় তার কাছ থেকে!

তাই ক্রমশ…….

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares

লেখাটি ৯৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.