‘মাতৃত্ব’ নারীর ‘ক্যারিয়ার’ নয়, নারীর সিদ্ধান্ত

0

প্রমা ইসরাত:

এটাকে সম্ভবত আলিফ লায়লা সিনড্রোম বলে। মানে এক গল্প বলতে গিয়ে অন্য গল্প বলা, এক কাহিনীর আলাপে আরেক কাহিনী নিয়ে আসা। তো যাই হোক, এইরকম তো হতেই পারে।
আমি ৯০’এর বেড়ে ওঠা জেনারেশনের একজন, আলিফ লায়লা, সিন্দবাদ, রবিন হুড, হারকিউলিক্স, রোবকপ, এক্সফাইলস এগুলোই তো ছিল আমাদের বিটিভি থেকে প্রাপ্ত বিনোদন সমূহ।

ব্যাপার খানা হচ্ছে যে, আমার মনে পড়লো, তখন ২০১৩ সাল, ৮ মার্চ নারী দিবস, গণজাগরণ মঞ্চের নারী সমাবেশে যাবো। রাইফেল স্কয়ারের উলটা দিকে, ধানমন্ডি লেকের দিকে একটা কাপড়ের ব্যানারে লিখা, “নারী নেতৃত্বের নয়, নারী মাতৃত্বের “, বাণীতে হেফাজতে ইসলাম। প্রচণ্ড মেজাজ গরম নিয়ে গেলাম সমাবেশে, সমাবেশ চলাকালে সেখানে ককটেল ফুটিয়ে একটা আতঙ্কও তৈরি করার চেষ্টা করেছিল অশুভ শক্তিরা।

তো যেটা বলছিলাম আরকি, ঠিক একই গোত্রীয় একটি বাণী দেখলাম ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে, এই বাণী দিয়েছেন একজন প্রতিষ্ঠিত গাইনোকলজিস্ট এবং শিক্ষক। সেই শিক্ষক একজন নারী, এবং নিশ্চয়ই তিনি তার ছাত্র ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। কী বলেছেন সেই শিক্ষক?
তিনি বলেছেন, “মাতৃত্ব হচ্ছে মেয়েদের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার”। কী এক পুরনো হেফাজতীয় সুর বেজে উঠলো আমার কানের কাছে। একটু মজাও লাগলো, মজা লাগলো আমার নানীর কথা ভেবে। এই সূত্র ধরলে আমার নানী একজন উচ্চ ক্যারিয়ার সম্পন্ন নারী। তার সন্তান ছিল ১০ জন। তার চাইতেও অধিক মাত্রার ক্যারিয়ারিস্টিক নারী ছিল গান্ধারী। গান্ধারী মহাভারতের একটি চরিত্র, ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী। তার ১০০ টা পুত্র হয়েছিল। এইরকম ক্যারিয়ারকে তুলনা করা যেতে পারে বিল গেটস এর সাথে, বিল গেটস এর ক্যারিয়ার ইজ ইকুয়েল টু গান্ধারীর ১০০ পুত্র, ঠিক আছে না?

তো, ওই মাতৃত্বকে সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার বলা সেই ম্যাডামের বক্তব্যে, অনেক নারী ঐক্যমত পোষণ করেছেন। অবশ্যই তারা সেটা করতেই পারেন। আমার মা মাতৃত্ব গ্রহণ না করলে আমি এই পৃথিবীতে আসতাম না, আমার নানী মাতৃত্ব গ্রহণ না করলে আমার মা আসতো না। তারা সেই মাতৃত্ব গ্রহণ করেছেন, এবং আমরা পৃথিবীতে আসতে পেরেছি। আমার মা-বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাই আমি এই পৃথিবীতে এসেছি।

কিন্তু আমার আপত্তি হচ্ছে, মাতৃত্ব সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার এই বক্তব্যটিতে। একজন নারীর জন্য তার সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার যদি মাতৃত্ব হয়, তবে একজন পুরুষের জন্যও তার সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার হওয়ার কথা ছিল পিতৃত্ব। কিন্তু গাইনোকলজিস্ট ম্যাডাম সেটা বললেন না। কেউই সেটা বলেন না। কারণ পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় নারী মাত্রই একটি যোনী, এবং একটি গর্ভাশয়। নারী শেষ পর্যন্ত একটি শিশু জন্মদান এবং শিশুকে লালন পালন করা ব্যাক্তি। নারীর প্রথম কাজ বিয়ে, সংসার এবং সন্তান জন্ম দেয়া। তার লেখাপড়ার উদ্দেশ্য যেন একজন ভালো স্বামী সে পায়, ভালো শ্বশুরবাড়ি যেন তার হয়। স্বামীর যোগ্য স্ত্রী হতে পারার জন্যই এতো শিক্ষা এতো দীক্ষা।

নারীকে সম্মান দেয়ার সময় বলা হয়ে থাকে, নারী হচ্ছে মায়ের জাত। নারীকে সম্মান দেয়ার সিলেবাস সমূহে, এই লাইনটি সবার প্রথমে রাখা হয়। নারী কে সম্মান দিতে হবে কারণ নারী সন্তান জন্ম দেয়, নারী মাতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে। একটি মেয়ে শিশু আসলে একজন হবু মা। কিন্তু এমন যদি হয়, যে সেই নারী বিয়ে শাদি, সংসার সন্তানের ব্যাপারে আগ্রহী না, তার নিজের শর্তে সে জীবন যাপন করতে চায়, তবে সেই নারী একজন অছ্যুৎ, বাবা মার জন্য অভিশাপ, সমাজের চোখে নষ্টা, কূলটা, ডাইনী লেভেলের।
নারীকে মহান হতে হলে, তাই মা হতে হবে। অনেক মেয়েকেই দেখেছি শ্বশুর বাড়িতে যদি কেউ পাত্তা না দিতো, তবে একটা সল্যুশন বের করে সাজেশন দিতো অন্যরা, যে বাচ্চা নিয়ে নাও তখন দেখবা পাত্তা পাবা, আদর পাবা। পাত্তা , আদর ওই বাচ্চা হওয়া পর্যন্তই, এরপর সেই অনাদরের বোঝাসহ সন্তানের দেখভাল, সন্তান জন্মদানের পর হরমোনাল ডিজঅর্ডার, সব মিলিয়ে একজন নারী কে মাঝ দরিয়ায় পড়তে হয়। কিন্তু তখন, বা ততোদিনে এগিয়ে যাওয়াটাই একমাত্র অপশন হিসেবে বেছে নিতে হয়, ফেরার কোন পথ থাকে না।

ম্যাডাম বলেছেন, মাতৃত্ব মেয়েদের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার, তো, ক্যারিয়ার যদি হয় তবে সেটা তাদের জন্য যারা স্যারোগেট মাদার, মানে গর্ভ ভাড়া দেয় যারা তাদের জন্য। কারণ এর বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ সেই নারী পান।

একজন নারী মা হওয়ার পর, তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত তাকে সন্তানের জন্য, তার ইচ্ছা, তার চাহিদা, তার আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিতে হয়। এই এতো কিছু করার পরও, একজন নারী তার সন্তানের আইনী অভিভাবক নন। একজন মা তার সন্তানের জিম্মাদার মাত্র, সন্তানের আসল অভিভাবক হচ্ছে সেই সন্তানের পিতা। তবে এটা কেমন ক্যারিয়ার যেখানে নারীর আইনগত কোনো অধিকার নেই?

মাতৃত্ব নারীর সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার, অথচ এই ক্যারিয়ারই একটি ন্যাক্কার জনক, এবং পাপ কাজ হয়ে দাঁড়ায় যদি সেই অনাগত সন্তানের পিতা সেই সন্তানের পরিচয় দিতে অস্বীকার করে। সন্তানের পরিচয় শুধু মায়ের জন্য হয় না, সেখানে পিতার পরিচয় মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

তো, এখানে কিসের ভিত্তিতে মাতৃত্ব মেয়েদের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার?
যখন স্বামীর সাথে সংসারে অশান্তি হয়, তখন অনেক নারী সেই সংসার টিকিয়ে রাখতে অছিলা দেয় সন্তানের, স্বামী-শ্বশুর বাড়ির লোকের হাতে পায়ে ধরে, কিংবা বলে থাকে শুধু মাত্র আমার বাচ্চা টা আছে বলে ডিভোর্স নিতে পারতেছি না, তো নিজের সন্তান কে নিজেরই গলার কাঁটা বানিয়ে ফেলা এই নারীদের কাছে,মাতৃত্ব কিসের ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার?

সন্তান না হলে, মানসিকভাবে অনেক সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে যেতে হয় সব নারীকে। কারণ আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, যে নারীর সন্তান হয় না, সে একজন বাতিল মাল। আর এই যে মানসিকতা এই মানসিকতা একজন নারীকে তার অস্তিত্ব বিলীনের দিকে নিয়ে যায়, কারণ ওই যে স্লোগান, “নারীর পূর্ণতা মাতৃত্বে “।
নারীর পূর্নতা মাতৃত্বে যদি হয়, নারীর সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার যদি হয় মাতৃত্ব তবে পুরুষের পূর্ণতা কিসে? তবে পুরুষের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার কোনটা?

এই কিছুদিন আগে ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। খুবই অনাড়ম্বরভাবে এই ব্যাপারটি স্বীকৃতি পেয়েছে, কেন? কারণ সবাই জানে, যতই চাপাচাপি করো, কোনো লাভ নাই, শেষ পর্যন্ত এই অনূর্ধ্ব ১৫ দলের মেয়েরা আসলে হবু মা। আর কিছুদিন পরেই তাদের বিয়ে নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হবে, তারপর বাচ্চা-কাচ্চা-সংসার ইত্যাদি। কারণ ওই ম্যাডামের কথা অনুযায়ী মাতৃত্ব মেয়েদের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার।

নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য, যারা সিলেবাস মেইনটেইন করেন, তাদের সূচিপত্রের প্রথম পাঠ, নারী মায়ের জাত তাই তাদের সম্মান দিতে হবে, যে নারীর সন্তান হয় না, সন্তান ধারণ জনিত জটিলতার জন্য যার সন্তান হয় না, কিংবা যে সন্তান নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নিতে চায়, বা যে সন্তান নিতে চায় না, তাদের কোনো সম্মান নেই? তাদের কোন মর্যাদা নেই?

নারীকে সম্মান পেতে হলে, মর্যাদা পেতে হলে যদি সিলেবাস মেনে চলতে হয় তবে আমি সেই সিলেবাসকে অস্বীকার করি।
কারণ সবার প্রথমে আমি মানুষ এবং আমার রয়েছে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। আর এই অধিকার আমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

না মাতৃত্ব নারীর কোনো ক্যারিয়ার, না নারীর পূর্ণতা নির্ধারণ করে। নারী একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ। পিতা হওয়া বা মাতা হওয়া কোনো মানুষকে তার মানুষ হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। তাই মাতৃত্ব একজন মানুষের পূর্ণতা লাভের সার্টিফিকেট নয়, মাতৃত্ব নারীর কোনো ক্যারিয়ার নয়, মাতৃত্ব নারীর সিদ্ধান্ত।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

লেখাটি ১,৮৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.