দিশা সত্যিই আজ দিশাহীন

0

রুমা সরকার:

একটি মেয়ের গল্প বলি। মেয়েটির নাম দিশা। বাবা মারা যাওয়ার পর মেয়েটি হয়ে পড়ে একদম একা। সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকলে সরকারি চাকুরে দিশা দিনশেষে কেমন যেন বন্ধুহীন একা। আর সেই শূন্য সময়ের ফাঁকে দিশার জীবনে রাঘবের প্রবেশ।

সামান্য বেসরকারি চাকুরে রাঘবের সঙ্গে স্বল্প দিনের পরিচয়, প্রণয়, বিয়ে, সন্তান। বিয়ের পরপরই রাঘবের আচরণে দিশা টের পেয়ে যায়, রাঘব পুরো শিক্ষিত নয়। সেই সাথে অর্থলোভী। এমনকি বিয়ের এক দেড় মাসের মধ্যেই গায়ে হাত তোলে। দিশাও সরে যেতে চায় রাঘবের জীবন থেকে। রাঘব গায়ে হাত তুললে দিশা তার মা, ভাই, বোনদের ডাকে। কিন্তু এরই মধ্যে দিশা কনসিভ করে ফেলে। তবুও দিশা নিজের সিদ্ধান্তে অটল এই ছেলের ঘর করবে না।

বিয়েতে যৌতুক চায়নি, কিন্তু বিয়ের সাত দিন পরই দুই লাখ টাকা চায়। বড় বোন এসে এক লাখ দিয়েও যায়। কিছুদিন পর আবারও এক লাখ। দিশা দিশেহারা হয়ে পড়ে কী তার করণীয় ভেবে! সিদ্ধান্ত নেয় এই বেবি সে রাখবে না, রাঘবের সঙ্গে সংসার সম্ভব নয় বলে। ডাক্তারকে সব খুলে বললে প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাজি হয় টার্মিনেট করতে। পাঠায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে, ধরা পড়ে যমজ। ডাক্তার রিস্কি ফ্যাক্টর বলে পাঠিয়ে দেয় বাসায়।

দিশা আনারস খায় বেবি নষ্ট করার জন্য, কঠিন এক্সারসাইজ করে, তবুও মিসকারেজ হয় না। বাধ্য হয়েই দিশা আজ যমজ সন্তানের মা এবং আজও রাঘবের স্ত্রী। রাঘব প্রতিনিয়ত দিশাকে দোষারোপ করে। গায়ে হাত তুলে। মেরে ফেলার হুমকি দেয়। দিশা ভোর পাঁচটায় ওঠে রাঘব এবং তার বেবিদের জন্য রান্না করে। দৌড়ে অফিসে যায়।

দিশার মা-ও আজ নেই। বাবা মারা যাওয়ার সময় মাকে দিশার হাতেই তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু অসুস্থ মাকে একটু চিকিৎসা গ্রহণেরও সুযোগ পায়নি দিশা শুধুমাত্র রাঘবের অসহযোগিতার জন্যে। মা তার একা ঘরে মারা যায়। মা ফোন দিলে রাঘব বিরক্ত হতো, যে রাতে রাঘবের ভয়ে দিশা তার ফোন সাইল্যান্ট করে রাখলো, পরদিন ভোরবেলায় দেখলো ৯২ বার মিসডকল হয়ে আছে দিশার ফোনে।
সকালের ব্যস্ততা সেরে মাকে ফোন করবে বলে দিশা ফোন নিয়ে এতোগুলো মিসড কল দেখে বুঝতে পারে না কাকে ফোন করবে! মা এর নম্বরেই ফোন দেয় সে। রিসিভ করে ছোট ভাইয়ের বউ। দিশা জানতে পারে তার মা নেই। তবুও দিশা শক্ত হতে চায়।

ঠিক এক বছরের মাথায় রাঘবের বাবার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার সমস্ত খরচ দিশা বহন করে তার একার রোজগার থেকে। একবারও ভাবতে চায় না যে এই মধ্যবয়সী শ্বশুর-শাশুড়ি থাকতে যমজ বাচ্চা লালন-পালনে দিশার কতো কষ্ট হতো। তবুও উনারা পাশে দাঁড়াননি। বরং রাঘবকে সরিয়ে নিতে চাইতো প্রতিনিয়ত। ব্রেস্টফিড করা বাচ্চাকেও মা ছাড়া করেছে কতবার। রাঘবের বাবা হাসাপাতালে চিকিৎসা নিতে নিতেই মারা যান। সৎকার- শ্রাদ্ধ সব দিশার টাকাতেই হয়। অথচ তাদের টাকার অভাব নেই, এমনকি জমি বিক্রি করে ভাইকে ভারতেও পাঠিয়েছে।

এতোকিছুর পরও রাঘব প্রতিদিন বলবে, জমি বিক্রি করেই যদি সংসার চালাতে হয়, তবে আর তোর সঙ্গে সংসার কেন? অথচ দিশার মনে নেই রাঘব কখনো বাচ্চাদের কিংবা তার পেছনে কোন টাকা খরচ করেছে কীনা! দিশাকে প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়, গায়ে হাত তুলে, ডিভোর্স দিতে বলে। রাঘব এই বলে গালি দেয় যে, তুই যদি আমাকে ডিভোর্স না দিস, তবে তোর ভাইদের সঙ্গে থাকিস। আরো বলে, ‘শোন, তুই এতোগুলো সবরি কলাও খাস নাই, আমি যতজন মেয়ের সঙ্গে শারীরিকভাবে মিশেছি’।

যমজ ছেলে দুটোর এখনও চার বছর পূর্ণ হয়নি। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে চাকরিটা সার্ভাইভ করতে পারবে না বলে দিশা সব মুখ বুঁজে সয়ে যাচ্ছে। প্রায়দিনই দিশাকে অফিস করে এসে দরজা বন্ধ করে রাখতে হয়, রাঘবের রাগ থামলে দিশা দরজা খুলে বেরিয়ে এসে সংসারের কাজে হাত লাগায়। শুধুমাত্র বাচ্চা দুটোর জন্যই দিশা আজ সত্যিই দিশাহীন হয়ে জীবন কাটায়। কিন্তু কেন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

লেখাটি ৪২৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.