সুন্দরবন: সৌন্দর্য্য বনাম ভোগবাদিতা

0

মৌসুমী বিশ্বাস:

সুন্দরবনের নামটা কে দিয়েছিল জানি না। সে যে বা যারাই দিন না কেন নামের পেছনেই এর মহত্ত্ব লুকিয়ে আছে। শুনেছি ‘সুন্দরী’ গাছের নামকরণ থেকে সুন্দরবন নামটি এসেছে। কিন্তু কথা হলো গাছের নামই বা সুন্দরী কেন! সৌন্দর্য্য শব্দটি যেকোনো অর্থেই সীমাহীন। সুন্দরের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা সংক্রান্ত কোনো এক জার্নালে পড়েছিলাম, স্টাডি ট্যুরের অংশ হিসাবে একদল ছাত্রছাত্রীকে সৌন্দর্যের ধারণা দিতে এক গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তারা নির্জনতা আর প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করবে এবং ফিরে এসে কার কী ভালো লেগেছে ও কেন লেগেছে সেটা লিখবে। ভ্রমণ শেষে অভিজ্ঞতা বর্ণনায় দেখা গেল কারো ভোর দেখতে ভালো লেগেছে, কারো শব্দহীনতা ভালো লেগেছে, কারো অন্ধকার, কেউ পাখির শব্দ শুনে মুগ্ধ, আবার দু’একজন বলেছে তাদের কিছুই ভালো লাগেনি। অহেতুক এই আয়োজন। আরাম, আয়েশ আর ভোগবাদিতা ছেড়ে এসব কেন!

এই কথাটা যেখানে শেষ করলাম সেখান থেকেই আসলে মূল লেখার শুরু। চিন্তার ভিন্নতা আর অনুভূতির তারতম্যের কারণেই প্রতিটি মানুষের দেখার জগৎ আর একজনের থেকে আলাদা। এই স্বাতন্ত্র্যতাকে যে সম্মান জানাতে পারবে, তার দেখা ও বোঝার জগৎও ততবেশি সমৃদ্ধ হবে।

লেখা শুরু করেছিলাম সুন্দরবন নিয়ে। সেখানেই আবার ফিরে আসি।

বিভিন্ন কারণে নানা বয়সে বেশ কয়েকবার সুন্দরবন যাবার সুযোগ হয়েছে। প্রথমবার গেলাম মা’র স্কুল থেকে শিক্ষকদের পিকনিকে; তখন অনেক ছোট, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি বোধ হয়। তখনকার ঘটনা তেমন কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে নৌকা করে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই, আর চিপস্-চানাচুর খাচ্ছি। একটু বিরক্ত করলেই বড়রা বলছে, সামনে তাকিয়ে থাকো, হরিণ দেখতে পাবে (যদিও হরিণ-ফরিণ কিছুই দেখা গেল না, তবে নৌকায় যাওয়া ও চিপস্ খাওয়াটা ভালো লাগলো)। ব্যস, এতোটুকই। আর কিছুই মনে নেই।

মনে রাখতে পারা জীবন পরবর্তী সময়ে যতবার গিয়েছি প্রতিবারেই অপার সৌন্দর্য ধরা পড়েছে সুন্দরবনের প্রতিটি পরতে পরতে। কখনো শ্বাসমূল আর নুয়ে পড়া গোলপাতা দেখে মুগ্ধ হই তো কখনো খাল বেয়ে নৌকায় যেতে যেতে জোয়ার-ভাঁটা দেখে। বিশাল গাছ-গাছালি, দমকা বাতাস আর নির্জনতার মধ্যে অনেক সহযাত্রীদের সাথে থেকেও কখনো জীবনানন্দের লাইনগুলোর মতো মনে হয়, “সকল লোকের মাঝে বসে, আমার নিজের মুদ্রাদোষে, আমি একা হতেছি আলাদা”।

স্কুল জীবনে এক ভূগোল ক্লাসে স্যার পড়াচ্ছিলেন, আফ্রিকার এ্যামাজান জঙ্গল এতই গভীর যে সেখানে সারি সারি সুউচ্চ গাছের গভীরতা ভেদ করে দিনের বেলা সূর্যের আলো সরাসরি জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। ফলে দিনের বেলাও একধরনের আলো-আঁধারির খেলা চলে সেখানে।
শুনেই মনে হয়েছিল, ইশ্ একবার যদি যাওয়া যেত সেখানে! এই ভাবনার দীর্ঘ বছর পর যখন সুন্দরবনের করমজলের কাঠের ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে সত্যিকার বনের মধ্যে প্রবেশ করলাম, তখন স্কুল জীবনে শোনা অ্যামাজনের গল্প বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ নিল। মানুষের মস্তিষ্কের জটিল কোষগুলো সকল অনুভূতিই সযত্নে জমা রাখে। নৌকা থেকে নামার পর গাইডের সতর্ক বাণী আর মনে থাকলো না। মনে হলো ওয়েস্টার্ন বইয়ে পড়া কোনো রূপকথার দেশে চলে এসেছি; এই সৌন্দর্য্য দেখতে না পেলে মানুষ হয়ে জন্মানোর কোনো মানেই হয় না। একই অনুভূতি হয়েছিল যখন প্রথমবার নেপালে হিমালয়ের সাদা বরফের ওপর ঝকঝকে রোদ্দুর দেখেছিলাম।

অনেক বছর আগে একবার শ্রদ্ধেয় আব্দুল্লাহ আবু সাইয়িদ স্যারের বক্তৃতা শুনতে গেছি। উনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন, আর আমরা হলভর্তি মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি। মাঝে মাঝে সমস্বরে হাসির রোল উঠছে। স্যার তাঁর সুন্দরবন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলা শুরু করলেন। দীর্ঘ ভ্রমণ পথে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন। লঞ্চে যেতে যেতে কী কী দেখছেন, সহযাত্রীদের সাথে খুঁটিনাটি কী কথা হচ্ছে ইত্যাদি। খুবই সাধারণ কথা, কিন্তু বাচন ভঙ্গির কারণে সেসবই অসাধারণ শোনাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে থাকা স্থানীয় লোকজন সুন্দরবন সম্পর্কে নানা তথ্য দিচ্ছে তাঁকে। একসময় এক ছেলে বললো, স্যার জানেন সুন্দরবনে কিন্তু রয়েল বেঙ্গল টাইগারও আছে। স্যার তখন আমাদের বললেন,“আচ্ছা বলেন তো, এই তথ্য কার না জানা! সুন্দরবনে বাঘ থাকবে না তো কি বাঘ আমার ঘরের ড্রয়িং রুমে থাকবে”। মুহুর্তে হাসির রোল উঠলো শ্রোতাদের মধ্যে।

বৈশ্বিকতার আঙ্গিকে গর্ব করার মতো আমাদের তেমন কিছুই নেই এক রবীন্দ্রনাথ আর সাম্প্রতিককালের ক্রিকেট ছাড়া। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নেওয়ার জন্য যখন সুন্দরবনের নামে প্রচারণা চলছিল, দেখতে কী ভালোই না লাগছিল তখন! মনে-প্রাণে চাইছিলাম সুন্দরবনের নামটা চিরস্থায়ী হোক বিশ্ব তালিকায়। কিন্তু হলো না। খুব মন খারাপ হলো এই খবরে।

বছর দুয়েক আগে তেলের ট্যাঙ্কার ডুবে কী বিপর্যয়ই না ঘটলো প্রিয় রূপসায়!

এখন আবার নতুন সংকট তৈরি হলো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে। সুন্দরবনের একফোঁটা ক্ষতি হোক, কিছুতেই চাই না। রাষ্ট্রের অতি সাধারণতম নাগরিক আমি। কষ্ট হলেও নিয়মিত কর পরিশোধ করি। ভ্যাটের পরিমাণ ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হলে আমার জীবনযাত্রায় যে প্রভাব পড়বে এবং জীবনযাপন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে জেনেও রাষ্ট্রীয় নিয়ম-নীতির প্রতি সন্মান ও বিশ্বাস রাখি পূর্ণমাত্রায়। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রেও উচিৎ অতি নগণ্য নাগরিকদের সাধারণ ভালো লাগা- মন্দ লাগার মূল্যায়ন করা ও মতামত বিবেচনা করা।

বিশ্বাস করি, যেভাবে উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ আমাদের, ঠিক তেমনিই একদিন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নতদেশে পরিণত হবো আমরা। সেইদিন খুব বেশি দূরে নয়। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে শুধু একটি সুন্দর মন দরকার আর কিছু নয়। বাকি সবই আছে আমাদের।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 288
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    288
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.