আমি জারজ সন্তান, ভালোবাসার নই

0

রাবেয়া রাহীম:

জীবনের গল্প কখনও কখনও এতো বেশি নির্মম হতে পারে সেটা অনেক সময় আমাদের ধারণারও অতীত। বাইরে থেকে দেখে অনেক সময় দুঃখী মানুষকে বুঝতে পারার কোনো উপায় থাকে না। কেননা প্রকৃতি আমাদের নারী জাতটাকে আদতেই অনেক বেশি শক্ত খোলসের আবরণে ঢেকে রেখেছে। সেই আলোকে নিজস্ব কিছু অভিজ্ঞতা একটু গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করলাম মাত্র।

নিউইয়র্ক শহরের অভিজাত কফি শপগুলোর একটি হলো স্টারবাকস। এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কফির সুবাসে ভীষণ কফির তেষ্টা পেয়ে যায়। অফিস ফেরত অনেক মানুষের সাথে আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে যাই কফির জন্য। কাউন্টারে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ফ্লেভারের কফি, দুধ, চিনি, জিরো ক্যালরি, ক্রিম। যার যেমন পছন্দ সে অনুযায়ী কাপে ঢেলে নিজের পছন্দমতো দুধ-চিনি মিশিয়ে নিচ্ছে। ফ্লাস্ক থেকে কাপে কফি ঢালার সময় প্রথম চোখাচোখি হয় মেয়েটির সাথে। শ্যাম বর্ণ, কালো বড় বড় টানাচোখ, ঘন কালো লম্বা চুল দেখে বাংগালীই মনে হলো। অল্প হেসে “হ্যালো” বলে আমি কফি নিয়ে চলে আসি।

জুন-জুলাই এই দুই মাস উত্তর আমেরিকাতে সুর্য ডোবে রাত সাড়ে আটটায়। অফিস ছুটি বিকাল পাঁচটাতে। অফিস ছুটির পর আরও সাড়ে তিন ঘন্টা পর সন্ধ্যা হয়। কারোরই তাড়া থাকে না ঘরে ফেরার। গরম আসে এই দেশে প্রিয় কোনো অতিথির মতো।

এমন এক গরমের বিকালে বসে আছি নিউইয়র্কর বাণিজ্যিক এলাকা ম্যানহাটনের কলম্বাস সার্কেলের একটি কফি হাউসে।
আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে বাইরের প্রায় পুরোটাই চোখে পড়ে। আজব শহর এই নিউইয়র্ক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষের দেখা মেলে এখানে। অফিস ছুটি হয়েছে। রাস্তায় বেশ ভীড়। অনেক বাঙ্গালীও চোখে পড়লো। বাইরের জগতের সাথে প্রায় একাত্ম হয়ে গিয়েছি এমন সময় মিষ্টি স্বরে কেউ বলে উঠলো –ক্যান আই সিট হিয়ার?
চেয়ে দেখি বাংগালী সেই মেয়েটি।
হেসে বললাম–শিওর।

সামনা সামনি বসাতে এতোক্ষণে খেয়াল করলাম হাল্কা পাতলা গড়নের মেয়েটি খুব সুশ্রী। ইংরেজিটাও পাকা। কোনো
অ্যাকসেন্ট নেই। হয়তো এই দেশেই জন্ম বা এখানেই বেড়ে উঠা তাই ইংরেজি এতো ভালো। আমার কফি প্রায় তলানিতে চলে এসেছে। বাকিটা হাঁটতে হাঁটতে শেষ করবো এই ভাবনাতেই উঠে দাঁড়াই। গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলের আলোতে ম্যানহাটনের এই রাস্তাটিকে খুব মায়াবী মনে হয়। জিন্স টি শার্ট হাই হিল পড়ে নিশ্চিন্তে আপন মনে হেঁটে চলেছি —- “এক্সকিউজ মি” শুনে পেছন ফিরে তাকাই। কফি শপের সেই মেয়েটি।

—আমাকে বলছো? বলো। শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে দাঁড়ালাম।

হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বললো—-আমি পূর্ণিমা উইলসন।

তার নাম শুনে ভাবলাম মা বাঙালী, বাবা আমেরিকান। এমন তো হয়েই থাকে। কিন্তু দোআঁশলা বাচ্চাদের মতো তাকে লাগছে না। ভাবলাম স্বামীর নামের শেষ নাম নিয়েছে হয়তো।

—আমি তোমার সাথে কিছুক্ষণ থাকতে পারি?

—–অবশ্যই পারো। তুমি কি এখানেই জব করো? আমিও কথা বলার একজন মানুষ পেয়ে গেলাম যেন।

আমার অফিস বিল্ডিং এর পাশের বিল্ডিঙয়ের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বললো, হ্যাঁ। গুগলে আছি। আমি ওয়েব ডেভেলপার।

বিদেশে নিজ দেশের কাউকে বড় জায়গাতে চাকরি করতে দেখলে আমি বরাবর খুব উচ্ছসিত হয়ে পড়ি, বললাম, বাহ! বেশ স্মার্ট জব করো তো তুমি!

এতোক্ষণ সব কথা ইংরেজিতেই হচ্ছিল। সাধারণত এখানে আমরা বাঙালীরা একসাথে হলে ইংরেজি বলিই না প্রায়। কিন্তু এই মেয়েটি একটা বাংলা কথাও বলছে না। তাই বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইলাম,

… তুমি বাংলা একদম জানো না? এখানে জন্মেছো?

… আমি জন্মেছি বাংলাদেশে। কিন্তু নিজ দেশের জল মাটি আলো বাতাসে বড় হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। মেয়েটির চোখ ছল ছল হয়ে গেলো।

মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো তবে আমি কি মেয়েটিকে কষ্ট দিলাম?

—আমি বাংলা বলতে চাই। তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে? মেয়েটির চোখে-মুখে আকুতি ফুটে উঠলো।

তার বয়স প্রায় তিরিশের কোঠায়। এই বয়সে কাউকে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাই কিছুটা বিব্রত বোধ করলাম। বললাম, নিউইয়র্কে এখন প্রচুর বাঙালী, তুমি চাইলে আমি খোঁজ নিতে পারি কোথায় বাংলা শেখানো হয়।
কথা বলতে বলতে মেট্রো রেল পর্যন্ত এসে পড়েছি। ততক্ষণ ট্রেন চলে এসেছে। বিদায় নিয়ে ট্রেনে উঠার পর মনে হলো, পূর্ণিমার ফোন নাম্বার নেওয়া হয়নি!

তারপর চলে গেলো অনেক দিন, প্রায় বছর হবে। চাকরি, ঘর সংসার, লেখালেখি নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার হয়ে যায়।
আমি পূর্ণিমা উইলসনকে ভুলেই গিয়েছিলাম।

মে মাস। দীর্ঘ শীতের পর উত্তর আমেরিকাতে তখন বসন্তের ছোঁয়া। এমন এক বসন্তের সকাল ৮টা। ৪২ গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পাতাল রেল স্টেশন ম্যানহাটন। অফিস টাইম। যে যার গন্তব্য নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সে ব্যস্ততার ভেতর আমিও একজন। পাতাল থেকে উপরে রাস্তায় উঠার জন্য ছুটছি সবাই এসকেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি ধরতে। ভিড়ের ভেতর পরিস্কার বাংলায় আমার পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো, দিদি সালাম, কেমন আছো, চিনতে পারছো?

এতো বিদেশীর ভীড়ে নিজের বর্ণের-ভাষার কাউকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম অস্ফুটে বললাম– পূর্ণিমা!
আরও বেশি অবাক হলাম তার মুখে বাংলা শুনে।

…জানো দিদি আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম।

… কে থাকে সেখানে?

… কেউ থাকে না। খুব বিষন্ন হয়ে গেলো মুখটি তাঁর।

ততক্ষণ আমরা রাস্তায় উঠে এসেছি। দুজনেরই অফিসে যাওয়ার তাড়া। এইবার ফোন নাম্বার নিতে আর ভুল হলো না।
তবে “কেউ থাকে না” কথাটা বুকে খুব বিঁধে আছে। কেউ না থাকলে সে কেন গেল? কার কাছেই বা গেল? এসব ভাবনায় লাঞ্চ ব্রেকে ফোন করি তাকে। খুব উচ্ছসিত হয়ে উঠে আমার ফোন পেয়ে। আমন্ত্রণ জানাই এই শনিবারে আমার বাসায়।

সোম থেকে শুক্রবার উইকডে। সংসার সামলিয়ে অফিস করে দিন যেন পাখির পালকে ভর দিয়ে কেটে যায় ঐ পাঁচদিন। শনিবার সকালে বিছানা ছাড়ার তাড়া থাকে না। বেশ আলসেমিতেই শুরু হয় এই সকাল। যদিও উত্তর আমেরিকায় এখন বসন্ত কাল, তবুও বাতাসে তীব্র শীত। ঘুম ভেঙ্গেছে অনেকক্ষণ আগেই। কম্বল মুড়ি দিয়ে গত পাঁচদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার চেষ্টায় চোখ বন্ধ করে আছি। সাইড টেবিলে সেলফোন সুরেলা আওয়াজে বেজে উঠে। “পূর্ণিমা” নামটা স্ক্রিনে দেখে কেন যেন খুব ভাল লাগলো। মেয়েটির মায়াবী মুখটা ভেসে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই মিষ্টি আওয়াজে পূর্ণিমা বলে উঠে, দিদি, কখন আসবো?

আমার সাথে দেখা করার জন্য মেয়েটির অস্থিরতা ভাল লাগলো। বললাম, আজ সারাদিন আমি বাসায়। তোমার যখন মন চায় চলে এসো।

এক কাপ কফি হাতে নিয়ে আমি দুপুরের খাবারের আয়োজনে লেগে যাই। ঠিক এগারোটায় আমার কলিং বেলটি বেজে উঠে। দরজা খুলে দিতে এক গাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা। তার হাসি ঠিক তার নামের মতোই।

তার সাথে নানান কথায় সময় গড়িয়ে দুপুরের খাবারের সময় হয়। খাবারের মেনুতে বাংলাদেশি খাবার মেয়েটি বেশ আগ্রহ নিয়ে খেলো। কয়েকটা বাঙ্গালী পদের রেসিপিও জানতে চাইলো। সেই শুরু থেকেই খেয়াল করছি, মেয়েটি যেন কিছু বলতে চায় আমাকে।

আমিও আরও জানার আকাংখায় বললাম, এখানে কে কে আছে তোমার। থাকো কার সাথে?
আমার কথায় মলিন মুখে সে বললো, আমি নিজের ফ্ল্যাটে একাই থাকি। বাবা-মা অ্যারিজোনাতে থাকে।

এখনো বিয়ের কথা ভাবছো না?
দিদি, তোমাকে কিছু বলতে চাই, শুনবে? তার চোখে আকুতি ফুটে উঠে।

আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, আমাকে কিছু বলে তোমার যদি শান্তি লাগে অবশ্যই বলো, আমার শুনতে ভালো লাগবে।

কঠিন বাস্তবতায় ক্লান্ত, জন্ম পরিচয়হীন এক দুঃখী মেয়ের মুখোমুখি বসে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে এই সময়ে। ভারাক্রান্ত মনে শুনে যাই তার কথা।

দুচোখে সীমাহীন হতাশা নিয়ে পূর্ণিমা বলতে থাকে,
জানো দিদি—শ্লীলতা- অশ্লীলতা, বৈধ-অবৈধ, কাঙ্ক্ষিত- অনাকাঙ্ক্ষিত এই শব্দগুলো এখনো আমার কাছে দুর্বোধ্য লাগে খুব!
আমি খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলাম –এতো কঠিন কঠিন বাস্তব কথা কেন তোমার মনে!

তার দুচোখের পানি গাল বেয়ে নেমে আসে — দিদি আমার জন্মটাই যে খুব কঠিন বাস্তবতার ভেতর। আমি বাংলাদেশ গিয়েছিলাম আমার জন্ম পরিচয় জানতে।

আমি অবাক বিস্ময়ে শুনে যাই তাঁর কথা।

ডিসেম্বরের পনের তারিখ আমার জন্মদিন। ১৮ তম জন্মদিনের পর “জন্মদিন” কথাটা কখনও আমার কাছে আনন্দ নিয়ে আসেনি, বরং অজান্তেই ভয়ে শিউরে উঠেছি। মনের কোণে ভেসে উঠে প্লাস্টিকের প্যাকেটে প্যাঁচানো ক্রন্দনরত নবজাতক আর ভীত সন্ত্রস্ত সদ্য প্রসুতী যুবতী মায়ের আতংকিত চেহারা। “মা” কথাটি মনে পড়লেই আমার ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। আমার তখন খুব ইচ্ছে করে মায়ের বাহুডোরে নরম ওমের ছোঁয়ায় বুকের গন্ধে, মিশে থাকতে।
আচ্ছা, সে সময় আমার মা কি কেঁদেছিলো? তাঁর চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দেওয়ার মতো কেউ ছিল কি পাশে? নয় মাসের গর্ভ ধারণের কষ্ট মুহূর্তেও কি মনে আসেনি! আমার জন্মটা ছিল ঘৃণায়, না ভালবাসায়? নবজাতককে নরম কোলে আদরে চুমু খেয়ে ঘুম পাড়ানোর বদলে তাকে নর্দমায় ফেলে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য একটি কাজের জন্য রাজী হয় যে মা—প্রহসন, পরিহাসকে চিরসঙ্গী করে সদ্য জন্মানো কচি প্রাণ থেকে মুক্তি পেতে চায় যে মা, সেই মা কি কখনো ভুলতে পারে গর্ভ ধারণের কষ্ট, প্রসব কষ্ট! গর্ভে ছোট প্রাণের নয় মাসের ছোঁয়া! সদ্য প্রসুত মায়ের বুকে আর্তনাদ আর অনেক বেদনার জন্ম দিয়ে মাতৃত্বকে বদনাম করে নাম হয় ব্যভিচার। ঘৃণ্য অমানুষ রূপের এক প্রেমিক পুরুষ আমার বাবা, যে পূর্ণিমা নামের ভ্রুণের সৃষ্টি করে দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে কেড়ে নেয় সমস্ত সামাজিক স্বীকৃতি। সন্তানটির নাম হয় “জারজ”। সে পিতা কি মানুষ নামের দলভুক্ত! মানবের বিস্তারে জরায়ুর দায়িত্বে নিয়োজিত নারী শরীরের ভাঁজে ভাঁজে না পাওয়ার রঙ কি কোনো পুরুষ কখনো দেখেছে?

পূর্ণিমার ক্ষোভ মেশানো কষ্টের কথা আমি বিস্ফারিত চোখে শুনে যাই। বুকের ভেতর শেল বিঁধে থাকে যেন।

পূর্ণিমা আরও বলতে থাকে—

ডিস্ট্রিক বোর্ডের পাকা রাস্তাটি টিলা ঘেঁসে চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। টিলার উপরেই পর্যটন করপোরেশনের এই বাংলোটি বেশ আধুনিক। বাংলোর সামনের অংশ সবুজ ঘাস আর মরশুমি ফুলে সজ্জিত। বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার এই বাংলোতে এসেছি আজা পাঁচ দিন। আমেরিকার বর্ণিল একঘেয়েমি আর শিকড়হীন জীবনে হাঁফ ধরে গিয়েছিলাম।

আমার মায়ের ফুলের সাথে আমার নাভির যোগাযোগ ছিন্ন করার সময়ই আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম আমার মা থেকে কিন্তু আমার শরীরে বইছে যে মা-বাবার রক্ত সেটা থেকে কি করে বিচ্ছিন্ন হই! তাই এসেছি আমি আমার শিকড়ের সন্ধানে এই দেশে। খুঁজে পাবো কিনা জানিনা। কেননা যে সমাজে আমি “জারজ সন্তান” নামে পরিচিত সেখানে আমার জন্মের এত বছর পর আমার প্রকৃত বাবা-মা কি আমাকে স্বীকৃতি দেবে? মেনে নেবে তাদের সন্তান হিসেবে! তাঁদের খুঁজবোই আমি কোন পরিচয়ে? নানান ভাবনায় মন অস্থির! আমার জন্মামদাত্রী মায়ের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে–মা আমি জারজ সন্তান না হয়ে মানুষ হলাম না কেন?

দিদি ঠাণ্ডা লেগে যাবে গায়ে অন্তত ওলেনটা দাও—বিছানার চাদর টেনে দিতে যেয়ে খোলা বারান্দায় আরাম চেয়ারে বসে থাকা আমার দিকে চোখ যায় বাংলোর কেয়ার টেকার কলমির। ভাবনার অতলে ডুবে যাওয়া আমি তাঁর কথায় সম্বিত ফিরে পাই। এতোক্ষণে বুঝতে পারি বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে গত কয়েকদিন যাবত। সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঠিক গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি না। মিহি জলের ছিঁটার মতো সূক্ষ্ম বৃষ্টি। তবে নিউইয়র্কের হাড় হিম করা ঠাণ্ডার কাছে এ খুব সামান্য।

রাত দশটার মতো বাজে। পশমি শালটি নিতে ঘরে যাই। বিক্ষিপ্ত ভাবনারা মন দখল করে আছে আজ। জীবনের প্রথম ভোরে আমার কান্নায় আনন্দ ধারা বয়ে যায়নি কোথাও বা কারো প্রাণে। ঘরের ভেতর ফিসফাস চলছে, কী করে আমাকে সমাজের রক্তচক্ষু আড়াল করে নর্দমার ময়লাতে ফেলে দেওয়া হবে। আমার জন্ম রাতেও নাকি এমন বৃষ্টি ছিলো। আমাকে প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়ানো পাওয়া যায়। আচ্ছা শেষ মূহুর্তে কি আমার জন্য আমার মায়ের মমতা কিছুটা জেগেছিলো! শাল গায়ে ফিরে আসি আবার বারান্দায়।

জন্মের পর পর আমাকে ফেলে দেওয়া হয় ময়লা আবর্জনার স্তূপের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নোংরা নর্দমায়। করুণার প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলাম সেই নর্দমায়। কোন এক হৃদয়বান পথচারির চোখ যায় আমার উপর। সেই ব্যক্তি তুলে এনে আমাকে দিয়ে আসে রাজশাহীর একটি অনাথ আশ্রমে। অনাথ আশ্রমের রেজিস্ট্রি বুকে “জনৈক পথচারী” এই নামটিই আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার জন্ম রাতে ছিল ভরা পূর্ণিমা। তাই আশ্রম থেকে আমার নাম রাখা হয় পূর্ণিমা।

আমি পূর্ণিমা উইলসন। নাম শুনলে সবাই ভাবে আমার বাবা অথবা মা আমেরিকান। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই একটু অবাক হয়ে যায়, কারণ আমার চেহারা পুরোপুরি বাঙ্গালী। আবার কখনো ভাবে, আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে তার নাম নিয়েছি। তবে নাম আর চেহারার এই তফাতের জন্য আমাকে বেশ কৌতূহলি দৃষ্টি আর অবাক করা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

জুলিয়ানা উইলসন ও পিটার উইলসন দুটি পুত্র সন্তানের জনক-জননী। আমেরিকার অ্যারিজোনার বাসিন্দা। একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থার কাজে তাঁদের বাংলাদেশে যেতে হয়। রাজশাহীর একটি অনাথ আশ্রমের নবজাতক বিভাগে আমাকে রাখা হয়েছিল। আমার বয়স তখন সাত দিন। নর্দমার পোকা-মাকড় আমার কচি নখের কোণা খেয়ে ফেলে। তাতে আমার আঙ্গুলে ও নাভীতে ইনফেশন হয়। আমি সেই সময় খুব কান্না করছিলাম। সাত দিন বয়সি ক্রন্দনরত আমার ছোট্ট মুখটির দিকে চেয়ে মিস জুলিয়ানার মনে দয়ার উদ্রেক হয়। সে কোলে নিতেই আমি শান্ত হয়ে যাই। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে দত্তক নেওয়ার। আমি হয়ে যাই পূর্ণিমা উইলসন। আমার ১৮ তম জন্মদিনে আমাকে জানানো হয়, আমার প্রকৃত পরিচয়। তারা আমাকে নিজের সন্তানের মতোই লালন করেন।

আমার দুই চোখ উপচে উঠছে। ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে পাশে বসে থাকা পূর্ণিমার মুখটিও আমি পরিষ্কার দেখতে পারছি না। বুকের ভেতর অনুভূতির চাপ এতোটাই প্রবল যে, আমি কেবল তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারলাম, এখন থেকে আমাকে মা ডাকবি। তোর সব রকম আদর -আবদার -আহ্লাদে আমি আছি তোর পাশে।

হুহু করে কাঁদছে আমার মেয়েটি। কাঁদুক। মন ভরে আজ কাঁদুক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 537
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    537
    Shares

লেখাটি ৫,২৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.