সম্পর্কের স্থায়িত্ব যখন তেজপাতার নিচে

0

শিল্পী জলি:

আমেরিকার তেজপাতা/বে লিফ দেখলে কান্না পায়। তাই ২০০৭ এ যখন দেশে গেলাম, ফরিদপুর বাজারে গিয়ে বললাম, ভাই ভালো দেখে তেজপাতা দিন আমেরিকায় নিয়ে যাবো। দোকানদার বললেন, আপা দু’দিন পরে আসেন ভালো তেজপাতা এনে রাখবো। ব্যস এক কেজি তেজপাতার দু’টি বোঝা বানিয়ে নিয়ে এলাম সাথে। এখনও সেই তেজপাতার একটি বোঝা রয়ে গিয়েছে ঘরে, খানাপিনায় দাপটের সাথে গন্ধ ছড়াচ্ছে।

মাঝে মাঝেই ঐ তেজপাতা দেখি, আর মনে মনে ভাবি, মানুষের জীবনে তেজপাতার স্হায়িত্বের ভরসা থাকলেও সম্পর্কের কোনো ভরসা নেই। কোনো কোনো সম্পর্ক বছর না পেরুতেই ভেঙে যায়, আবার কোনটি হয়তো পনের-বিশ বছর পর। যখন হয়তো মেয়েটি মনে করে জীবনে আর শঙ্কার কিছু নেই– ছেলেপেলে বড় হয়ে গিয়েছে, জীবন ভাটিতে, এখন শরীরে জং ধরলেও মিনসে আমারই থাকবে। তখনই হয়তো বজ্রপাত ঘটে। আবার নিজেকে নতুন করে কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন না থাকে অভিজ্ঞতা, না থাকে সাহস, না থাকে জীবন গড়ার উদ্যম। তবুও ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় জীবন সংগ্রামে। তদুপরি যুক্ত হয় মানসিক পীড়ন কেন, কখন, কীভাবে এমন হলো? কে দায়ী?

বিয়ের শুরুতেই বাঙালী রমণী ঢেলে দেয় ভালোবাসা। অনেকেই ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতেও কুন্ঠিত হয় না। অতঃপর বিসর্জনে বিসর্জনে জীবনের সময় অতিবাহিত হতে থাকে। স্বামীর জীবনে অতি পতিপরায়ণ বৌ পেয়ে মানসিক, আবেগিক, শারীরিক, এবং জৈবিক উদ্দীপনায় ঘাটতি দেখা দেয়, ফলে একঘেয়েমি অনুভূত হতে সময় লাগে না, আর তখনই হয়তো শুরু হয় যত বিপত্তি। ন্যায্য মূল্যের বউ থেকে মন সরে গিয়ে মনে ধরে বাইরে ছড়ানো ছিটানো রঙ আর সেই রঙে রাঙা হতে বরের রঙঢঙ বাড়ে।
বউ ভাবে কী হলো, কী হলো তার? ঢেলে দেয় আরও প্রেম। কাজ হয় না। মানুষের নিজস্বতা বিসর্জন দেয়ার মাঝে কোন অর্জন নেই, বরং ক্ষতিই ক্ষতি।
সম্প্রতি অপু বিশ্বাস বললেন, যেখানে আমার আট বছর সংসার করার মতো সৌভাগ্য হয়েছে, সেখানে কেন আমার ডিভোর্স হবে?

কেমন সংসার ছিল তার?

বিবাহিত জীবনের আট বছরে লোক সমাজে বর তাকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়নি। এমনকি সন্তান হবার পরও সম্পর্কটিকে প্রকাশ করতে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। তাও বাংলাদেশী সমাজের মতো একটি সমাজে বসবাস করে যেখানে পেট ফুলতেই বাচ্চার বাবার নামটি মুখস্ত রাখতে হয়। যদিও আমাদের দেশে আজও নায়কদের বিয়েতে ক্যারিয়ার খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এমনকি কেউ কেউ শুরুতেই হয়তো বিয়ে করে, যেমন সালমান শাহ। তথাপি শাকিব খান তার বিয়ের কথা প্রকাশ করতে চায়নি বাচ্চা হবার পরও। বউ-বাচ্চা রসাতলে গেলেও তার কিছু যেতো আসতো না।

এখন শাকিবের উকিল বলেছেন, অপু বিশ্বাস ইসলাম মানতো না এবং কাজের মেয়ের কাছে বাচ্চা রেখে কলকাতা গিয়েছে, অতএব ডিভোর্স দেয়া জায়েজ। যদিও শাকিব মিঞা নিজেই সিনেমায় বেগানা নারীর সাথে নেচে-গেয়ে আয়-রোজগার করে জীবন নির্বাহ করে-এটা কতটা ইসলামিক? নাকি সে পুরুষ বলে তার ইসলাম মানা জরুরি নয়? আর প্রয়োজনে কাজের লোকের কাছে বাচ্চা রাখলেও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না, যদি বাচ্চাটির নিরাপদে থাকার নিশ্চয়তা থাকে, যদি সেই ব্যক্তির উপর ভরসা করা যায়।

প্রেমের খাতিরে অপু বিশ্বাস ধর্ম ত্যাগ করেছেন, নিজের ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধা থেকে নয়। সচরাচর এ জাতীয় বিয়েতে দেখা যায় দু’জনার বিয়ে হলেও যার যার ধর্ম তার তার পালনের স্বাধীনতা থাকে, মূলত প্রেমের খাতিরেই। অন্তত নিজেরা কেউ কাউকে ধর্ম নিয়ে চাপাচাপি করে না, কেননা ওটা প্রেমেরই অসন্মান।

যদিও লেডি ডায়নাও জীবনে ডিভোর্সের মুখ দেখেছেন, কিন্তু আমাদের দেশের অনেকেই ডিভোর্সের ভার সইতে পারে না। ডিভোর্স হলে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে ধরেও বিয়েকে ফেরত পেতে পাঁয়তারা করেন। যদিও অমন বিয়ে ফেরত পেলেও তেমন কোনো লাভ নেই, বরং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি, শারীরিক, মানসিক, আবেগিক, সামাজিক সব রকমেরই। যেই বিয়ে ছুটে যাবে, তাকে ছুটে যেতে দেয়াই ভালো। তবে কখনও কখনও হয়তো নিশ্চিত হওয়া জরুরি যে আসলেই কেউ ছুটতে চায় কী না? অনেক ছেলের ক্ষেত্রেই দেখা যায় ডিভোর্স দিয়েই সে বউয়ের পেছনে উন্মাদের মতো দৌঁড়ায়। অথচ সেই ডিভোর্স দিতে নেচেছিল। ডিভোর্সের আগে হয়তো তার কখনও সুযোগই ঘটেনি বউকে মিস করার। বউয়ের অতি ভালোবাসা তাকে হয়তো জীবনে অদরকারি বোঝা হিসেবে পরিণত করেছে।

স্ত্রী’রা যদি অতি ভালোবাসা না দেখিয়ে নিজেরও একটি জগৎ সৃষ্টি করে, বরের ভালোবাসার সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের ভালোবাসা সরবরাহ করে, নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম রাখে, ভবিষ্যতে একা হবে সেই ভয়ে অস্হির না হয়, জীবনকে সহজভাবে নিতে শেখে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে ভীত না হয়, তাহলে সহসা ডিভোর্সেরও প্রশ্ন আসে না জীবনে। আবার এলেও তারা হ্যান্ডেল করতে পারে– বর মারা গেলে যদি মানুষ বাঁচে, তাহলে কেন ডিভোর্স হলে নয়? বর ডিভোর্স দিলে বরেরও তো সেই ডিভোর্সই হলো–ঐ ব্যক্তি থেকে আলাদা জীবন, আলাদা থাকা! সে যদি আলাদা থাকতে পারে, আলাদা থাকতে চায়, তাহলে কেন আরেকজন পারবে না? অথবা থাকতে দেবে না? বিবাহিত জীবনে মেয়েদের যে পরিমাণ অবদান থাকে, তার মূল্যও কী কম? তবে ডিভোর্সের আগে হয়তো সময় নেয়া জরুরি, সেপারেশনে থাকা জরুরি, যেন নিশ্চিত হওয়া যায় আসলেই কেউ ডিভোর্স চায় কী-না?
আদৌও ডিভোর্সের প্রয়োজনীয়তা আছে কী-না?

এমনও বিয়ে দেখেছি যেখানে স্বামী-স্ত্রী বছরের পর বছর দিনে দুমিনিটও কথা বলতো না, কথা বললেই ঝগড়া হতো তাদের, সেকেন্ডে সেকেন্ডে মার চলতো, মার ঠেকাতে পুলিশ ডাকতে হতো, বছরের পর বছর ঘুমাতো আলাদা বিছানায়, বাচ্চাও নেই, ভালোও বাসতো না, তারা একজন আরেকজনকে তথাপি ডিভোর্স হতেই ঐ বউকেই আবার বিয়ে করতে চেয়েছে উক্ত বর, কেন?

দ্বৈত জীবনে অবিরত অলিখিত আদানপ্রদান থাকে, ত্যাগ থাকে, উৎসাহ, উদ্দীপনা, ভালোমন্দ সময়, সঙ্গ, স্বপ্ন, পথ চলার নির্দেশনা, সাহস, একজন আরেকজনকে গড়ে তোলার অস্বীকৃত অবদান, রকমারি স্মৃতি যা ডিভোর্সের পরে হয়তো অনুভূতিকে হানা দেয়, উপলব্দিতে আসে আজ কী হারালাম যা একদিন আমারই ছিল, আমারই হয়তো থাকতো যদি না…।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিভোর্সের সময়টিতে মেয়েরা বেশ গাঁইগুঁই করলেও ডিভোর্সের পর তারা সামনে হাঁটে আর ছেলেরা পস্তায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 664
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    664
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.