একজন সিঙ্গেল মা এর একটি দিন

0

আমেনা বেগম ছোটন:

লিভারপুল হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে বসে আছে রুনি। সংগে তিন বছরের ছেলে ফরহাদ। ফরহাদ অবশ্য বসে থাকতে চাইছে না। সারা রুম ছোটাছুটি করছে। আশেপাশে আরো অসুস্থ রোগি, তারা বিরক্তি নিয়ে তাকাচ্ছে। এক মাতাল চেঁচিয়ে উঠেছে, ওয়াচ ইউর ফা*** কিড। পুলিশ তাকে বসিয়ে দিয়েছে।

ফরহাদ আবার দরজার দিকে দৌড় দিল। অটো সেন্সর ডোর, কাছে গেলে খুলে যায়। বাইরেই রাস্তা। রুনি উঠে দৌড়ে ফরহাদকে ধরে আনে। ফরহাদ আরো জোরে চিৎকার শুরু করে। রুনির ইচ্ছে হলো, ফরহাদকে শক্ত করে একটা আছাড় দিতে, তারপর যদি সে থামে, বিদেশ বলে পাবলিক প্লেসে বাচ্চাদের মার দেয়া যায় না। ফরহাদকে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল সে, সেখানে গিয়ে এক চিমটি দিয়ে ভয়ংকর চেহারাযুক্ত করে বললো, চুপ, আর একটা সাউন্ড করলে জান শেষ করে ফেলবো। ফরহাদ তারপরও চেঁচানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, এখন রাত বারটা, বাইরে তুষারপাত হচ্ছে এসময় তার ডিনার শেষে নরমগরম বিছানায় শুয়ে থাকার কথা। রুটিন পালটে যাওয়ায় তার মেজাজমর্জিও পালটে গেছে।

রুনির ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। হিংস্র ভংগিতে ফরহাদের চুল মুঠি করে ধরলো, বললো, চুপ চুপ। ফরহাদ এবার ভয় পেয়ে আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে। রুনি ক্লান্ত ভঙ্গিতে ফরহাদকে কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে, ইটস ওকে বাবা, ইটস ওকে। উই উইল গো হোম। ফরহাদ রুনির গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। মা, আই এম হাংরি। গেট মি সামথিং টু ইট। ক্যান আই হ্যাভ এ স্নিকার?

ভেন্ডিং মেশিনে একটা স্নিকারের দাম সাড়ে তিন ডলার। রুনির জন্য এটাই দুর্মুল্য। সে ঘন্টায় ১০ ডলার কাজ করে। বাচ্চা নিয়ে বেশিক্ষণ পারেও না। সপ্তাহে সর্বসাকুল্য ১২-১৫ ঘন্টা। এই টাকায় হুটহাট স্নিকার কিনে ফেলা যায় না। দিনে হ্যাপি আওয়ারে ৫ ডলারে একজনের পেট ভরার মতো খাওয়া জুটে যায়।

একবছর আগে, এমন পরিস্থিতির কথা গল্প উপন্যাসে পড়লেও হয়তো কেঁদে ফেলতো। এখন আর সে কাঁদে না, শক্তমুখে বলে আমরা বাড়ি গিয়ে খাবো। ফরহাদ আবার চেঁচাবার উপক্রম করে, রুনি এবার স্নিকার কিনে ফেলে, আরো এক ঘণ্টা কাজ করে নেবে এই সপ্তাহ। ফরহাদ আপাতত শান্ত হয়।

রিসেপশনের দিকে এগুল রুনি। রিসেপশনিস্ট ব্যস্ত, ব্যাজে নাম লেখা নিকোল। ক্রিসমাস সিজন, রেগুলার দেশবাসীর সাথে আরো হাজারখানেক টুরিস্ট যোগাড় হয়েছে। কতজন এসে হাবার মতো বলছে, নো ইংলিশ, স্প্যানিশ ইন্টারপ্রেটার, প্লিজ।

রুনির দিকে বিরক্তি চেপে তাকালো নিকোল। এই ধরনের শেল্টারে থাকা মহিলা রোগিগুলি ঝামেলা আরো বাড়ায়। সত্যিকারের কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও নানারকম উপসর্গ নিয়ে এম্বুলেন্স চড়ে ইমারজেন্সিতে হাজির হবে। গাদাখানেক টেস্ট করার পর দেখা যাবে সব মানসিক। অতঃপর সাইকিয়াট্রিস্টের রেফারেল দিয়ে বাড়ি পাঠাও। ঘাড়ে ধরে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে ইচ্ছা করছে।

— এক্সকিউজ মি, প্লিজ। হাউ লং ইট উইল টেক টু সি দ্য ডক্টর?

— নট কোয়াইট সার্টেন, ম্যাম। মে বি আওয়ার অর টু, কুড বি থ্রি ইভেন।

— লুক, আই হ্যাভ এ কিড উইথ মি। হি ইজ হাংরি এন্ড স্লিপি, আই ক্যান নট সেটল হিম। হি ইজ ডিস্টার্বিং আদার পেশেন্ট।

নিকোল একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে, তোমাকে তো কেউ দাওয়াত করে আনেনি সোনা। মুখে এক ধরনের কাঠিন্য মিশ্রিত মাপা পেশাদার হাসি মিশিয়ে বলে, আই ক্যান আন্ডার স্ট্যান্ড ইউর সিচুয়েশন, ম্যাম। বাট ইউ শুড নো, দিস ইজ ইমারজেন্সি। দেয়ার আর লট অফ আদার সিরিয়াস পেশেন্ট। নোবডি ইজ সিটিং আইডল হিয়ার। ইউ নিড টু হ্যাভ পেশেন্স।

ফরহাদ এবার টেবিলে রাখা ম্যাগাজিনের পাতা ছিঁড়তে শুরু করেছে। রুনি নিকোলের দিকে তাকিয়ে বললো, মে আই গো হোম নাউ? দেন সি দ্য ডক্টর সামটাইম লেটার অন।

— আপ টু ইউ। বাট ইউ নিড টু সাইন অন পেপার, বিফোর ইউ লিভ, দ্যাট ইউ আর লিভিং উইথ ইউর অন। ডক্টরস অর হস্পিটাল উইল নট হ্যাভ এনি রেস্পন্সিবিলিটি ইফ এনিথিং হ্যাপেন টু ইউ।

— ওকে, গিভ মি দ্য পেপার, প্লিজ।

সাইন করে ভাবতে বসলো বাড়ি ফিরবে কী করে! ট্যাক্সি ছাড়া উপায় নেই। হন্তদন্ত হয়ে আরেকটা পরিবার ঢুকলো। সাউথ ইন্ডিয়ান মনে হয়। লোকটা তার ওয়াইফ কে কিচিরমিচির করে কী যেন বললো, সম্ভবত গাড়ি পার্ক করে আসতে যাচ্ছে। মহিলা মাথা নাড়লো।

ট্যাক্সি কল করে অপেক্ষা করতে লাগলো রুনি। ফরহাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। রুনি আর তার ছেলে দুজনেই ছোটখাটো, তবু তাকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁফ ধরে যাচ্ছে রুনির। বিদেশ এলে বাংলাদেশি মেয়েরা ডায়েট করে কুল পায় না মোটা হচ্ছে বলে। সে জায়গায় কৃচ্ছসাধন করতে গিয়ে সে আর তার ছেলে বেশ স্লিম।

ট্যাক্সি আসার সাথে সাথে সেই সাউথ ইন্ডিয়ান লোকও চলে এসেছে। এসেই বউ ছেলেমেয়ের কাছে ছুটে গেছে। বাচ্চা পাপা পাপা বলে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পরলো। ট্যাক্সিতে বসে শেল্টার হোমের ঠিকানা বললো রুনি। উদ্বিগ্ন চোখে মিটারের দিকে তাকিয়ে আছে সে। আড়াই ডলার – তিন- সাড়ে তিন; গন্তব্যে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সাড়ে ১২ ডলার।

পনের ডলার দেবার পর, ট্যাক্সিওয়ালা ২ ডলার ফেরত দিল। ৫০ সেন্ট সে নিজের টিপস মনে করে রেখে দিচ্ছে। রুনি কঠিন গলায় বললো, আই ও ইউ ৫০ সেন্ট। টাক্সিওয়ালা গোমড়ামুখে ৫০ সেন্ট ফেরত দিয়ে টায়ারে শব্দ করে চলে গেল।

ঘুমন্ত ফরহাদ, হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি ভাংতে শুরু করলো সে। তিন তলায় তার ঘর। এ সময়টায় তার মাঝে মধ্যে তাহেরের কথা মনে পরে। তাহের ফরহাদকে কোলে নিতো সিঁড়ি ভাংবার সময়। দোতলায় উঠে বড় করে শ্বাস নিল রুনি। আর এক তলা, তারপর।

ঘরে ফিরে আস্তে ফরহাদকে শুইয়ে দিল। ছেলেটা ঘুমের মাঝে ছটফট করছে। খিদে লেগেছে মনে হয়। আস্তে উঠে দুধ বানালো রুনি। ফিডার ফরহাদের মুখে দিয়ে কাপড় ছেড়ে ছেলের পাশে শুয়ে পড়লো সে। সারাদিনের ধকলে প্রচণ্ড ক্লান্ত সে, তবু ঘুম আসছে না। এক সময় সে বেশ শুয়েই ঘুমিয়ে পড়তে পারতো। এক ঘুমে রাত কাবার, সে সময়টা সে একজন অতি সৌভাগ্যবতী মানুষ ছিল, একথা তখন বুঝতে পারেনি। তার আপাত স্থায়ী অবস্থা যথেষ্ট করুণ, এর উপর ও প্রতিদিন নিত্যনতুন ঝামেলা লেগেই থাকে। যেন ঝামেলার কিছু খামতি হচ্ছিল তার, তার উপরি কিছু ঝামেলা চাই। আজ গেল পুলিশ, এম্বুলেন্স, হাসপাতাল।

গত সপ্তাহে যে ক্যাশের হাউজকিপিং, কুকিং জবটা করতো, সেটা ছেড়ে এসেছে। কেননা সে ওভেনে একটা মুরগি গ্রিল করতে দিয়ে তার এমপ্লয়ার বা বাংলাভাষায় বাড়িওয়ালাকে এক ঘন্টা পর নামাতে বলে চলে এসছিল। পরে তারা ফোন করে শাসিয়েছে, রাত আটটায় ফায়ার এলার্ম বাজার পর তাদের খেয়াল হয়েছে গ্রিলের ভেতর দুপুর বেলায় মুরগি দেয়া হয়েছিল।

আজ সকালে তার হাউজমেট এক ড্রাগ এডিক্ট সাইকো মহিলা ফরহাদের প্রাম তিন তলা থেকে ফেলে দিয়ে ভেংগে ফেলেছে। রুনি নাকি তার প্রাম ঠিকমতো না রাখায় তার প্রাম এর সাথে ধাক্কা খেয়ে ভেংগে গেছে, এখন রুনির ২০০ ডলার দিতে হবে তার ভর্তুকি বাবদ। ১০ টাকা ইনকাম করতে যেখানে হাড় কালো হয়ে যায়, সেখানে ২০০ ডলার মুফতে উড়িয়ে দেবার মতো অবস্থা রুনির নেই। সে আবহমান বাংলার মেনে নাও, মানিয়ে নাও সংস্কৃতির মানুষ। আড়ে দীঘে দেড়গুণ বিদেশি ড্রাগ এডিক্ট মহিলার সাথে ঝগড়ায় জিতে যাবার তরিকা তার জানা নেই। জীবনে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখতে হবে এ তার কল্পনায় ছিল না কোনদিন। ওই মহিলা মারমুখী হয়ে তাকে মারতে আসলে সে ভয়ে দরজা আটকে পুলিশে কল দিয়েছে। ভাগ্য ভালো পুলিশ এসেছে, কিন্তু তার শুরু হয়ে গেছে প্যানিক এটাক।

প্যানিক এটাক শুনতে যত সাধারণ, আসলে ততখানিই ভয়ংকর। অন্ততপক্ষে রুনির জন্যে। তার মনে হতে থাকে, সে মারা যাচ্ছে। তার হাত পা, ভয়াবহভাবে কাঁপতে শুরু করে, হৃৎপিণ্ড মনে হয় লাফিয়ে বের হয়ে যাবে এরপর, পেটের নাড়িভুঁড়ি সব গুলিয়ে উঠে। তারপর শুরু হয় খিঁচুনি, হাত পায়ের আংগুল বাঁকা হয়ে শক্ত হয়ে যেতে থাকে। পুরো দৃশ্যটা এতখানি আতংকজনক, ফরহাদ ভয়ে চিৎকার শুরু করে। বিষয়টার উৎপত্তি মানসিক হলেও একে নিয়ন্ত্রণের কোন উপায় রুনির জানা নেই। একটাই উপায়, আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করলে আস্তে আস্তে খিঁচুনি কমে আসে।

আজ যে পুলিশ এসেছিল, সে এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে এম্বুলেন্স কল করেছে। সে যেতে রাজি হচ্ছিল না, এদেশের হাসপাতাল ইমার্জেন্সি বিভাগ অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর কিছু না। প্যারামেডিক বললো, তোমার হার্টবিট ১৩০ এর উপরে, ডাক্তার দিয়ে চেক করিয়ে নাও, যে আসলেই কোন সমস্যা হয়নি। আমরা এম্বুলেন্স এ তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। রুনি ভেবেছিল, এম্বুলেন্স এ আসা রোগি হয়তো প্রায়োরিটি পাবে, কিন্তু তারা ইসিজি করে শেল্টারের পেশেন্ট শুনেই তাকে লাস্ট প্রায়োরিটি হিসেবে রেখেছে।

এতো ঝামেলার পর পুলিশ কাল ওই মহিলাকে অন্য শেল্টারে সরিয়ে নেবে বলেছে, রুনি এতেই শুকরিয়া আদায় করেছে।

অধিকাংশ রাতের মতো আজও রুনি নির্ঘুম। জোর করে ঘুমাতে চেয়েও পারছে না, কাল সারাটা দিন মাথা ঝিমঝিম করবে, গা গুলাবে। না চাইতেও, সেই একই ভাবনা আবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহেরের ঘর ছেড়ে এসে কি সে কোন ভুল করেছে? তার কি আরো ধৈর্য ধরে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা উচিৎ ছিল?

তাহেরের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা সে কোনদিনই বুঝতে পারেনি। লোকটা পাগল না বদমাশ, কে জানে? রুনির বেশ নির্ঝঞ্ঝাট একটা জীবন ছিল। সে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, গ্রাজুয়েশন এর পর সে একটা ডিজাইন এবং মার্চেন্ডাইজ কোম্পানিতে ৪০ হাজার টাকা বেতনের এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে জব করতো। তখনই তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে তাহেরের সাথে পরিচয় হয়। দুজনে প্রাপ্তবয়স্ক, শিক্ষিত, উন্নত রুচির — তাহেরই বিয়ের প্রস্তাব দেয়। শুভক্ষণে বিয়ে হয়ে সে বিদেশযাত্রা করে।

বিদেশে এসে তাহেরের অবস্থা দেখে সে অবাক। বাসাভর্তি পর্নোগ্রাফিক সিডি, ম্যাগাজিন। এমনকি নানাবিধ এডাল্ট শপ আইটেম। এই বাসায় যে অন্যান্য মহিলার আনাগোনা চলে তা বুঝতে দেরি হয়নি রুনির। সবচেয়ে অবাক হয়, তাহের এসব লুকানোর চেষ্টা কেন করেনি।

পৃথিবীর আর সব বিবাহিত মেয়েদের মতো রুনিও একই ভুলের পথে পা বাড়ায়, দেখি স্বামীর মতি পরিবর্তন হয় কিনা। রুনি অবশ্য স্বাবলম্বী হবার চেষ্টায় জব নিয়েছিল। টুকটাক ঝগড়াঝাঁটি হয়, সে ভেবেছে এমন সবার হয়। তার বাস্তবজ্ঞানে কাউকে দেখেনি, স্বামী মেরেধরে তাড়াবার আগে বউ সরে আসার চিন্তা করছে।

এক সময় সে প্রেগন্যান্ট হয়। ভালই, মেয়েদের সার্থকতাই মা হওয়াতে (সবাই তাই বলে) কিন্তু এবার তাহের একেবারে পেয়ে বসেছে। হাসপাতাল, ডাক্তার, ঘরবাড়ি, চাকরি সব রুনির একার দায়িত্ব। একদিন রেগে চেঁচামেচি করাতেই গলা চেপে ধরলো রুনির, একদম চুপ। আমার ঘর করতে হলে আমার কথায় চলতে হবে।

রুনি আর তাহের পাল্টাতে থাকে, সেই শিক্ষিত, নম্র ভদ্র রুনি আজকাল কেমন বদমেজাজি হয়ে গেছে। ইদানিং তাহের হাত তুলতে আসলে সেও হাতাহাতি শুরু করে, চিৎকার করে গালিগালাজ করে। আরেকদিন তাহেরের ঘুষিতে বুকের কাছটায় কালশিটে পরে যায় রুনির। ডাক্তার দেখে নিজেই রিপোর্ট করে পুলিশে। পুলিশ আসার পর তাহের কিছু মোবাইল ভিডিও ক্লিপ দেখায়। রুনির চেঁচামেচির, রুনির হাতাহাতির। রুনিই নাকি তাকে মেরে ফেলতে পারে। তার ডায়াবেটিস, রুনি তাকে ইনসুলিন দিয়ে মারবে। একবার অসুস্থ হয়ে ঘরে বসে রইলো, খুব খারাপ অবস্থায় হাসপাতাল গিয়ে বললো, রুনি নাকি তার ইনসুলিন লুকিয়ে তাকে মারার ব্যবস্থা করেছে। রুনি পরকীয়া করছে, রুনি ঘরের টাকা সরিয়ে দেশে পাঠাচ্ছে, কত কী অভিযোগ!

তাহেরের সাথে আর ঘর করার সাহস হয় না রুনির। ভয় লাগে, মাঝেমধ্যেই সে দুঃস্বপ্ন দেখে তাহের তাকে মেরে ফেলছে, ফরহাদকে মেরে রুনির নামে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। পুলিশকে বলে এখন সে শেল্টারে। ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায়। এক তাহেরের বদলে নিত্যনতুন উপদ্রব এসে হাজির হয়। ভিসা আছে আর দুই মাস, এরপর কী হবে কে জানে! সোশ্যাল ওয়ার্কার বলেছে, তারা দেখছে। কী দেখছে, তারাই জানে।

রুনিকে সবাই বলে দেশে যাও। রুনি চুপ করে থাকে। দেশে স্বামী পরিত্যক্তার অবস্থা সে জানে। তার নিজেরই ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর ননদ ডিভোর্সি, বান্ধবী প্রায়ই বলে নিজের সংসার খেয়ে এখন আমার সংসার ভাংতে এসেছে। নাহ, সে দেশে যাবে না। সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। দেখি আল্লাহ আর কত পরীক্ষা বাকি রেখেছেন তার জন্য। নিজেকে মাঝে-মধ্যে সে অবাক হয়ে দেখে, এতো শক্তি সে পেল কই! ফেসবুকে তার বন্ধুবান্ধবকে দেখে, বাচ্চার জন্মদিনের পার্টি, বেবি শাওয়ার। সে গতকাল সকাল-দুপুর না খেয়ে ছিল, না খাওয়ার মতো কিছু ছিল, না ছিল বাজার করার মতো শক্তি। রাতে কোনরকমে দুধ রুটি কিনে দুজন খেয়েছে।

চোখ বন্ধ হয়ে আসে রুনির। হু, কয়েক ঘন্টার জন্য মুক্তি।

(সিংগেল মাদারের একটা দিনের পাতা। এরকম যায় ৩৬৫ দিন অথবা সারাটা জীবন। তবু মানুষ বিরক্ত গলায় বলে, সমাজে ডিভোর্সটা বেড়ে যাচ্ছে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 619
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    619
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.