সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিষ্টাচারের উপযোগিতা

0

সাদিয়া রহমান:

সেক্স এডুকেশন বলতে এখনও সমাজে বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন কীভাবে যৌন মিলন করতে হবে বাচ্চা কাচ্চাদের তা শিক্ষা দেয়া। সে শিক্ষা যৌন শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত বটে, কিন্তু যে শিক্ষার কথা বাচ্চাদের দেয়ার ব্যাপারে বলা হয়, তার থেকে বহু দূরে ঐ শিক্ষার অবস্থান। বাচ্চাদের যে শিক্ষা দেয়ার জন্য এখন বলা হচ্ছে, তাকে যৌন শিক্ষা না বলে তাই যৌন শিষ্টাচার বলাটাই উপযুক্ত। এই অঞ্চলে যৌন হয়রানির নানান রূপ এবং নানা মাত্রার দিকে আলোকপাত করলে বুঝা যায়, এই শিষ্টাচার শিক্ষাটা এখন শুধু বাচ্চাদেরই না, তাদের বাবা-মা বা অভিভাবকদের জন্যও অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যৌন শিষ্টাচার কোনগুলোকে বলে সেগুলো এবং কোন শিষ্টাচারসমূহ বাচ্চাদের জানা দরকার। সেই সম্পর্কে আজকাল পত্র পত্রিকা এবং টেলিভিশন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও বিস্তর লেখালেখি এবং আলোচনা হয়ে থাকে। তারপরেও কিছু উদাহরণ দেয়া উচিত।

যেমন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বাচ্চারা বাবা-মা ব্যতিত অন্য কোনো ব্যক্তির সামনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হবে না, জামা বদল করবে না। একটা বাচ্চা যে বাইরের ব্যক্তির কাছে জামা বদল করবে না শুধু তাই না; তাকে ছোটো ভেবে, সে কিছু বুঝবে না ভেবে তার সামনেও কেউ অশোভন আচরণ করবে না। ছোটো থেকেই ধীরে ধীরে নিজের শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে জানতে শুরু করতে হবে। অমুক বয়সের পর বাচ্চারা অমুক মানুষগুলোর কোলে আর উঠবে না। কোমলমতি বাচ্চাদের সাথে মজা বা জোকস বলা উচিত বয়স বুঝেই। এই জাতীয় ব্যাপারগুলো আমাদের সমাজে প্রায় নেই বললেই চলে। আর তাই এই নিয়মগুলো মেনে চলতে হলে সেগুলো জানা প্রয়োজন বাচ্চা এবং তার বাবা মা সকলেরই।

এখন মূল বিষয় হলো, এই যৌন শিষ্টাচার সেগুলো আমাদের কেনো জানতে হবে বা কেনো শিখতে হবে। এর উপযোগিতা কি? পাশ্চাত্যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে “সামাজিক স্বাস্থ্য” নামে একটি শিক্ষা তাদের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হয় প্রগতিশীল শিক্ষা আন্দোলনের একটি ফলাফল হিসেবে, যা পরবর্তীতে সেক্স এডুকেশন নামে রূপ নেয়। জরিপ বলে, এই শিক্ষা তাদের শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তারা অভূতপূর্ব ফলাফল দেখতে পায় তাদের তরুণ সমাজের ভিতরে। এমনকি আফ্রিকাতে এইডস এর প্রকোপ কমানোর ক্ষেত্রে যৌন শিক্ষা অপরিহার্য বলে মনে করেন বিজ্ঞানী এবং সমাজ সংস্কারকেরা। কিন্তু সমাজ ভেদে শিক্ষাগুলোর উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং ধরন বদলায়। পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে এসে অবস্থা বিবেচনা করে সেক্স এডুকেশনকে যৌন শিষ্টাচার বলাটাই সবচেয়ে শ্রেয়।

প্রথমত, পৃথিবীতে ছড়িয়ে পরে নিজেকে তুলে ধরার আগে নিজেকে জানা প্রয়োজন খুব বেশি। এই শিক্ষা নিজেকে জানার প্রথম দিকের একটা ধাপ। যৌন শিষ্টাচার শিক্ষা খুব ঘনিষ্টভাবে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এবং আবেগের সাথে জড়িত। ছোটোবেলা থেকে সঠিকভাবে এই শিক্ষা পেলে সহজাত প্রবৃত্তিগুলো বিকৃত হওয়ার সুযোগ কম থাকবে, যেই বিকৃত যৌন আচরন এখন আমাদের মাথার ওপরে একটা জ্বলন্ত সমস্যা।

দ্বিতীয়ত, ছেলেমেয়েরা যখন সঠিক আচরণ শিখে বড় হবে, তখন অস্বাভাবিক আচরণ তারা বুঝতে শিখবে এবং অস্বাভাবিকের বিরুদ্ধে কথা বলতে শিখবে। প্রায়ই এমন হয়, রাস্তাঘাটে মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হয়, কিন্তু তার বিরুদ্ধে বলতে শিখে না, কেননা যেভাবেই হোক তার মাঝে শিক্ষাটা এমনভাবে দেয়া হয় যেনো এটাই স্বাভাবিক। বয়ঃসন্ধিকালে যখন নিজের সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মায়, তখন মেয়েদের কাছে পিন করে রাখা গার্হ্যস্থ বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়টাই একমাত্র ভরসা। আবার ছেলেরাও সুস্থ কোনো উৎস থেকে নিজেকে জানে, সেটাও না। এই কারণে অনেক আচরণ যে আসলে অশোভন, সেই ব্যাপারটিই তারা জানে না। যৌন শিষ্টাচার শিখার মাধ্যমে তারা শোভন এবং অশোভন আচরণগুলোো পার্থক্য করতে শিখবে।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো নিজের ঘরে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া। অসংখ্য বাচ্চা একদম ছোটো বয়সে নিজ ঘরে আপন মানুষের কাছে বিকৃত আচরণের শিকার হয়। সেই বিকৃত আচরণকে তারা আদর ভাবতে বাধ্য হলেও সেই ঘিনঘিনে অনুভূতি তাদের তাড়া করে বেড়ায় জীবনভর। ছোটোবেলা থেকে যৌন শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া হলে এই জঘন্য ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে।

বয়সের সাথে সাথে যৌন শিষ্টাচার শিক্ষার ব্যাপ্তি এবং ধরনও বদলায়। এমনকি ছেলে এবং মেয়েদের শিক্ষার ধরনও বদলে যায়। যেই বয়সে যেই ধরনের শিক্ষা উপযুক্ত, সেই বয়সে সেই ধরনের শিক্ষা দেওয়াই যৌন শিষ্টাচার শিক্ষার লক্ষ্য। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ এবং গর্ভবতী মায়ের মৃত্যুর হার এরই মধ্যে অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে। যৌন শিষ্টাচার শিক্ষা যদি প্রতিটা স্কুলে বয়সোপযোগী করে দেয়া হয়, তাহলে এই সমস্যা আরও অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।

মানুষের বসবাস তার শরীরেই। দীর্ঘদিন ধরে এই শরীরকে অজানা এবং ট্যাবু করে রাখার ফলে জন্ম নিয়েছে মারাত্মক সব বিকৃতি। যেই বিকৃতি দূর করতে এখন যৌন শিষ্টাচার শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। তাই এই শিষ্টাচার শিক্ষা বাবা-মায়েদের অর্জন করতে হবে এবং অবশ্যই সুস্থ মস্তিষ্কের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই শিষ্টাচার বর্তমান প্রজন্মকে দিতে হবে এখনই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

লেখাটি ৯০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.