মেয়ে তুমি আরও বোকা হও

0

সুরভী আলম:

প্রচণ্ড বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে সেই সন্ধ্যা থেকে। মানুষজন সব আশ্রয় নিচ্ছে একটু খানি বৃষ্টির থেকে মাথা বাঁচাতে। মুষলধারে বৃষ্টি। অলসভাবে একের পর এক টিভি চ্যানেল বদলে যাচ্ছে নিতু। ধুর, সবার সাথে গেলেই পারতো। নিজের উপর রাগও হচ্ছে ভীষণ। নিজেকে মনে মনে বকা দিয়ে, এখন রাগ করে কী হবে, সবাই তো বলেছিল দুদিনের ট্যুর, থাকো এখন একা।

ফোনের রিং এর শব্দে কিছুটা চমকে উঠলো,
– হ্যালো
ও পাশ থেকে ভেসে আসলো অনিন্দ্যের কণ্ঠ।
– নিতু কী করছো?
– কিছু না
– আমি না তোমার বাসার নিচে, পুরো ভিজে চুপচুপ। তোমার হাতের এক কাপ চা খেতে খুব ইচ্ছে করছে।
– আমি তো বাসায় একা, তুমি জানো না?
– আমি কি তাহলে চলে যাবো? কিছুটা বিষণ্ণ কণ্ঠে বললো অনিন্দ্য।
– এর মাঝে! ঠিক আছে চলে আসো।
– তুমি চা করো, এক কাপ চা খেয়েই চলে যাবো প্রমিস। অনিন্দ্যের উচ্ছাসিত কণ্ঠ।

ফোনটা নামিয়ে অস্বস্তি মাখা এক ধরনের আনন্দ হচ্ছিলো নিতুর। প্রায় সময়ই অনিন্দ্য অদ্ভুত কিছু পাগলামি করে নিতুর জন্য। এই তো সেদিন রাত ১১ টায় ফোন দিয়ে বললো, একবার বারান্দায় আসো তো। নিতু বারান্দায় যেতেই দেখলো, অনিন্দ্য হা করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। এরপর নিতু জিজ্ঞেস করেছিলো, এমনটা কেন করেছিলে, উত্তর এসেছিলো ভরা পূর্ণিমায় দুটো চাঁদ একসাথে দেখবো বলে। এই সকল পাগলামি নিতুর ভিতরটা কীভাবে যে তোলপাড় করে দিচ্ছে, অনিন্দ্য সেই খবর কি রাখে?
কলিং বেল বেজে উঠলো। অনিন্দ্য বুঝি এসে পড়লো। এই রে চা-ই তো বানানো হলো না! দরজাটা খুলতেই অনিন্দ্যের সেই মন ভুলানো হাসি।

– একদম ভিজে গিয়েছো, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে বললো নিতু।
অনিন্দ্যকে বসতে দিয়ে দৌড়ে একটা টাওয়েল এনে মাথা মুছিয়ে দিল নিতু। মাথা মুছানো শেষ করতেই নিতুর দিকে মাথা উঁচু করে তাকালো অনিন্দ্য। নিতু তাকিয়ে দেখলো সেই দৃষ্টি, নভেম্বরের ২১ তারিখ অনেকগুলো চকোলেট দিয়ে যেদিন নিতুকে প্রপোজ করেছিলো সেদিন এই দৃষ্টিই দেখেছিল ওর চোখে। টাওয়েল নাড়তে চলে যাচ্ছিলো। মুহূর্তে নিতুর হাত দুটি অনিন্দ্য নিজ মুষ্টিবদ্ধে নিয়ে বললো,
– নিতু
– বলো
– তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?
– এমন অবান্তর প্রশ্নের কী আছে অনিন্দ্য? আমি তোমাকে ভালবাসি। প্রচণ্ড রকমের ভালবাসি। আর তোমার প্রতিটি কথার নাম আমার কাছে বিশ্বাস। ভালবাসা যে দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের উপরে।
– আজ তোমায় ছুঁয়ে একটি কথা বলতে চাই নিতু। বন্ধু বলো, প্রেম বলো, ভালবাসা বলো, গাইড বলো, তুমিই আমার জীবনের বিধাতার দেওয়া শ্রেষ্ঠ পাওয়া। কেন আরও আগে এলে না আমার জীবনে। আমার মা বলেন, তোদের ভালবাসাটা সঠিক, সময়টা বেঠিক। পৃথিবীর সবকিছু থেকে আমি তোমায় বেশি ভালবাসি।
– নিতু গলাটা নামিয়ে বললো, না ভুল। তুমি আবেগের বশবর্তী হয়ে বলছো। তুমি তোমার মেয়ে ‘আয়না’কে সব থেকে বেশি ভালোবাসো।

এমন উত্তরের জন্য অপ্রস্তুত ছিল অনিন্দ্য। তুমি সব ভালবাসাকে মিলিয়ে ফেললে নিতু!

– আমার বিশ্বাস কী জানো অনিন্দ্য! এই পৃথিবীর সকল ভালবাসার উৎস কিন্তু একই। ভালবাসা তো ভালবাসাই।
কোন অস্বস্তি নিতুর মনে এলে কখনো আড়াল করেনি অনিন্দ্যকে। ও জানে ওদের সম্পর্কটা অসম। জীবনের সকল কিছু হিসেব করে হয় না। উপরে বসে আছেন একজন সৃষ্টিকর্তা, দা গ্রেট প্ল্যানার! হয় তো সম্পর্কটা অসম, কিন্তু স্বর্গীয় যে অনুভূতি বিধাতা অনিন্দ্যর জন্য ওর সত্তায় মিশিয়ে দিয়েছেন, কেন তা আর কারো জন্য এই অনুভূতি দেন নি! নিতু জানে ওর ভালবাসতে পারার ক্ষমতা, ওর ভালবাসতে পারার গভীরতা। তাইতো সব সময়ই ট্রান্সপারেন্ট থেকেছে এই সম্পর্কে।

জীবনের এমন এক মুহূর্তে কেন সে অনিন্দ্যের সাথে এভাবে এসে জড়ালো, ভেবে পায় না। স্কুল,ইউনিভার্সিটিতে অসংখ্য প্রেমের প্রস্তাব দু পায়ে মাড়িয়ে চলে এসেছে শুধু নিজের চোখে শুদ্ধ থাকবে বলে। এমন অবান্তর সময়ে তাহলে কেন বিধাতা পাঠালো অনিন্দ্যকে!

মনের মধ্যে কিছু প্রশ্ন খচখচ করছিল, দূর করতে জিজ্ঞেস করে ফেললো অনিন্দ্যকে।
– তোমার তো প্রেমের বিয়ে, পালিয়ে বিয়ে করেছো। ভালবাসো না বউ কে?
নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ভারি গলায় অনিন্দ্য বললো,
– তোমাকে বহু দিন ধরে বলবো বলে ভাবছি, বলা হয়ে ওঠেনি। তুমি তো আমার বিয়ের কোন কাহিনীই জানো না।আফসানা আমায় ভালোবাসতো সেই ছোটবেলা থেকে, পারিবারিক এক ঝামেলায় বাবার উপর আমার তখন অনেক রাগ।বাবার উপর জিদ করে বিয়ে করেছি।
– ভালোবাসোনি বুঝলাম। তাহলে বাচ্চা?
– বাচ্চা তো আমি কোনদিনও চাইনি! এতো বছর বিয়ে,পারিবারিক চাপ। ভালোবাসতে আমি কোনদিনও পারিনি ওকে নিতু। তুমি কুফরি বিশ্বাস করো না আমি জানি। কথাটা খুব হাস্যকর শোনা গেলেও আমার বউ ভয়ানক কুফরিবাজ। তাবিজ কবচে বিশ্বাসী। আমার কলেজ জীবনের একটা প্রেমের কথা তোমাকে বলেছিলাম। বিয়ের পর ও আমায় বলেছে, ওকেও নাকি আমার জীবন থেকে সরাতে ও এমনটা করেছে।

হাসতে হাসতে নিতুর পেট ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে, এই শিক্ষিত সমাজে এগুলা কেউ করে নাকি!
– হাসতে হাসতে নিতু জিজ্ঞেস করলো, হারিয়ে ফেলা ভালবাসাকে মনে পড়ে?
– আগে মনে পড়তো, তোমার সাথে দেখা হওয়ার পর আর কিছুই আমার এই মন জুড়ে নাই। কারণ আমার মনটাই যে তুমি।
– আরেকটা প্রশ্ন করি? যদি বউকে ভালো নাই বাসো, শুধু বাবার উপর রাগ করে জীবনের এতো বড় সিদ্ধান্ত কেউ নেয়?
– ওরা জাতে নিচু, আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমার সাহায্য ছাড়া ওদের সংসার চলে না। ওর দাদা ছিল হাজেম।আত্মীয়দের মধ্যে ছিল তো, বাবা সব সময় খুব ছোট করে কথা বলতেন। আমার মায়া লাগতো। আরও একটা কারণ আছে ওকে বিয়ে করার। তোমার ভাষ্য মতে, আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ভালবাসা যেতে যেতে আমায় বলে গিয়েছিলো, বিয়ে করলে তুমি আফসানাকেই করো। তুমি আমাকে বিশ্বাস করছো না, তাই না নিতু?

সেই মায়াবী নিরীহ দৃষ্টিতে অপলক নিতুর দিকে তাকিয়ে অনিন্দ্য। যেই দৃষ্টিতে নিতু ডুবেছিলো অতলে। এই দৃষ্টির থেকে সত্য কিছুই নেই। এই দৃষ্টি থেকে আপন নিতুর কাছে আর কিছু ই নেই।
– আমি তোমাকে ভালবাসি অনিন্দ্য। হয়তো নিজের থেকেও বেশী। আর সেই ভালবাসায় শুদ্ধতম বিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি বাদাম, টং দোকানের চায়ে খুশি হওয়া মেয়ে। বাদামের খোসার মতো কোন দিন আমার বিশ্বাসটা ভেঙো না। যদি চলে যাও, একবার বলো চলে যাবে। কখনো আটকাবো না। ভালবাসা অসীম। শুধু মিথ্যে বলো না কখনো, আমার বিশ্বাসের সাথে শ্রদ্ধাটুকু রেখে যেও আমার জন্য।

নিতু অনিন্দ্যকে জড়িয়ে নিলো। সবচেয়ে শক্তিধর অনুভূতি কখনো ভাষায় নয় স্পর্শে প্রকাশ করা যায় মাত্র। নিতুর চোখে পানি। যদি কান্নার কোন রং থাকতো তাহলে হলফ করে বলা যায় এর রং হতো গাঢ় নীল। নিতুর এই সকল অনুভুতির অবগাহনের অধিকার শুধুই অনিন্দ্যের। অনিন্দ্য নিতুকে বলেছে, এই তো আর কয়েকটা দিন। ভালবাসাহীন নামধারী কোন বন্ধনেও আর থাকবে না। আর অভিনয় করে সেদিন পার করতে পারবে না। নিতুকে নিয়ে পঙ্খিরাজে উড়াল দেবে সে। পাহাড়ের বুকে ছোট্ট একটি ঘর বানাবে নিতুর জন্য। ভালবেসে ১০১ টা সিঁড়ি বানাবে পাহাড়ের বুকে।

রূপকথার গল্পের মতো। তারপরও নিতুর এগুলো বিশ্বাস করতেই ভালো লাগে।
কারণ কথা গুলো অনিন্দ্যের
– নিতুকে আরও শক্ত আলিঙ্গনে বেঁধে অনিন্দ্য বললো, বিশ্বাস করো নিতু ঠিক এই স্বর্গীয় প্রশান্তি আমি আর কোথাও খুঁজে পাইনি কোনদিন!

বৃষ্টি যেন থামছেই না। পাগল করা বৃষ্টি। অনিন্দ্যকে লিভিং রুমে বসিয়ে রেখে চা করছে নিতু। চা নামক এই পানীয়ের অনেক কালেকশন নিতুর। চা নিয়ে পাগলামি কিন্তু অনিন্দ্যের থেকেই পেয়েছে। কখন যে অনিন্দ্য রান্নাঘরে এসে পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে টেরও পায়নি। নিতুকে চমকে দিয়ে ওর কানের কাছে এসে ফিসফিস করে অনিন্দ্য বললো- আমি তোমাকে প্রচণ্ড ভালবাসি, প্রচণ্ড!

হিম শীতল করা শব্দগুলো বড্ড বেহায়া। ঘুরে দাঁড়ালো নিতু। অনিন্দ্যের চোখের দিকে তাকাতেই সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল। পা দুটো পাথর হয়ে রইলো, বাইরে প্রচণ্ড বাতাসের শো শো শব্দ। এই সকল আয়োজন বুঝি নিতুকে তোলপাড় করে যাওয়ার আয়োজন। সেই রাতে আর বাড়ি ফেরা হলো না অনিন্দ্যের।

খাবার টেবিলে অপেক্ষমান অনিন্দ্যের চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আফসানা। অনিন্দ্য ফিরলে একসাথে রাতের খাবার খাবে। হতচ্ছারা বৃষ্টি এবার তো চলে যা। খাবার সামনে নিয়ে বসে বসে ভাবছে, বৃষ্টিতে ভিজে এসে ভেজা শরীরে মস্ত বড় আলিঙ্গন দিয়ে পাগলটা আমায় বলবে-বিশ্বাস করো আফসানা, ঠিক এই স্বর্গীয় প্রশান্তি আমি আর কোথাও খুঁজে পাইনি কোনদিন!

এমন সময় পাশে রাখা ফোন বেজে উঠলো। ফোনটা রেখে আফসানা বললো- আয়না মামনি, তোমাকে খাইয়ে দেই। বৃষ্টিতে বাবা ফিরতে পারছে না। আজ রাতে অংশু চাচুর বাসায় থাকবে।

লেখক: সুরভী আলম, একজন নারী উদ্যোক্তা। গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করছেন। ছোটবেলা থেকে টুকটাক লেখালেখি করেন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 399
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    401
    Shares

লেখাটি ২,০১৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.