মেয়ে, তুমি এগিয়ে যাও, সিদ্ধান্ত নিতে শেখো

0

পুষ্পিতা মন্ডল:

আজ সকালে একটা মেসেজ পেলাম। একটা মেয়ে লিখেছে। মেসেঞ্জারে নক দিয়েছে। কিছুদিন হলো সে এই দেশে এসেছে। হাজবেন্ড আর তার ফ্যামিলি এখানে থাকে। মেয়েটা নতুন। আমাকে খালি বললো, দিদি একটু হেল্প করেন। একটা কাজ খুঁজে দেন। এরা আমাকে কাজ করতে দিবে না। আর এভাবে থাকলে আমি মরে যাবো। বাঁচতে পারবো না।

তার আসলে কী সমস্যা, তা আমি জিজ্ঞেস করিনি। ধরে নিয়েছি সমস্যা আছে। তা না হলে সে অপরিচিত আমাকে নক দিয়ে এই কথা বলতো না। শুধুমাত্র কাজ না করতে পেরে কেউ মরে যায় না। তার সাথে যা বলার দরকার, আমি বলেছি। কিন্তু এই কথাগুলো লিখছি অন্য কারণে।

এখানে আসার পর এমন কয়েকটা মেয়ের বিচিত্র সমস্যা আমি দেখেছি। মেয়েদের সমস্যা সব জায়গায়। কিন্তু বিদেশে হঠাৎ এসে অসহায় টাইপের একটা অবস্থা হয়। তখন মেয়েটার মানসিক জোর যদি ভালো না থাকে, বা যার কাছে এসেছে সেখানে যদি কোনো সমস্যা দেখে, তবে ওই মেয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়। যদি সে সাহস করে বের হতে পারে তো হলো, নাহলে আমার পাশের ফ্ল্যাটের মহিলার মতো রোজ মার খাবে, আর কাজ খুঁজে বের হয়ে যেতে চাইবে, কিন্তু পারবে না। ওই ভাবী যখনই আমাকে দেখে, বলে আপু একটা কাজের খোঁজ দেন। আর পারছি না। আবার বাসায় গিয়ে সব ভুলেও যান। আবার মার খান।

মেয়েটার সাথে কথা হলে আমার নিজের কথা মনে পড়লো। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিলাম। মাকে বলেছিলাম, আমি এখন শুধু আমার কথা ভাববো, আর কিছু না। তা তুমি যাই বলো, লাভ নেই। কাউকেই চিনতাম না। হাতের মোবাইল ভরসা ছিলো। গুগল করে এখানে-ওখানে যেতাম। লতায় পাতায় একজনকে নক দেই বাসার জন্য। হাতে টাকা নেই, জব নেই, নতুন একটা দেশ। একটা পরিচিত লোক নেই। আমি নতুন একটা ফ্যামিলির সাথে সাবলেটে উঠে যাই। ঘুমানোর জায়গা ছিলো তাদের ড্রয়িং রুমের খাটে। আলাদা রুম নেয়ার মতো সামর্থ ছিলো না।

প্রথম একটা মাস আমি ভুলবো না। কী করে দিন গেছে জব পাওয়ার আগ পর্যন্ত। কিন্তু তবু ভালো লাগতো। বুক ভরে নি:শ্বাস নিতাম। এখন সেসব দিন চলে গেছে। সারাদিনের কাজ শেষে যখন হেডফোনে গান শুনতে শুনতে বাসায় ফিরি বা অনেক রাতে মন চাইলেই আইসক্রিম খেতে বাইরে বের হই, বা নিজের মতো নিজে থাকি, তখন জীবনটাকে সুন্দর লাগে। সবচে বড়কথা আমার জীবন আমার শর্তে চলছে, এই ভাবনাটা স্বস্তি দেয়।

আমার যে সুবিধা ছিলো, সেটা হলো, আমি কখনওই অন্য কারও উপর নির্ভরশীল না। ছোটবেলায় বাবা মারা যেয়ে হয়তো এমন হয়েছে। আমি শুধুমাত্র মেয়ে বলে এটা বা ওটা করা যাবে না, এমন ফালতু ইমোশন আমার কখনও ছিলো না। কিন্তু আমি জানি কোনো সিদ্ধান্তে আসা সহজ না। মেয়েরা ভয়ও পায়। আজন্ম সংস্কার থাকে। পরিবারের লোক কী ভাবছে, এসব ভেবে নিজের ইচ্ছার গলা টিপে দেয়। ভীষণ সুন্দর ক্যারিয়ারের মেয়ে জব ছেড়ে দেয়। কেউ কেউ অসহনীয় একটা সংসার নিয়ে বেঁচে থাকে।

এসব ক্ষেত্রে আমার একটাই কথা। মেয়ে তুমি কী চাও? সমস্যা যাই হোক, তার কি সমাধান তুমি চাও? তুমি তোমার জীবন কীভাবে সাজাতে চাও? সিদ্ধান্ত তোমাকে নিতে হবে। যা হয়েছে, সেটা নিয়ে আফসোস করবে, নাকি সমাধানে যাবে? তুমি জব করতে চাও নাকি বাসায় বসে থাকতে চাও! মার খেতে চাও, নাকি সম্মান চাও?

আর বিদেশে হলে তো সব ধরনের সহায়তাই পাওয়া যায়। এখানকার আইন তোমাকে সব সাপোর্ট দিবে। তাই তোমার জীবন সিদ্ধান্ত তোমার। অন্য কারো তা সে যেই হোক তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে দেবার অধিকার নাই। অন্যের সিদ্ধান্তে জীবন চালিয়ে আফসোস করার চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তে পস্তানো ভালো। তোমার জীবন, তোমার হাসি, তোমার হাতে থাকুক। অন্য কোথাও না।

এগিয়ে যাও …. নিজের জীবন নিজের মতো সাজাও। সুন্দর দিন সামনেই অপেক্ষা করছে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 542
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    542
    Shares

লেখাটি ৮১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.