বাবা-মায়ের পথ আলাদা, সন্তানের কী দায়!

0

নাসিব-ই-নূর নিতু:

“অনেকটা বাধ্য হয়ে আশরাফকে বিয়ে করেছিলো শায়লা। বিয়ের পরে জানতে পারে আশরাফের আরেকটা সংসারের কথা। তাও সে মেনে নিয়েছিলো নিজের ছোট ভাই-বোনের দিকে চেয়ে। সেই না ভালোবাসার ঘরে একটা মেয়েও হলো। নিত্য দিনের অশান্তির সাথে যখন গায়ে হাত উঠলো, তখন আর কোনদিকে না তাকিয়ে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে ঘর ছাড়ে শায়লা। শক্তি একটাই ,সে চাকরিজীবী”।

আমি যে সময়ের কথা বলছি তা এই একবিংশ শতকের কথা না। আশির দশকের কথা। কতটা কঠিন একটা সময় পার করেছে শায়লা, সেটা শুধু শায়লা জানে আর জানে বেড়ে ওঠার পর ওর মেয়েটা।
প্রথম ঝড়টা আসে পরিবারের পক্ষ থেকেই। কিন্তু না আর আশরাফের কাছে ফিরে যায়নি। মেয়েকে নিয়ে অন্য জেলায় পোস্টিং নেয় সে। সেখানেও পোহাতে হয়েছে নানা যন্ত্রণা। সেসব লিখলে একেকটা অংশ একেকটা অধ্যায় হয়ে যাবে। না শত কিছুর পরও শায়লা থেমে থাকেনি। মেয়েটাকে বড় করেছে বেশ ভালো ভাবেই। কিন্তু অতিক্রম করতে হয়েছে বহু বন্ধুর পথ।

মূল আলোচনায় আসি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যখন দেখে সে শুধু সমঝোতায় সংসার করছে, আর সেই সমঝোতা করাটাও এক সময় আর সম্ভব হচ্ছে না, তখন যদি সে সিদ্ধান্ত নেয় পথ পরিবর্তনের, তবে সমাজের কেন এতো মাথাব্যথা!

বন্ধ ঘরে উচ্চ ভলিউমের মিউজিকের আড়ালে যখন সে মার খাচ্ছিলো তখন কোথায় ছিলো সমাজ তার রক্তচক্ষু নিয়ে? হ্যাঁ, সমাজ তখন “ইহা একটা পারিবারিক ব্যাপার” বলে চক্ষু দুখানা বন্ধ করেছিলো। শায়লা বাধ্য হয়েছিলো তার পথ পরিবর্তন করতে। তার আত্মসম্মান বোধ সায় দেয়নি এই পদদলন। কিন্তু কী অপরাধে দণ্ডিত হয়েছে শায়লার মেয়ে শ্রাবন্তী, তা কি কেউ বলতে পারেন?

ছোট্ট বয়স থেকে যখন সে স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন সে জানতো, তার জীবন আর দশজনের চেয়ে আলাদা। শায়লা তাকে বুঝিয়েছিলো ওইটুকু বয়সে যে, তার বাবা আর মা দুটোই শায়লা। কিন্তু সমাজের প্রশ্নবাণ সহ্য করার বয়স কি হয়েছিলো ওইটুকুন মেয়ের? ক্লাশের সহপাঠিরা প্রায় জিজ্ঞাসা করতো, “তোমার বাবা কী করে”? সে ছোট্ট করে উত্তর দিত “চাকরি করে”। এরপরের উত্তর আর তার জানা থাকার কথা না। এরপর যখন ওই বাচ্চাদের অভিভাবকেরা ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করতো শ্রাবন্তীকে তার বাবার কথা, তখন ওই বাচ্চাটার অসহায়ত্ব উপলব্ধি করার মানসিকতা কি তাদের হয়েছে? বাবা-মায়ের একসাথে থাকা সম্ভব হয়নি এই দায় কি ওই সন্তানের? তাকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করার কি কোন মানে আছে?
মাঝে বেশ কিছুদিন পার হবার পর শায়লা মেয়ের কথা চিন্তা করে নিজ জেলায় বদলী নিল। মেয়েকে ভর্তি করলো সেখানকার স্কুলে। মেয়ে ততদিনে অনেক কিছুই বুঝে।

শ্রাবন্তী নিজেই উত্তর তৈরি করে নিলো যে তার বাবা মারা গেছে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে সে এই উত্তরটাই দিত। তাতে অনেক ঝামেলা এড়ানো যেত। কিন্তু হয়তো খুব গোপনে কাছের কাউকে সত্যি কথাটা বলার পর শ্রাবন্তী দেখতো তার বদলে যাওয়া ব্যবহার। অভিভাবকদের কাছ থেকে বিধি-নিষেধ আসতো যে শ্রাবন্তীর সাথে মেশা যাবে না।
বাহ! কী জাজমেন্টাল বিহেভিয়ার আমাদের সমাজের? আচ্ছা কেউ আমাকে বলুন, বাবা-মায়ের আলাদা থাকার পেছনে কি শ্রাবন্তীর কোনো হাত ছিলো? কেউ ওর দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে না দেখে, ওর বাবা-মায়ের সম্পর্ক নিয়ে ওর সাথে ওর সহপাঠির দূরত্ব তৈরির মানসিকতাটা কতটা গ্রহণযোগ্য?

অনেকটা অস্পৃশ্যের মতো নিজের স্কুল জীবন পার করে শ্রাবন্তী। কিন্তু এরপর আর শ্রাবন্তী কাউকে বলেনি তার বাবা মৃত। বলতো, আমার কাছে মৃত। অপরপক্ষ কী ভাবলো না ভাবলো এইসব ভাবার উর্ধ্বে চলে গেছে শ্রাবন্তী। সে বুঝে গেছে, কীভাবে সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে হয়।

সময়টা কি এখন খুব একটা পাল্টেছে? পাল্টেছে আমাদের হীন মানসিকতা?
আমাদের সমাজ আমাদের চারপাশে এমন অদৃশ্য একটা দেয়াল তৈরি করেছে, যা আমরা ভাংতে পারছি না কোন ভাবেই। আজো এই একবিংশ শতাব্দিতে দাঁড়িয়ে কারো একা থাকাটা আমাদের কাছে কাঁটার মতো বেঁধে। বাচ্চার স্কুলের অভিভাবকদের গ্যাদারিং থেকে আরম্ভ করে কিটি পার্টি, সবখানেই চর্চিত হতে থাকে কারো না কারো একা থাকার বিষয়। অথবা অমুক বাচ্চাটার না মা-বাবা আলাদা থাকে। শুরু হয়ে গেল বাচ্চাটাকে নিয়ে ব্যবচ্ছেদ।

“বাচ্চাটার আচরণ খারাপ, পরিপাটি ড্রেস পরে স্কুলে আসে না, প্রতিদিন একই টিফিন খায়” এমন আরো কত কী”! সিঙ্গেল মাদার- হয়তো সময় পায় না অফিসের কারণে বাচ্চাটাকে স্কুলে নিতে আসতে। কোন কাজের সহকারী হয়তো নিয়ে যায়। সেখানেও হাজার দোষ। আমার বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে বসে থাকার সময় এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেখতাম অনেকেই একজন নির্দ্দিষ্ট কোনো মাকে নিয়ে আলোচনায় মুখর। তার বাচ্চার কাপড় নাকি কোঁচকানো। বাচ্চাটা নাকি টিফিনে অলটাইমের ব্রেড খায় প্রতিদিন। কিন্তু কোন দরদীকে দেখিনি ওই বাচ্চার জন্য একদিন টিফিন বানিয়ে আনতে। এই তো আমাদের সমাজের রীতি।

সমাজ আমাদের চলার রাস্তা নির্দ্দিষ্ট করে দেবে, কিন্তু চলতে হবে আমাদেরই। আমরা কি আমাদের মননে-মগজে একটু আধুনিকতা একটু সহনশীলতা আনতে পারি না? যে মায়ের চলার পথ পিচ্ছিল, তার সন্তান কে ওই পিচ্ছিল পথে ধাক্কা দিয়ে না ফেলে তার দিকে একটু হাত বাড়িয়ে দিতে! উপকার করতে না পারি কিন্তু অপকার যেন না করি। সে বাচ্চাটির মনে সমাজের নেগেটিভ দিকটা ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য না করলেই কি আমাদের নয়?

ভালো থাকুক সব এমন মায়ের বাচ্চারা। নিজের চলার পথ নিজেই তৈরি করে নিক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 263
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    263
    Shares

লেখাটি ১,০২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.