তুমি পথ আটকালেই আমি থামবো কেন?

0

আতিকা রোমা:

২১ ডিসেম্বর রাত থেকে ২৫ ডিসেম্বর স্কুটি চালিয়ে এক হাজার দুইশতের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছি। অনেকটা স্বপ্নের মতোই লাগছে এখনও। এর মধ্যে আবার সাফল্যের থলেতে যোগ হয়েছে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার দব্তিীয় সর্বোচ্চ পথে স্কুটি চালিয়ে ডিমের পাহাড় জয়।

রাত ১১টায় বাংলাদেশের দুইটি নামকরা বাইকিং গ্রুপ ঢাকা থেকে রওনা দেয় পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানের উদ্দেশ্যে। গ্রুপ দুটি হলো টিম এবিএস এবং এক্সপ্লোরার্স এমসি। এতে দুই গ্রুপের সর্বমোট ২০টি বাইক অংশগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে ১৯ জন পুরুষ এবং একজন নারী রাইডার ছিলেন। ওই একমাত্র নারী রাইডারটি হলাম আমি, আতিকা রোমা।

দলটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে বান্দরবান, চিম্বুক, নীলগিরি, থানচি, আলীকদম, লামা, ফাইসসাখালি হয়ে কক্সবাজার, টেকনাফ, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম হয়ে প্রায় ১২০০ কিঃমিঃ পথ অতিক্রম করে ২৫ ডিসেম্বর আবারও ঢাকায় পৌঁছায়।
২২ ডিসেম্বর ভোরে দলটি চট্টগ্রামে এবং সেখান থেকে দুপুরের মধ্যে বান্দরবান শহরে পৌঁছায়। রাতটুকু বান্দরবানে কাটিয়ে পরের দিন ২৩ ডিসেম্বর পাহাড়ে যাত্রা করে। বান্দরবান থেকে প্রথমে মিলনছড়িতে, পরে চিম্বুক পাহাড় হয়ে নীলগিরিতে পৌঁছায় দুপুরের মধ্যে।

আপাত:দৃষ্টে গল্পটা যতোটা সহজ মনে হচ্ছে, ততোটা সহজ নয়। পাহাড়ি আঁকাবাকা পথে প্রথমবার যেই চালিয়েছেন, তার কাছেই খুব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বলে মনে হবে। ক্রমাগত বাঁক এবং সরু রাস্তায় উলটো দিক থেকে আসা গাড়ির অস্তিত্ব সহজে বোঝা যায় না। তাই নিয়ম হলো নিজ নিজ লেন একশত ভাগ মেনে পথ চলা। একটু এদিক ওদিক হলেই নেমে আসবে বিশাল বিপর্যয়।

নীলগিরি পার হওয়ার পরেই সত্যিকার অর্থে ভয়ঙ্কর এডভেঞ্চারের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ এখানে হঠাৎ করেই রাস্তা কোথাও কোথাও খাঁড়া ভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে, আবার কোথাও অনেকটা নিচের দিকে নেমেই আঁকাবাঁকা বাঁকের মুখে পড়তে হয়। সেক্ষেত্রে দক্ষ বাইক রাইডার না হলে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী।

থানচি পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম ডিম পাহারের দিকে। প্রচণ্ড চরাই-উতরাই আঁকাবাঁকা পথ। ৪৫ ডিগ্রী খাঁড়াভাবে নেমে আবার ৪৫ ডিগ্রী ওপরের দিকে উঠে যেতে হবে। তাও আবার সোজা ভাবে ওঠা না, বাঁকে বাঁকে ওঠা। আমার স্কুটির টপ স্পিড ৮৫-৯০। সেখানে ওপরের দিকে উঠতে তা গিয়ে ঠেকেছিল ২৫-৩০ এ। এমন অবস্থায় মাথা ঠাণ্ডা রেখে হ্যান্ডেল এক চুলও না নাড়াচাড়া করে শুধু হাল ধরে ওপরের দিকে উঠে যেতে হবে। খাঁড়া আর আঁকাবাঁকা পথই না, সাথে ছিল পাহাড়ি নুড়ি পাথর। যার জন্য বার বার চাকা পিছলে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম ভুল হলে একবারই হবে। আমি আম্মা, আপা আর আমার বল্টু’র (আমার বিড়ালছানা) কথা মনে করছিলাম, আর পথ চলছিলাম।
মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম একটু। শুধু রোমেল ভাই, যিনি আমাকে হাইওয়েতে চালাতে শিখিয়েছেন এবং আরিফ ভাই খুব কনফিডেন্টলি বললেন, আমার রাইডিং-এর ওপর ওনাদের ভরসা আছে, কাজেই আমি পারবো এবং সবশেষে আমি পেরে গেলাম।

ডিম পাহাড় হলো বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার একটি পাহাড়। পাহাড়টি আলীকদম এবং থানচি উপজেলার ঠিক মাঝখানে। এই পাহাড় দিয়েই দুই থানার সীমানা নির্ধারিত হয়েছে। এই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সমুদ্র সমতল থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ। যা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়কপথ। আড়াই হাজার ফুট উঁচু এ পাহাড় চূড়ার আকৃতি দেখতে ডিমের মতো হওয়ায় স্থানীয়রা একে ‘ডিম পাহাড়’ নামেই চেনে।
ডিম পাহাড়ে পৌঁছানোর পর পুরো টিম আনন্দে ফেটে পড়লো। আমার যেন কী একটা হলো। স্কুটি চালিয়ে এই সুবিশাল পথ পাড়ি দেয়া আমি হলাম প্রথম নারী-কেমন যেন ঘোর লাগা একটা আনন্দ। যা পেরিয়ে এলাম তা ছিল জীবন-মরণ বাজী, যে বাজীর অনুভূতি শুধু উপলব্ধি করা যায়, বলে বা লিখে প্রকাশ করা যায় না।

এরপর সেখান থেকে আলীকদমের মূল জায়গা হয়ে লামার ফাইস্যাখালি হয়ে কক্সবাজার পৌছালাম। পরের দিন কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়া এবং আসা এবং সবশেষে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে আসা। সর্বমোট এক হাজার দুইশ কিঃমিঃ-এর বেশি পথ পাড়ি দেয়া, যা আমার জীবনে প্রথম।

এই ছিল আমার স্কুটি চালিয়ে ডিম পাহাড় জয়ের ঘটনা। স্বভাবতই আনন্দিত আমি, এমনকি টিমের অনেকেই। কিন্তু এই আনন্দের নিচেই বিষাদ ছড়িয়ে ছিল। আর তা হলো বাঙালীর কুচক্রিপনা। কারও কোনো অর্জনকে মুহূর্তে ম্লান করে দিতে বাঙালীর চেয়ে দক্ষ ক্রীড়নক আর কোথাও আছে কীনা, আমার জানা নেই।
সেই গল্পটিই করছি।

যখন এই বিজয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা, ঠিক সেই মূহূর্তে আমারই বাইকিং গ্রুপের কয়েকজনের চেহারা পুরো পাল্টে যেতে দেখলাম। এতো নোংরা ও ভয়াবহ চেহারা অপেক্ষা করছিল আমার জন্য, যা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। ২১ তারিখ রাতে যখন আমরা ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করি, তখন থেকেই মূলত: ঝামেলার শুরু।

হাইওয়েতে নিয়ম মেনে চলতে হয়। যিনি নেতৃত্ব দেন, তার কাঁধে পুরো দলের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে এবং আমরা বাইকাররা টিম লিডারের ভুল-শুদ্ধ যাই হোক, তাকেই অনুসরণ করি। তো, টিমেরই একজন সেই রাতে বার বার সিরিয়াল ভেঙে এবং নিজের বাইক চালানোর কারিশমা দেখাতে লিডারকে ওভারটেক করে চলে যাচ্ছিল এবং নিজেই লিড নিতে চেষ্টা করছিল। প্রতি ট্রিপেই সে এই কাজটি করে এবং প্রতি ট্রিপেই তাকে সিনিয়ররা বকাঝকা করে। সেদিনের সেই ঘটনায় আমি নিজেও বিরক্ত হয়ে তা প্রকাশ করেছিলাম। আর সেই জেরই বেশি করে টানতে হচ্ছে ডিম পাহাড় জয়ের কারণে। একদিকে স্কুটি নিয়ে উঁচু পাহাড়ে উঠা, অন্যদিকে আমি মেয়ে। ওদের মুখ বন্ধ করার সাধ্য কার!

ওরা দলবদ্ধভাবে এই বিষয়টাকে কেন্দ্র করে আমাকে ক্রমাগত সামাজিক মাধ্যমে হেয়পতিপন্ন করতে থাকে। ফেসবুকে অতি নোংরা নোংরা পোস্টিং দেয়া ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় আমার বিরুদ্ধে নানান ধরনের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াতে থাকে। তার সাথে আরও কয়েকজন যুক্ত হয়। বুঝলাম ঘটনার কারণ সেই বকাঝকা নয়। ঘটনা হলো তাদের মেল ইগো। ওদের ইগোতে আঘাত লেগেছে। তাই আস্ফালন চলছে।

অন্যদিকে আরও কিছু মানুষের ভয়াবহ রূপ দেখলাম যাদের দামি দামি স্পোর্টস বাইক আছে, কিন্তু তারা বাড়ির আশেপাশে এবং শহরের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া হাইওয়েতে যান না বিভিন্ন অজুহাতে। তো, আমি সামান্য একজন নারী এবং আমার সামান্য ১১০ সিসি-র একটি স্কুটি দিয়ে আমি যা পারি, তা তারা যখন পারে না, তখনই আসলে সমস্যাটা প্রকট হয়েছে। তারাও যোগ দিয়েছে সেই ব্যর্থ, ক্রুদ্ধদের কাফেলায়। এটাই হলো বাংলাদেশের পুরুষ, যাদের দেখা আমি শেষ অব্দি পেলাম।

একদিকে যখন জয়ের এক উৎসব, মিডিয়ার লোকজনের উচ্ছ্বাস, ঠিক তখনই এদের এই ভীরুতা। আমি জানি না, তাদের অক্ষমতার দায় কোথা থেকে আমার বহন করার কথা। এনাদেরই একজনকে দেখলাম আমাকে থাপ্পড় পর্যন্ত মারতে চেয়েছে। মানে ওরা যা লিখে যাচ্ছে বা ওরা যা বলছে আমার উচিৎ ছিল নারী হিসেবে, দুর্বল হিসেবে সেগুলো মুখ বুঁজে সহ্য করা এবং টু শব্দটি না করা।

প্রচুর কথা তারা লিখেছে ফেসবুক জুড়ে যেন সামাজিকভাবে আমাকে লাঞ্ছিত করা যায়। কিন্তু এতো কিছুর পরেও তাদের কথা ধোপে টেকেনি, কারণ আমাকেও তো একটু হলে মানুষ চেনে। উপায়ন্তর না দেখে শেষে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছি। মৌখিক অভিযোগ জানানোর পরই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছে। এই যোগাযোগের পর কয়েকজন, যারা ক্রমাগত নোংরা নোংরা কথা বলে আমার সম্মানহানির চেষ্টা করছিল, ফোন করে ক্ষমা চেয়েছেন।

আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, যারা নারীর অর্জনে ভয় পায়, হিংসায় জ্বলে-পুড়ে যায়, তার এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে, এদের জন্য করুণা প্রদর্শন করুন। এদেরকে “সোস্যাল শেমিং” বা সামাজিকভাবে লজ্জিত করুন, যাতে আর কোনদিন কোনো মেয়ের প্রতি নোংরা কথা বলার আগে একবার অন্তত ভেবে দেখে।

আসুন এই কাপুরুষগুলোর জন্য সামাজিক লজ্জা প্রদর্শন করি এবং এদের মুখোশ উন্মোচন করে সবার সামনে নিয়ে আসি, যাতে সকল নারীর যাত্রাপথ সুগম হয়, তারা নিশ্চিন্ত ভাবে এবং ইচ্ছে অনুযায়ী জীবনধারণ করতে পারে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 945
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    945
    Shares

লেখাটি ১,১৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.