লড়াকু কবি আলেয়া চৌধুরী, আপনাকে ভালবাসা

0

মনিজা রহমান:

বাংলাদেশের প্রথম নারী বাস কন্ডাক্টরকে আপনারা কেউ জানেন? জানেন না? কীভাবে জানবেন, খেটে খাওয়া মানুষের কথা সেভাবে কখনও ইতিহাসে লেখা হয় না।

তিনি শুধু প্রথম বাস কন্ডাক্টরই ছিলেন না। ছিলেন পত্রিকার হকার। ট্রাক ড্রাইভার। রিকশা চালক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কাছে পাবলিক বাস চালনার অনুমতি চেয়ে চিঠিও লিখেছিলেন। তবে সব কিছুর ওপরে তিনি কবি, একজন অদ্বিতীয় বাঙালী, বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর, তিনি হারলেমের নিগ্রো, তিনি পৃথিবীর সমস্ত সংগ্রামী মানুষের প্রেরণা, তিনি কবি আলেয়া চৌধুরী।

কুমিল্লার চর্থা নামে এক গ্রাম থেকে তাঁর যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল সেই ষাটের দশকে। গ্রাম্য সালিশে ফতোয়াবাজদের মুখে আগুন লাগানো পাটখড়ি ছুঁড়ে দিয়েছিল যে নয় বছরের মেয়েটি, তাঁর লড়াই তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ঝাড়ু দিয়ে সেদিন তাকে শুধু পেটানো হয়নি, ক্ষতস্থানে লেবুর রস আর লবণ লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। বেঁধে রাখা হয়েছিল বাড়ির বাইরে। রাতের অন্ধকারে আড়াই টাকা হাতে দিয়ে স্নেহময়ী মা স্বামীর অগোচরে কন্যাকে বলেছিল, জীবন বাঁচাতে শহরে পালিয়ে যেতে।

কমলাপুর স্টেশনে শুরু হলো এরপর সেই শিশুটির কুলি-মজুর আর কিছু দ্বিপদ জন্তুর সঙ্গে ছন্নছাড়া জীবন। এক বাস ড্রাইভারের মায়া হলো মেয়েটির প্রতি। উনি শিশু আলেয়াকে পালক নিলেন। কিন্তু নিয়তি আবারও খেললো মেয়েটিকে নিয়ে। এক সড়ক দুর্ঘটনায় পালিত বাস ড্রাইভার পিতার মৃত্যু হলে মেয়েটির আশ্রয় হলো এতিমখানায়।

বাস কন্ডাক্টরের ভূমিকায় যার জীবিকার শুরু, সে ইরান, জার্মানী, বাহামা পৃথিবীর নানা বন্দর ঘুরে এক সময় থিতু হলো আমেরিকায়। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে স্কুলে পড়ার সুযোগ না পেলেও আলেয়া চৌধুরী স্বশিক্ষিত একজন মানুষ। তাঁর কবিতার প্রত্যেকটি শব্দ, প্রত্যেকটি উপমা যেন প্রখর সূর্যালোকের মতো দেদীপ্যমান। শুধু বাংলা নয়, ইংরেজিতেও কবিতা লিখেছেন আলেয়া চৌধুরী।

নিয়তি নির্ধারিত দৈববাণীর মতো জীবন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছে বারবার। নয় বছর বছর বয়সে শুরু হওয়া লড়াই সাতান্ন বছরে এসেও শেষ হয়নি, হয়তো কোনদিনই হবে না। কিন্তু চার ফুট এগারো ইঞ্চি উচ্চতা নিয়েও আলেয়া চৌধুরী গ্রিক বীর হারকিউলিসের মতো নিরন্তর লড়াই করে চলেছেন নিয়তির বিরুদ্ধে। তাইতো এখনও ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করেও তিনি আর্শ্চয্য সজীব, প্রাণবন্ত একজন মানুষ।

রবিবার সকালে কবি আলেয়া চৌধুরীকে ঘিরে নিউইয়র্কের সুধী সমাজের অন্তরঙ্গ আড্ডায় সবার সরব উপস্থিতি বলে দিয়েছে তিনি কীভাবে আমাদের অন্তরে আছেন, থাকবেন, তিনি কতখানি অনুপ্রাণিত করেন আমাদের!

আলেয়া আপা, আপনার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 75
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    75
    Shares

লেখাটি ২১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.