দূর, তোমার দূরত্ব কত?

0

শেখ তাসলিমা মুন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু শিক্ষককে প্রেমের জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনাটার বিস্তারিত আমি জানি না। শুনেছি, পুরুষ শিক্ষকটি বিবাহিত। তার কলিগ বিবাহিত বা অবিবাহিত জানি না। জেনেছিলাম, তারা প্রেমে পড়েছিলেন। এটি জেনে শিক্ষকের স্ত্রী এসে স্বামীকে টেনে বের করে শিক্ষিকাকে তালা দিয়ে রেখে যান। আজ জানলাম, পুরুষ শিক্ষককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর আগে প্রেমিকা শিক্ষককে তার সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

আমি অবশ্য জানি না এ প্রত্যাহার ও অব্যাহতির কারণ হিসেবে কংক্রিট কোন অপরাধকে নির্দেশ করা হয়েছে। যতটা মনে হলো শব্দগুলো এমন, ‘অসামাজিক কাজে লিপ্ত’ থাকার অপরাধে তাদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে ‘অব্যাহিত’ এবং ‘প্রত্যাহার’ করা হয়েছে। এই ‘অসামাজিক’ কাজে লিপ্ত থাকাটা কী, সে বিষয়টি অবশ্য জানা যায়নি।

তাঁরা প্রেমে পড়েছেন এটা জানা গেছে। কিন্তু ‘অসামাজিক কাজে লিপ্ত’ থাকার বিষয়ে জানার একটি প্রচণ্ড আগ্রহ বোধ করছি। যতদুর শুনেছি, তাঁরা কথা বলেন বা বলছিলেন শিক্ষক রুমে। এবং তাঁরা প্রায়ই কথা বলেন। সেখানে তাঁরা প্রেমই করছিলেন ধরে নিলাম।
প্রশ্ন, তাঁরা কি সেখানে যৌনকাজে লিপ্ত ছিলেন? কর্মক্ষেত্রে যৌনকাজে লিপ্ত হওয়া বিষয়ে অবশ্যই অফিসিয়াল রুলস আছে। সেটি অফিসের কর্মকাণ্ডের জন্য নিয়ম বহির্ভূত। কিন্তু দুজন শিক্ষক যদি নিরালায় গল্প করেন, প্রেমালাপ করেন, এমনকি তাঁরা যদি চুমুও খান সেটির অপরাধে তাদের প্রফেশনাল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়াটির আইন বিষয়ে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠছি।

দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়তে পারবেন না, এমন আইন কি কোনো কর্তৃপক্ষ জারি করতে পারেন? শুধু প্রেমের জন্য কি তাদের স্যাক করা যায়? আইন জারি করে কি কারও প্রেম নিষিদ্ধ করা যায়?

দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব দায়িত্বে তাদের ব্যক্তিজীবন পরিচালিত করবেন। তাদের ব্যক্তিজীবনের সিদ্ধান্ত, তাঁদের অনুভুতি, প্রেম, ভালবাসা, বিচ্ছেদ, মিলন বিষয়ক বিষয়গুলো সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ। ব্যক্তিগত অনুভুতির অংশ। প্রেমে পড়ার জন্য তাঁদের কর্ম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অধিকার কারও থাকা উচিত নয়। সে স্পর্ধাও থাকা উচিত নয়।

তাঁরা যদি বিভাগের টাকা চুরি করে থাকে, প্রশ্নপত্র ফাঁস করে থাকে, কাজে অদক্ষতার পরিচয় দেয়, কাজে অপেশাদারিত্ব দেখায়, অনুপস্থিত থাকে, কারণ না দেখিয়ে অনিয়মিত থাকে, সেগুলো অবশ্যই তার পেশাগত ব্যর্থতার ভেতর পড়ে। কিন্তু একজন কেন প্রেমে পড়লো, সেজন্য তাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পেশা থাকতে হয়। যেসব পেশায় confidentiality একটি শর্ত, সেসব ক্ষেত্রে প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীকে একই বিভাগে রাখা হয় না। তাদেরকে ভিন্ন বিভাগে বদলী করার নিয়ম আছে।

বিচার বিভাগেও এমন কিছু শর্ত থাকে। একই মামলার আসামী-বিচারক সম্পর্ক, বিচারক – সাক্ষী সম্পর্কে কেবল স্বামী-স্ত্রী নয়, নিকট আত্মীয়তা থাকলে সে বিচারক বা কর্তব্যরত জুডিশিয়াল পার্সনকে infringement ইস্যুতে disqualified বলে গণ্য করা হয়।

আমার অভিজ্ঞতায় আমার দু কলিগস প্রেমে পড়ে। একই অথরিটি, কিন্তু একজনকে আরেক বিভাগ এবং আলাদা দায়িত্বে বদলী করা হয় confidentiality ইস্যুতে। সুইডেনে দায়িত্বরত এক কেবিনেটের দু মন্ত্রী একবার প্রেমে পড়েন। একই ইস্যুতে একজনকে কেবিনেট ছাড়তে হয়।

কিন্তু ‘অসামাজিক কর্মে লিপ্ত’ থাকা বলতে কী বোঝায়, তার কারণে দুজন কোয়ালিফায়িড বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয় সেটি যুগপৎ বিস্ময়ের বিষয়। দুজন মানুষ কেন প্রেমে পড়লো সেজন্য তাঁদের স্যাক করার অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠান, মানুষের থাকতে পারে না। এখানে তাঁরা দুজনই প্রাপ্তবয়স্ক এবং কলিগস।

অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষ নীতি রাখার দরকার হয়, সেটি পারস্পরিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতার কারনে। শিক্ষক সেখানে ছাত্রর সাথে পারিবারিক সম্পর্কে পক্ষপাতিত্ব করতে পারেন। বা তার উপরের অবস্থানকে ব্যবহার করে একজন ছাত্রী বা ছাত্রকে সম্পর্কে বাধ্য করতে পারেন।

আমি যে দেশে বাস করি, একজন বস যদি তার আন্ডারে কর্মরতর প্রেমে পড়ে এবং দুজনই সম্পর্ক বিষয়ে একমত হয় বসকে সে বিভাগের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে সম্পর্ক গড়তে হয়। দায়িত্বে থেকে নয়। একইভাবে একজন ডাক্তার তার পেশেন্টের প্রেমে পড়লে তাকে সেই পেশেন্টের ফিজিশিয়ান থকে অব্যাহতি নিতে হয়।

শেষ কারণ হিসেবে যদি ধরে নেই, একজন বিবাহিত বা দুজনই বিবাহিত থাকা সত্ত্বেও প্রেমে পড়েছেন, সেটিও তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক জাহান্নামে না ফুলেল সমাধিতে, সেটি সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। তাঁরা তাঁদের বিবাহ-প্রেম কিভাবে হ্যান্ডল করবে, সেটি সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। তাঁরা ট্রায়াঙ্গল প্রেম চালাবে, না শুদ্ধ বৈবাহিক প্রেম, সেটিও তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। এটা নোবডিজ বিজনেস। তাঁদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়ে রুলস জারি করার অধিকার কোনো কর্তৃপক্ষের নাই। থাকতে পারে না।

বিবাহ ভেঙে পড়া একটি প্রতিষ্ঠান। এভাবে বিবাহ টিকিয়ে রাখা যাবে না। মানুষকে সৎ হতে হবে। যার যার কাজের দায়িত্ব তাকে নিতে হবে। আপন দায়িত্বের মাধ্যমেই সে তার করণীয় ঠিক করবে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সে প্রাজ্ঞ হবে। পৃথিবীতে কোনকিছু নিষিদ্ধ হতে পারে না, তবে সব কাজের একটি দায়িত্ব থাকে। সে দায়িত্বে সে তার কাজের কনসিকোয়েন্স এবং সে অনুযায়ী কৃতকর্ম নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। সেখানে অন্যের ট্রেসাপাস সম্পূর্ণ অন্যায় এবং অপরাধ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares

লেখাটি ৮৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.