ভালবাসা আসলে কী!

0

শেখ তাসলিমা মুন:

হিন্দু মিথলজির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জুড়ে আছে রাধা-কৃষ্ণ। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম জাগতিক নিষিদ্ধতার বেড়ি অতিক্রম করে এক আধ্যাত্মবোধের প্রতীক হয়ে আমাদের প্রেম ও ঈশ্বরবোধের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে রয়েছে। আমাদের সাহিত্যের বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে রাধা কৃষ্ণের প্রেম। আধ্যাত্মবোধ থেকে রাধার স্বামীকে দেখা হয় ‘সংসার’ বা ইহজগত হিসেবে। কৃষ্ণ সেখানে ভগবান। ভক্ত যখন ঈশ্বরের প্রেমে মিলিত হতে চায়, ভক্ত (রাধা) তার সকল বাঁধাকে (সংসার) অতিক্রম করে সে তার ঈশ্বরের সাথে মিলিত হয়। ঈশ্বরও (কৃষ্ণ) তার প্রকৃত ভক্তের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য একই রকম উদগ্রীব হয়ে থাকেন। ইহজগতের বাঁধা অতিক্রম করে তারা মিলিত হয়। রাধা-কৃষ্ণ এভাবেই পার্থিব ও অপার্থিব দু প্রেমের এক অপূর্ব প্রতিক হয়ে আমাদের জীবনে উদাহরণ হিসেবে বারবার আসে।

কিন্তু উদাহরণটি বাস্তব জীবনে মর্ম বেদনার কারণ হয়ে আসে। সংসারের বেড়িতে যে নিয়ম, সে নিয়ম ভাঙা প্রেম জীবন ভাঙতে আসে। আর সে নিয়ম বারবার তবু ভাঙে।

প্রতিশ্রুত প্রেম ভাঙে। ভেঙে পড়ে। মানুষ প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার জন্যই। মানুষের মন এমন একটি সত্তার সন্নিবেশ, যাকে আর যা-ই হোক, নিয়ম মানানো সম্ভব হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজে সেটা মানার কিছু শক্তিশালী কারণ খুঁজে না পায়। বিপর্যয়টা সেখানেই নেমে আসে। দাম্পত্য জীবনের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, কাউকে না কাউকে দিতে হয় চরম মূল্য। তার উপর গড়ে ওঠে এই প্রক্রিয়া। তাকে গড়ে ওঠে না বলে, বরং বলা যায় ভেঙে পড়ে এ প্রক্রিয়াটি।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবনের ব্যর্থতা ও বিপর্যয়ে তৃতীয় ব্যক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে। একটি সুখী ও সফল দাম্পত্য জীবনেও সে অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। মানুষ তার সঠিক প্রেমকে খুঁজে পেতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কে প্রবেশ করার পর বা আগে। এখানে নিয়মের বেড়ি কাজ করে না। প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, যে কোনো মানুষের গড়া ‘ভালবাসার’ কাঠামো ভেঙে পড়ে। একবার নয়, বারবার।

প্রাতিষ্ঠানিক কন্সেপ্টের বাইরের ভালবাসা অসিদ্ধ করে রেখেছে মানুষ। জগত সংসার নিয়মের লাগাম টেনে ধরতে যতটা কসরত মানুষের করা প্রয়োজন, মানুষ করেছে। পৃথিবীর হারমনি তাতে আদৌ রক্ষা হয়েছে কিনা জানি না, তবে ভালবাসা বাজারজাত হয়েছে।

আরও বলা যায়, ভালবাসা প্রকৃতপক্ষে অনেকটা আধুনিক একটি ফেনোমেনা। দুজন মানুষ পরস্পরকে ভালবাসবে সে মনের দাবি জাগ্রত হয়েছে সেদিন মাত্র। পরিবারের জন্মের পর মানুষ ভালবাসাকে আলাদাভাবে বোঝেনি। প্রজনন বংশবৃদ্ধির সাথে বিয়ের সম্পর্ক জড়িয়ে পড়ে। সেখানে দুজন মানুষের ভালবাসার এ নান্দনিক বৃত্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বরং ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দিয়েছে কাকে তাকে ভালবাসতে হবে। আর সেখানেই বিবাহ হয়ে উঠেছে একটি ‘বাজারজাত’ বিষয়। কার সাথে কার বিয়ে হবে সেটি পাত্রপাত্রীর মার্কেট ভ্যালুর উপর নির্ভর করে। পরিবার সেটি নির্ধারণ করে। বলা যায় সমাজ ভেদে এটি আজও বলবৎ।

ভালবাসা কি আলাদাভাবে দাঁড়াতে পেরেছে?

আমি একবার একজন ইউরোপিয়ান মিডিয়া সাংবাদিক মহিলার আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিয়িং দ্য আদার ওম্যান’ পড়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিলাম।

আমার মনে হয় না এমন কোনো শব্দকে আমি আজও আশ্রয় করতে পারবো, যা দিয়ে সেই মহিলার অনুভবকে প্রকাশ করতে পারবো। শুধু ভালবাসা কতটা বেদনা বয়ে আনে জীবনে সে এক রক্তক্ষরণের গল্প।

আমি তাই আমার এই ছোট্ট লেখাটুকুতে যথাসম্ভব মানব সম্পর্কে ঔচিত্য অনৌচিত্য নীতি মুল্যবোধ আরোপ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবো। আমি শুধু চেষ্টা করবো, মানুষ কীভাবে ভালবাসা কবলিত হয়, সে কেন ভালবাসা খুঁজে ফেরে সারা জীবন। কেনই বা তা পায় না, এ নিয়ে কথা বলতে।

ভালবাসা পাওয়ার শর্ত পূরণে যে দিকগুলোর দিকে মানুষ ধাবিত হয় সেগুলোও তাদেরকে ভালবাসা খুঁজতে সাহায্য করছে না। দামি চাকরি, চড়া বেতন, সুদৃশ্য চাকচিক্যপূর্ণ গাড়ি বাড়ি, শরীরী বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে ভালবাসার যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হবার দিকে মানুষ ঝুঁকেছে। নিজেদের আকর্ষণীয় করার পেছনে, নিজেদেরকে সোশ্যালি জনপ্রিয় করার জন্য মানুষ যে পরিমাণ সময় ব্যয় করে এবং ভালবাসার ক্ষেত্রে এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের মার্কেট ভ্যালু বাড়ানোর যুদ্ধে লিপ্ত হয়, এর কিছুই আসলে ভালবাসাকে নিশ্চিত করেনি।

ভালবাসা ফুরিয়ে যায়। একজন মানুষ যে একদিন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতো, যাকে একটি মুহূর্ত না দেখলে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠতো, যার অনুপস্হিতি কোনক্রমে কল্পনায়ও কল্পনা করা যেতো না, সেই মানুষটি তার সকল আলোর ঝিলিক নিয়ে কীভাবে দূরে সরে যায়! মানুষ যখন মনে করে জীবনটা চারদিক থেকে পূর্ণ হয়ে উঠেছে … ঠিক তখনই পায়ের নিচ থেকে মাটিটি সরে যায়।

একটি অসম্ভবকে সম্ভব করার যে প্রক্রিয়া মানুষ সারাজীবন ধরে নেয়, সেই টানাপোড়নে ভুগেই মানুষকে যাপন করতে হয় এক যাপন-অযোগ্য জীবন। মানুষের ভীড়ে একজন মানুষ শুধু একজন মানুষের ভেতরই খুঁজে পাবে তার জীবনের ঠিকানা, একজন মানুষই কেবল ভীষণ স্পেশাল, মানুষ কখনও সেই প্রাপ্তিতে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়? বা পাওয়ার পর তাকে ধরে রাখতে পারে? ধরে রাখা কি বাস্তবসম্মত বা সম্ভব আদৌ? সেটা কি একটি পারসেপশন নয়? কেবল ধারণা? ইল্যুশন?

কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সম্পর্কে মানুষকে কি কোন কাজে কোনকালে বাধ্য করা যায়? মানুষ কি নিজেকেই বাধ্য করতে পারে? চাপিয়ে দেওয়া এক মূল্যবোধ কি জন্ম দেয় না অসততা, প্রতারণা ও ভান? মানুষ কি একটি অসৎ জীবনে নিজেকে সঁপে দেয় না?

তাহলে ভালবাসা কী? মাঝে মাঝে মনে হয় যদি মানুষের হদয়ের দরজাগুলো খুলে দেওয়া যেতো, শোনা যেতো মানুষের ভালবাসার জন্য চিৎকার … শুনতে পেতাম সে সকল শব্দ এক হয়ে কী আর্তই না হয়ে উঠেছে এ পৃথিবী! ভালবাসাই মনে হয় মানব জীবনের সবচাইতে মূল্যবান চাওয়া। মানুষের সব যুদ্ধের বড় যুদ্ধ একটুখানি ভালবাসার জন্য। ভালবাসাকে ঘিরেই তার জীবনের পূর্ণতা ও অপূর্ণতা।

পৃথিবী এগিয়ে গেছে বেশ কিছু দূর, কেবল মানুষের এই হাহাকারের রূপটি রয়ে গেছে সনাতন। কিন্তু ভালবাসার এই অদম্য প্রয়োজনীয়তা মানুষ আসলে কবে থেকে অনুভব করেছে সে বিষয়ে কিছুটা চিন্তা করা যাক না কেন! মানুষ কেন নিজেকে নিয়ে পরিপূর্ণ হতে পারেনি? পর্যাপ্ত অনুভব করেনি কেন সে নিজেকে নিয়ে? এর পেছনের কারণগুলো আসলে কী?

ভালবাসা যে জীবনের মতোই একটি আর্ট, সেটি মানুষ আজও বুঝতে সক্ষম হয়নি। আর তার প্রথম কারণটি আমার মনে হয় আমরা ভালবাসা কী সেটা জানতে এবং শিখতে চাই না। যে ভালবাসার জন্য আকাশচুম্বী ক্ষুধা ও হাহাকার সেই ভালবাসা বিষয়ে আমাদের ব্যবহারিক বা তাত্ত্বিক শিক্ষা নেই। আমরা এতো যে ভালবাসার কবিতা পড়ি, এতো যে ভালবাসার মুভি দেখি, কিন্তু ট্র‍্যাজেডি এই যে আমরা এ বিষয়ে জানার আগ্রহ আমরা দেখাই না। ভালবাসা সবাই চাই, কিন্তু বিষয়টি কী সেটি না জেনেই। ভালবাসার থিওরটিক্যাল জ্ঞান অর্জন দরকারি মনে করি না। ভালবাসাও যে একটি অধ্যায়নের বিষয় সেটি মনে করি না।

ভালবাসায় সফল হওয়ার প্রথম বিষয়টি হলো জানা যে ভালবাসা একটি আর্ট। কলা। সে আর্টটি যে কোন আর্ট যেমন শিখতে হয় সেভাবে এটাকে জানতে হবে। শিখতে হবে। আমরা যেভাবে মিউজিক শিখি, পেইন্টিং শিখি, ইন্সট্রুমেন্ট শিখি, আসবাব বানানো শিখি, ডিজাইন শিখি, নির্মাণ শৈলী অধ্যায়ন করি, জানা দরকার ভালবাসাও শেখার একটি বিষয়। আমাদের প্রধান ভুল ভালবাসাকে আমরা সবচাইতে স্বয়ং সংঘটিত একটি বিষয় মনে করি। বিষয়টি তা নয়।

তাত্ত্বিকভাবে এভাবে বলা যায়, মানুষের বুদ্ধি বিকাশের শুরুতেই মানুষ বুঝতে পারে সে অসহায়। বিশাল পৃথিবী যতো বিশাল, মানুষ সেখানে নিজেকে তত ক্ষুদ্র অসহায় হিসেবে পায়। বিশাল প্রকৃতির কাছে সে ক্ষুদ্র থেকে অতি ক্ষুদ্র এক সত্ত্বা হিসেবে আবিষ্কার করে। এই অসহায়বোধ তাকে তাড়িত করে। এ অসহায়ত্ব তাকে চিন্তাশীল করে। তাকে অনুসন্ধিৎসু করে। তার অনুসন্ধিৎসার ভেতর গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান, সে কোথায় ছিলো, কেন এখানে সে এসেছে? কী তার কাজ? মানুষের ঈশ্বরবোধের জন্ম সেখানে।

মানুষ যখন অনুভব করেছে, সে ক্ষুদ্র অসহায় তখন থেকে তার থেকে বেশি শক্তিশালীর কাছে সে তার ভক্তি প্রকাশ করেছে। তারই সূত্র ধরে সে প্রকৃতিকে ভক্তি করতে শুরু করে। প্রকৃতিকে মানুষ তার থেকে শক্তিশালী মনে করতে থাকে। প্রকৃতির প্রলয় রূপকে ভয় করতে থাকে। ভয় থেকে ভক্তির জন্ম হয়। ভক্তি থেকে ভালবাসা। মানুষের প্রথম ওরশিপ প্রকৃতিকে ঘিরেই। প্রাচীন ধর্মগুলোর ভেতর আজ অবধি সে নমুনা মেলে। মানুষের ঈশ্বর বোধটি ভয় ভক্তি বিস্ময় এবং অজ্ঞতা বিষয়কে কেন্দ্র করে জন্ম নেয়। মানুষের অনুভবে এ ভালবাসার প্রয়োজনও একটি অসহায়ত্ব থেকে এসেছে। এ অসহায়ত্ব মানুষের মৃত্যুর কাছে। তাকে চলে যেতে হবে এ সত্যকে মানুষ এড়াতে পারে না কোন একটি মুহূর্তেও। মানুষ জন্ম গ্রহণ করে অবধি কোন বিষয়ে নিশ্চিত হতে না পারলেও একটি বিষয়ে মানুষ নিশ্চিত হতে পারে সে তার মৃত্যু। আর সকল বিষয়ে থাকে সে অজ্ঞাত। মানুষের এই সংকট মানুষের ভেতর তৈরি হয় এক গভীর অসহায়ত্ব। এ কারণে মানুষের ভালবাসার নিড ও অসহায়ত্ব সমার্থক। ভালবাসার প্রয়োজনীয়তা মানুষের অসহায় বোধ থেকে।

মানুষ নিজের কাছে আজীবন নিজেই এক অপরিচিত আগন্তুক। নিজেকে সে ভালো চেনে না। এই চিনতে না পারার গভীরে লুকিয়ে থাকে ভীতি, ঘৃণা ও অ্যাঙ্গুইশ। মানুষের সেই ঘৃণা, ভীতিই তার একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা। তাকে জয় করতে চাওয়া মানুষের একাকিত্বকে জয় করতে চাওয়া। একাকিত্বকে জয় করতেই মানুষ মানুষের সান্নিধ্যে আসে। এক প্রকার নিজের থেকে নিজের আড়াল চায়। পারে না। মানুষ যে নিজের কাছে আগন্তুক, তাকে ফেইস করা যেমন তার জন্য সহজ নয়, নিজেকে চেনাও তার জন্য খুব সহজ প্রসেস নয়। মানুষ নিজেকে জানতে ভয় পায়। সেটি থেকে পালাতে সে যখন অন্যের সান্নিধ্যে আসে। কিন্তু তার নিজের প্রতি তার যে ক্ষোভ ঘৃণা এবং ভীতি, তাকেই সে অন্যের ভেতর দেখতে পায়। নিজেকে নিয়ে তার যে আজন্মের ভয়, ঘৃণা যাকে আড়াল বা জয় করার প্রাণপন চেষ্টা সে করে, সেটাকেই আবার সে ব্যর্থ ও প্রকট করে তোলে মানুষের সান্নিধ্যে। সে নিজের ঘৃণাকে আবার ঘৃণা করতে শুরু করে। সে তার প্রিয় অপরপক্ষকে ঘৃণা করতে শুরু করে, তার নিজের উপর ঘৃণা থেকেই। সে তখন জীবনসঙ্গিটির দিকে তাকালে নিজেকেই দেখতে পায়। সে হিংস্র হয়ে ওঠে! সে পালাতে চায়। তার অন্য সত্ত্বাটি আবারও ছুটে চলে …তারই ঘৃণা থেকে পালানোর জন্য … তাকে আড়াল করার জন্য, তাকে জয় করার জন্য! তখন সে ছুটে চলে নতুন আরেকটি সত্ত্বার সন্ধানে …!

মানুষ ইন্দ্রিয় পরিচালিত প্রাণী। মানুষ নিজেকে সামনে নিয়ে চলে অনবরত অনুসন্ধানের মাধ্যমে। এ অনুসন্ধানের মাধ্যমেই সে জানতে পারে জীবনের অনেক বিষয় জানতে এখনও সম্ভব নয়। ডেথ অ্যাঙ্গুইশের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। মানুষ অসহায় হলেও বুদ্ধিজাত প্রাণী। বুদ্ধি দ্বারাই মৃত্যুকে সে জানতে চায়। মৃত্যুকে ভেদ করতে চায়। পারে না। কেবল সে একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারে মৃত্যু অবধারিত। যা তাকে বিচলিত করে। একাকি করে। বিচ্ছিন্ন করে। এই যে জানা, এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির ফসল। এখানে মানুষ কেবল আবেগপ্রবণ প্রাণী নয়। সে বুদ্ধিজাত এবং বুদ্ধি নির্ভর প্রাণী। এ বুদ্ধিবৃত্তি তার অনুসন্ধানের ফলেই অর্জিত হয়। যে বুদ্ধিবৃত্তি তাকে শুধু র‍্যাশনাল করেনা, তাকে ভীত করে, অসহায় করে। এক জীবনব্যাপী অ্যাঙ্গুইশ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।

যা আগেই উল্লেখ করেছি তার মৃত্যু অ্যাঙ্গুইশ। সে বুঝতে পারে নেচারের কাছে সে কতটা অসহায়। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হবে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার শিশুকালটা সে অ্যাঙ্গুইশ আক্রান্ত হয় না। কারণ সে তার মায়ের সাথে একাত্ম থাকে। গর্ভাবস্থায় এবং গর্ভের পরে মায়ের সাথে তার যতক্ষণ পর্যন্ত শারীরিক নৈকট্য থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত এ ক্রাইসিসের মোকাবেলা করে না। যখনই সে বড় হয়ে উঠতে থাকে, যখনই তাকে মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, তখনই তার অ্যাঙ্গুইশ এবং একাকিত্বের জন্ম হয়।

মানুষের কারো দৈহিক নৈকট্য একটি ডিজায়ার হয়ে আসে। মানুষের সাথে মানুষের ‘ইউনিয়ন’ অনুভুতি আসলে ঐ বিচ্ছিন্নতা এবং অ্যাঙ্গুইশকে জয় করার নিড থেকেই। মানুষের ভেতর এই যে গোত্র অনুভূতি, সেটিও কিন্তু ঐ একাকিত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা অ্যাঙ্গুইশ থেকে এসেছে। মানুষ নিজেকে একটি গ্রুপে মিশিয়ে নিজের বিচ্ছিন্নতাকে জয় করতে চেয়েছে। মানুষের মানুষ বা গোত্রের সাথে ‘নৈকট্য’ অনুভব এভাবেই ডেভেলপ করেছে। সেই প্রিমিটিভ সমাজেও আমরা দেখি এ আচরণ। মানুষ কিভাবে একই ধরনের পোশাক পড়া অভ্যেস করলো। একই ধরনের ব্যবহার করা শুরু করলো। একই ধরনের খাবার খাওয়া শুরু করলো।

একে অপরের ভেতর একটি সাদৃশ্য তৈরি করার নিডও এসেছে নিজেদেরই বিচ্ছিন্নতাকে জয় করার জন্য। আর কিছু নয়। একটু চোখ মেললেই দেখা যাবে এ মডার্ন মানুষদের ভেতরও একই আচরণ। একই ধরনের ক্লাব বানায়। একই ধরনের মুভি দেখে। একই ধরনের বই পড়ে। প্যারাডক্স, মানুষ অবচেতনে তবু জানে সে গোষ্ঠী নয় সে সেলফ। সে আলাদা। ডিফারেন্ট। এ জানাই তার অ্যাঙ্গুইশের জন্ম। সে যে ‘ইন্ডিভিজুয়াল’ এ অনুভবই তার বিচ্ছিন্নতার একাকীত্ব ও অ্যাঙ্গুইশের কারন। শিল্পায়নের পর মানুষের এ বোধ বেশি দেখা যায়। ‘তারা’ থেকে ‘সে’ হবার প্রসেস হিসেবে দেখা যায় কোম্পানির মনোগ্রাম। দরোজায় নিজের নামের নেইমপ্লেট। শিল্পায়ন তাকে স্ট্যাটাস সচেতন করে। যা তাকে পরবর্তীতে আরও একা করেছে। এ মডার্ন সোসাইটির মডেলকেও একাকিত্ব জয়কে সফল করা সম্ভব হয়নি।

এ আলোচনার মূল বিষয়টি হলো মানুষের মূল টানাপোড়ন তার বিচ্ছিন্নতা অনুভব। বা ‘সেপারেটনেস’। সে ‘আলাদা’। এই ‘আলাদা’ বোধই তার একাকিত্ব। এ পরিক্রমায় তার কারো নৈকট্যে আসার ডিজায়ারই তাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। সে যে ‘আলাদা’, এ বোধ তবু তার একাকিত্বকে, বিচ্ছিন্নতাকে সে জয় করতে পারেনি। প্রিমিটিভ থেকে আধুনিক সমাজ, প্রিমিটিভ থেকে আধুনিক জীবন সবটাই তার বারবার গোত্রে সারেন্ডার বা ইন্ডিভিজুয়াল সত্ত্বা, সবটাই তার বিচ্ছিন্নতাকেই প্রকট করেছে।

মানুষ ভীতি এবং অ্যাঙ্গুইশকে না জেনে নিয়ন্ত্রণ না করে ভালবাসাকে পজেজ করতে সক্ষম নয়, আমার এ ছোট্ট নিবন্ধে আমি সে কথাটিকে পরিষ্কার করতে উপরের আলোচনার অবতারণা করেছি। ভালবাসা ইন্টিগ্রিটি এবং স্বকীয়তার এক মিলন। এ দুটো বিষয়কে ছাড়া ভালবাসা জানা অসম্ভব। এ ভালবাসাই শক্তি। একমাত্র এ শক্তিই মানুষের বিচ্ছিন্নতার আয়াঙ্গুইশ দূর করে। মানুষের ভেতর যে ভীতির এবং একাকিত্বের দেওয়াল থাকে তাকে ভেঙে ফেলতে পারে যখন সে ‘সেপারেটনেস’কে ভাঙতে পারে। ‘সেপারেটনেস’ আর স্বকীয়তা এক নয়। ‘সেপারেটনেস’ অ্যাঙ্গুইশ। স্বকীয়তা তার ইন্টিগ্রিটি। ইন্টিগ্রিটি, স্বকীয়তা ভালবাসাকে ভয়মুক্ত করে তাদের একত্রিত করে। একজন মানুষকে করে দুই, দুজন মানুষকে করে একজন।

ভালবাসাকে অসফল করে বাধ্যতার অনুভব। এটি একটি স্বেচ্ছা মোটিভেটেড অ্যাক্ট। স্বাধীন অ্যাক্ট।

আর ভালবাসা হলো স্বাধীনতার সন্তান।

শেয়ার করুন:
  • 332
  •  
  •  
  •  
  •  
    332
    Shares

লেখাটি ১,৯৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.