ধর্ষণ তোমার লজ্জা নয়, ধর্ষণ ধর্ষকের লজ্জা

0

সৌম্যজিৎ দত্ত:

“যদি তুমি ভাবো, তুমি ধর্ষণের শিকার, তুমি দুর্বল, তবে দুর্বল হয়ে যাবে তোমারই মত সহস্র লীলা, গীতা, মহিমা। যদি তুমি মনে করো তুমি ধর্ষণের শিকার, কিন্তু তুমি ন্যায়ের পথে হাঁটবে, তুমি ন্যায় করবে সেই লীলা, গীতা, মহিমাদের। নজির তুলে ধরবে, ধর্ষণের শিকার মানে তুমি মানসিকভাবে ধর্ষিতা নও, ধর্ষণের শিকার মানে তুমি পঙ্গু নও, ধর্ষণের শিকার মানে তুমি হেরে যাওয়া, শেষ হয়ে যাওয়া, একেবারে ফুরিয়ে যাওয়া কোনো বস্তু নও। ধর্ষণ শুধু একটা অপরাধ আর সেই অপরাধ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোমাকে চলতে হবে। তবেই সাহসের উজ্বল আলোকে ন্যায় পাবে ওরা, যারা ধর্ষণের শিকার হয়েও নিজের সম্মানের জন্য লুকিয়ে থাকতে নয়, বরং প্রকাশ্যে এসে লড়াই লড়তে চায়”।

জিনিয়ার জীবনটা অতি সহজ সরল ছিল। সে স্বপ্ন দেখত সুন্দরের, সুন্দর জীবনের, প্রেমের। বাচ্চামি, পাগলামি নিয়েই সে থাকত প্রতিটা মুহূর্তে। হঠাৎ বদলে গেল যেন জীবনটা। হাসি নয়, জিনিয়াকে ভয় গ্রাস করেছে। চোখে, মুখে যেন নিজেকে অপরাধী মনে করার ছাপ। জিনিয়া কারোর সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না, যেটুকু বলছে, গলা কেঁপে কেঁপে উঠছে। জিনিয়া যে কখনো ছেলে, মেয়ে আলাদা করে দেখেনি, সবার সাথে অবাধে মিশেছে, খেলেছে, গেয়েছে, হঠাৎ করেই যেন ছেলে দেখলে সে দূরে সরে সরে যাচ্ছে। বাড়ির সবার মধ্যে থেকেও যেন সবার থেকে আলাদা একটা জগতে, যেন মনের ভিতরে সবকিছু তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। জিনিয়া ভয় পাচ্ছে।

কি এমন হয়েছে জিনিয়ার সাথে, যে সে ভয়ে কোকীয়ে উঠছে, কারোর সাথেই স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছে না, মিশতে পারছে না!

আমি, লেখক সৌম্যজিৎ দত্ত আজ সেই মেয়ের সবথেকে কাছের বন্ধু, এবং এতটাই বিশ্বস্ত হতে পেরেছি যে মেয়েটি আমাকে নিজের সেইসব অন্ধকারের কথা জানাতে পেরেছে নির্দ্বিধায়।

সাল ২০১৪ এর ডিসেম্বর মাস। জিনিয়া দিল্লীতে কাকুর বাড়িতে বেড়াতে গেছিল। তখন জিনিয়ার বয়স বাইশ বছর। উৎসবের সময় তখন গোটা পৃথিবীতেই। দিল্লীও নতুন সাজে সেজে উঠছে। জিনিয়া আধুনিক মেয়ে, পার্টিতে যেতে কোনও বাধা, দ্বিধা নেই। মাঝে মধ্যে নেশাও করে। বাড়িতে কড়া পরিবেশে ভয় থাকলেও জিনিয়া বাইরের পরিবেশে বেশ সাবলীল। হঠাৎই সেদিন জিনিয়ার কাকাতো দাদা জিনিয়াকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দেয়। জিনিয়া এই প্রস্তাবে হকচকিয়ে ওঠে। কে’ই বা এমন একটা পরিস্থিতির মুখে স্থির থাকতে পারে! জিনিয়া ভীষণ রেগে যায়। সটান থাপ্পড় চাপিয়ে দেয় নিজেরই দাদাকে। পরিস্থিতি সামলাতে জিনিয়ার দাদা বলে, “সে মজা করছিল।” এরপর জিনিয়াও ভাবে যে সে ভুল করেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, তার দাদা মজাই করছিল। এভাবে কোনো দাদা কি কখনো নিজেরই কাকাতো বোনকে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দিতে পারে! জিনিয়া ব্যাপারটা ভুলে যায়।

সেদিন ছিল ৩১শে ডিসেম্বরের রাত। জিনিয়া ও তার দাদা এক নাইট ক্লাবে ঘুরতে যায়। সেই রাতে জিনিয়ার জন্য যে ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে, তা জিনিয়া কখনোই বুঝতে পারেনি। নাইট ক্লাবে গিয়ে জিনিয়া দেখে সেখানে তার দাদার বন্ধুরাও এসেছে। সবাই মিলে গানের সাথে নেচেছে। মদও খেয়েছে। হঠাৎই জিনিয়া দেখে সবদিক কেমন অন্ধকার হয়ে আসছে! জিনিয়া অসুস্থ বোধ করতে থাকে সেই পার্টিতে এবং চেতনা হারায়। পরদিন যখন ঘুম ভাঙে, তখন জিনিয়া নিজেকে আবিষ্কার করে এক হোটেল রুমে একা, বিধ্বস্ত অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছে। তার শরীরে অসম্ভব যন্ত্রণা। বিছানার চাদরে রক্ত লেগে। জিনিয়া বুঝতে পারে, তার সাথে কী হয়েছে! কিন্তু সে ভয় পেয়ে যায়। জিনিয়া ভয় পেয়ে যায় বাড়ির মানুষগুলোর জন্য। সে কাওকে কিছু জানাতে পারে না। সবার মাঝে থেকেও সবার থেকে সে আলাদা হয়ে যায়। ভেঙে পড়তে থাকে। মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে থাকে।

একজন বাইশ বছরের আধুনিক মেয়ে, যার পরিবেশ সম্পর্কিত সমস্ত চেতনা আছে, কিন্তু বাড়ির পরিবেশকে সে এতোটাই ভয় পায় যে সে তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাড়িতে প্রকাশ করতে পারে না। সে বলতে পারে না যে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছে তারই দাদার কাছে। সে বলতে পারে না যে তার ন্যায় চায়। পরিবর্তে সে নিজেই অপরাধবোধে ভুগতে থাকে।

আর কতদিন মেয়েরা নিজেদের সাথে হওয়া অন্যায়গুলো, অত্যাচারগুলো মুখ বন্ধ করে মেনে নেবে! আর কতদিন মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হলে নিজেদেরই অপরাধী ভাববে! আর কতদিন জিনিয়ার মত মেয়েরা ধর্ষণকে মুখ বুজে সহ্য করবে! আর কতদিন সেইসব ধর্ষকেরা ধর্ষণ করে বেকুসুর খালাস পেয়ে যাবে?

আমি জিনিয়ার পাশে আছি। আমি জিনিয়ার পাশে থাকবো। আমি জিনিয়ার ভরসা হবো। ন্যায়ের জন্য লড়াইয়ে পাশে থাকবো জিনিয়ার। আমি জিনিয়ার সমস্ত ভয়কে কাটিয়ে দেবো। ওকে বোঝাবো, অন্যায় ওর সাথে হয়েছে, ও কোনো অন্যায় করেনি।

মেয়ে, তোমরা তোমাদের প্রতি হওয়া অন্যায়কে প্রকাশ করো। মুখ বন্ধ করে যতদিন সহ্য করবে, অন্যায়কারীরা, ধর্ষকরা সমাজে তত শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তত মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তোমরা যদি ধর্ষণের শিকার হও, প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করে নিজের এবং সমস্ত নারীর সম্মানকে অক্ষুণ্ণ রাখার উদাহরণ তুলে ধরো। বুঝিয়ে দাও তুমি ধর্ষণের শিকার হলে, সেই লজ্জা তোমার নয়, সেই লজ্জা ধর্ষকের।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৩৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.