উপহারের নামে যৌতুক দিয়ে কোন সম্মান কেনা হচ্ছে?

0

রীপা চক্রবর্তী:

দৃশ্যপট এক :

রিজিয়া ও রাজিব (ছদ্মনাম) এর বিয়ে পারিবারিকভাবেই নির্ধারিত হয়েছে, দুজনেই সম্ভ্রান্ত পরিবারের ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। দেনা পাওনা বিষয়ক কোনো কথা ওঠানো হয়নি বিয়েতে, আত্মীয় – পরিজন সবাই খুশি হয়েই অংশগ্রহণ করেছেন ও নব – দম্পতি কে বহুবিধ উপহার সমেত তাদের মঙ্গলময় সুখী দাম্পত্য কামনা করেছেন।

বিয়ের পর রিজিয়া ও রাজিবকে রিজিয়ার পরিবার থেকে উপহার হিসেবে নতুন ফ্ল্যাট, নতুন গাড়ি, এমনকি তাদের ব্যবহার্য সাংসারিক সমস্ত জিনিসপত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়। হবেই বা না কেনো! রিজিয়া যে একমাত্র সন্তান, তাই সন্তানের মঙ্গলার্থে বাবা-মা এর প্রধান কর্তব্যই হলো আদরের কন্যা ও জামাতাকে সম্মান দেয়া, সাথে যথাযথভাবে তাদের সুখ ও সমৃদ্ধির খেয়াল রাখা।
রিজিয়া ও রাজিব দুজনেই শিক্ষিত হয়ে সত্ত্বেও পরিবারের উপরে আজও এভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু তারা সুখেই রয়েছে সার্বিকভাবে।
আধুনিক যুগ ও তার প্রভাবই বটে!

দৃশ্যপট দুই :

সালমা ও শাহীন (ছদ্মনাম) বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই খুব ভালো বন্ধু ও একে অপরকে মন দেয়া-নেয়া শেষে তাদের সম্পর্ককে বিয়েতে রূপান্তরিত করতে আগ্রহী। কিন্তু বিধি বাম, দুজনেরই কচি বয়স কিনা, এখনো শাহীন প্রতিষ্ঠিতও হয়নি ঠিক মতো। উপরন্তু সালমা যে শ্যামবর্ণ.! ‘ছেলেটাকে আমার নিশ্চয়ই পটিয়েছে, আজকাল ছলাকলায় কী না হয় মেয়েদের! নাহলে কেন যাবে আমার অমন হীরার টুকরো ছেলেটা এভাবে রসাতলে?’

কী উপায় তাহলে?

শাহীনের কথায় ‘ভেবে দেখো, আমাদের ভবিষ্যতের ভালোর জন্যেই বলছি , তোমারও তো সম্মান আছে, বাবা-মাকে তুমি এখন খুশি করো, দেখবে পরে তুমি ছাড়া তারা আর কিছুই বুঝবে না, আর আমার তো পাশে দাঁড়াবার মতো কাউকে চাই’।

অগত্যা সালমার পরিবার যৌতুক এর ঘোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও শ্যামবর্ণ মেয়েটা উদ্ধার পাবে, সুখী হবে এই আশায় মোটা অংকের উপহার দিলেন শাহীন ও তার পরিবারকে।
তারা দুজনে সুখী হয়েছে বটে, তবে শান্তিতে কেউ নেই। শ্বশুর বাড়ির উপহার পৌঁছতে একটু বিলম্ব হলেই সালমাকে অকথ্য ভাষা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কিন্তু সংসার এর স্বার্থে হেসে খেলে দিন পার করে দেয়ার অভিনয় সালমা ভালোই রপ্ত করে উঠেছে।

দৃশ্যপট তিন:

রোকেয়া (ছদ্মনাম) দেখতে কালো ও মোটেই ভালো নয়, দিনমজুর পিতা ও গৃহকর্মী মায়ের কন্যা। অল্প বয়স হলেও মেয়ের বিয়ে তো দিতেই হবে, নাহলে কীভাবে উদ্ধার পাবে!
ঘটক মামা খবর দিলো “ভালো ছেলে পাওয়া গেছে, আকাশের চাঁদ পাইলা মিয়া, ছেলে বিদেশে ছিল, এখন নামি কোম্পানির গাড়ি চালায়। গ্রামে বাড়িঘর জায়গা জমি খাসা, আর দেরি কইরো না, এমন সম্বন্ধ আর পাইবা না’।
‘দেনা পাওনা ? … বেশি কিছু না, মেয়েরে সাজায়া দিবা, আর জামাইকে স্বর্ণের আংটি, চেন, একখান মোটর সাইকেল আর নগদ দুই লক্ষ টাকা দিবা। ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, ব্যবসা করবো, মেয়ে তোমার সুখী হইবো’।
গরিব হতদরিদ্র পিতামাতা অনেক চেষ্টায় ধার-কর্জ করেও সব দেনা পাওনা মিটাতে পারলেন না। হাতে পায়ে ধরে কোনোক্রমে বিয়েটা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু একমাসের মধ্যে সব না দিলে মেয়েকে তারা ফেরত পাঠিয়ে দিবেন, এমনটাই বলা হয়েছে।
এক মাস পর মেয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসলো কিন্তু লাশ হয়ে, সাথে আরও দুটি জীবনের ইতি ঘটলো।

… উপরোক্ত তিনটি ঘটনায় বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থাকে ফুটিয়ে তোলার একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করা হয়েছে. তিনটি ঘটনাই বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই লেখা।
যুগ আধুনিক হয়েছে বটে, কিন্তু আমরা কি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রবর্তী হয়েছি? না পশ্চাৎবর্তী হয়েছি বা বাধ্য হচ্ছি?
আসলে শিক্ষা কী বলে? মূল্যবোধ কী বলে?
আমিও নিজেকে হারিয়ে ফেলছি আজ বাস্তবতার এই প্রতিচ্ছবি অনুধাবনে বার্থ হয়ে.
‘’একেই কি বলে সভ্যতা, নাকি বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো?’’

লেখক: চিকিৎসক , ঢাকা , বাংলাদেশ

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 237
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    237
    Shares

লেখাটি ৪৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.