ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

0

আমেনা বেগম ছোটন:

আজকে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে একটি লেখা দেখে নিজের কথা শেয়ার করতে ইচ্ছা হলো। বলতে পারেন গাড্ডায় পড়া মানুষদের একটু অনুপ্রেরণা দেয়ার চেষ্টা থেকে এই লেখা। গল্পটা আমার এক বান্ধবীর। পরিবারের দোষ বলার ব্যাপারে আমাদের ট্যাবু এখনো যায়নি, তাই তার হয়ে আমিই বলছি।

আমি আমার নানা-নানীর কাছে মানুষ ছোটবেলা থেকে। বাবা অনেক আগেই দেশ ছেড়েছেন। মা খুবই ভালো চাকুরী করতেন। আমার বয়স যখন সাত বছর, আমার মাকে বাবা মোটামুটি জোর করে নিয়ে গেলেন। মা অনিশ্চয়তায় আমাকে ফেলতে চাননি। তাই নানা-নানীর কাছে রেখে গেলেন। আমি আমার মা-বাবার কাছে যখন যাই, তখন আমার বয়স ১৫। একজন টিন।

গিয়ে খুবই অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমার মা একটা ব্যবসা সামলান সারাদিন, রান্না করেন, বাসা কিপ করেন এবং আসার পথে আমার বাবার জন্য এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসেন। কিছুদিনের মধ্যে আবিষ্কার করলাম আমার বাবা আসলে একজন এলকোহলিক এবং মারাত্মক মেনিপুলেটিভ। মাকে মোটামুটি ব্রেইনওয়াশ করে রেখেছে।

এর মাঝে স্কুলে ভর্তি হলাম। কিন্তু একজন মদ্যপের সাথে এক বাসায় থাকা খুবই কঠিন একটি ব্যাপার। আমার পড়াশোনা প্রচণ্ডভাবে সাফার করা শুরু করলো। আমি কখনো হাত গুটিয়ে ভাগ্য বদলানোর জন্য হা করে বসে থাকার মতো মেয়ে না। মাকে বোঝানো শুরু করলাম। বললাম চলো আমরা বাসা নিয়ে আলাদা চলে যাই। আমি তাকে যতোটুকু বুঝাতে সক্ষম হই, বাবা ৫ মিনিটেই সেটা আনডু করে ফেলে। আমার উপড় প্রচণ্ড রাগ দেখানো শুরু করলো। এর মাঝে আমি একটা ছোটো কাজ শুরু করলাম রাতে। পড়াশোনা ততোদিনে লাটে উঠেছে। সন্ধ্যার পর থেকে কেউ যদি মদ খেয়ে চিৎকার করা শুরু করে তবে পড়াশোনা লাটে উঠাই নরমাল।

দুই বছর মাকে অনেক বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা women’s shelter এ নিয়ে যেতে রাজি করাতে পারলাম। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর যেই কে সেই। তিনি বাড়ি ফিরে আসলেন। আমার বাবা তার কথার জাদু চালিয়েছেন। সাথে আশেপাশের বাংগালীদের জানিয়েছেন। তারা সবাই মাকে বুঝালো। আমার মা পটে গেলেন। এতে কাজ হলো। আমিও আসলাম তার সাথে। ততোদিনে আমি ১৮। চাইলেই চলে যেতে পারি। কিন্তু মাকে এতো বাজে অবস্থায় রেখে যেতে পারলাম না। নরকে ফেরত আসলাম। সকালে বাইরে খামোখাই সময় নষ্ট করি, সন্ধ্যায় কাজে যাই, গভীর রাতে বাসায় আসি। ঘুমাতে পারি না চিৎকারের কারণে। একদিন বিরক্ত হয়ে পুলিশ ডেকে আনলাম। তারা তাকে একরাত জেইলে রাখলো। সেইরাতে আমি খুবই আরামে ঘুমালাম। সকালবেলা যেই কে সেই। তবে এরপর থেকে আমাকে একটু ভয় পাওয়া শুরু করলো।

দিন এভাবেই যাচ্ছিলো। মাকে কোনওভাবেই পারছিলাম না এই লোককে ছাড়তে রাজি করাতে। দিনদিন হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছি। আমার সাথে যেই বাংগালী বাচ্চারা ছিলো, তারা পটাপট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হচ্ছে। আমি হাইস্কুল অর্ধেক করে বসে আছি। তাদের মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের সাফল্যে যতোটুকু খুশি হলো, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ পেলো আমার ফেইলিওরে। ভাবতে পারেন ১৯ বছরের একটি মেয়ের জন্য ব্যাপারটি কী কঠিন? প্রায়ই ইচ্ছা হয় খুন করে ফেলি লোকটাকে। আমি একটা প্ল্যানও করলাম। কিন্তু যাই করি না কেন, ফাঁক থেকে যায়। আমি জানি একে খুন করলে আমি ঠিকই ফাঁসবো। এমন worthless একজনের জন্য জেইলে যেতে ইচ্ছা হয় না।

একদিন ডিসেম্বর মাস। ক্রিসমাসের পরের দিন। তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ১৫ ডিগ্রী। রাতের বেলা কাজ নিলাম বেশি টাকার লোভে। রাস্তায় হাঁটু সমান বরফ। রাত ১২টায় কাজ শেষ হলো। বক্সিং ডে বলে বাস অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক কম। আমি এর মাঝে বাস মিস করে ফেললাম। পরের বাস ১ ঘন্টা পর। আমার ঠান্ডায় কান্না পাচ্ছে। অথচ আমাদের গাড়ি আছে। আর কারও বাবা হলে ফোন করলে নিশ্চই এসে নিয়ে যেতো। কিন্তু আমার জন্য কেউ আসবে না। আমি ১ ঘন্টা বসে রইলাম। বাস আসলো। উঠে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। হঠাত মনে হলো, একি করছি আমি? কেন নিজের জীবন নষ্ট করছি? কেনই বা করছি? এভাবেই কি দিন যাবে? কেন যাবে? আমি অত্যন্ত মেধাবী একজন মেয়ে। আমার মেমোরি ফোটোগ্রাফিক। একজন মদ্যপ এবং একজন দুর্বল মানুষের জন্য আমি কেন সুখী হবো না? বাসটা যখন আমাকে শহরে নামিয়ে দিলো, আমি তখন জানি আমার কী করতে হবে।

পরদিন একটা প্ল্যান করলাম। হিসাব করে দেখলাম, আমি যদি নিজে আলাদা থাকি তাহলে সপ্তাহে চার দিন কাজ করতে হবে ছয় ঘন্টা করে। সেটি আমার হাইস্কুল শেষ করতে সমস্যা করবে। তবে চাইলেই আমি এই নরকটিতে থেকে যেতে পারি। থাকা-খাওয়া নিয়ে চিন্তা নাই। পড়া শুরু করলে সরকার থেকে হাত-খরচ পাবো। কষ্ট হবে, কিন্তু চলে যাবে। আমি এডাল্টদের হাইস্কুল খুঁজে বের করলাম। আগের স্কুলের ক্রেডিট নিয়ে আসলাম। কাউন্সিলরের সাথে বসে প্ল্যান বানালাম। জানুয়ারি থেকে ক্লাসও শুরু করে দিলাম।

সকালে ক্লাসে যাই। দুপুরে লাইব্রেরিতে পড়ি। সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দিয়ে রাতে ঘুমাতে যাই বাসায়। তখন আমার সম্বল একটা বাসকার্ড, আমার ফোনের সামান্য কয়টা ক্রেডিট আর একটা নরকের চাবি। টাকার খুব টানাটানি, মা দিলেও নেই না। বাসা থেকে খাবার আর কফি নিয়ে যাই বাইরে। কতোদিন আমার ওয়ালেটে শুধু ৫ সেন্ট নিয়ে ঘুরেছি জানেন?

উইক ডেগুলি ঠিক ছিলো। কিন্তু মুশকিল লাগলো শনি এবং রবিবার নিয়ে। এই দুদিন নরকটিতে কীভাবে থাকবো? গরমে বাইরে কাটিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু শীতে? সমাধান বের করলাম। একটা বান্ধবী তখন ইউনিতে পড়ে। তার কাছ থেকে ইউনির লাইব্রেরির চাবি ধার নিলাম। সকালে চলে যাই। পড়ি, লিখি আর ঘুম পেলে কিচেনের সোফায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সামার কাটে পার্কে, টুকিটাকি কাজ করে, আর A level এর জন্য প্রিপারেশন নিয়ে। একসময় আমার হাইস্কুল শেষ হলো। খুব ভালোভাবেই শেষ হলো। আমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। অনেকেরই মন খারাপ হলো। সবচেয়ে মন খারাপ হলো আমার বাবা নামের দানবটির। সে আমার স্পিরিট ভাংগতে পারেনি। আমি জিতে গেছি, সে আমার উপর কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি, এটিকে সে একটা ব্যর্থতা হিসেবে নিলো।

এরপরের কাহিনী আজ আর বললাম না। আমি নরক থেকে বের হয়েছি। বিয়ে করেছি, অন্য একটি দেশে মুভ করেছি। একটি অত্যন্ত নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছি। আমার নিজের চমৎকার একটি পরিবার আছে। শীতের রাতে আমাকে আর বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ফোন করলে আমার হাজবেন্ড আসে। আমাদের মেয়েটিকে যখন সে হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়ায়, আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। আমার মা এখনও দানবটির সাথে আছে। রিসেন্টলি তার বেশ কিছু কঠিন অসুখ হওয়াতে আর মদ পান করতে পারে না। তাই সেটা নানা ধরনের সেবা আদায় করে উসুল করে মায়ের কাছ থেকে। তাদের কারও জন্য আমার আর খারাপ লাগে না।

প্রিয় ভিকটিম, এই পৃথিবীতে কিছুই সহজ না। আপনি যেই হউন, নিঃসন্দেহে আমার চেয়ে কঠিন অবস্থায় আছেন। But please don’t be like my mom. I can never forgive her for putting me through hell. I didn’t deserve it. শক্ত হউন। ঠাণ্ডা মাথায় আপনার অপশন বিবেচনা করুন। একটা প্ল্যান করুন। আপনার মাথার উপর যদি একটা ছাদ থাকে আর খাবার থাকে ফ্রিজে, বিশ্বাস করুন আপনি অনেকটুকু এর মাঝেই এগিয়ে গেছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নিজেকে অত্যাচারীর কাছ থেকে মানসিকভাবে ডিটাচ করুন। তাকে একটা স্টেপিং স্টোন হিসাবে দেখুন। নরকে আছেন, কিন্তু এর থেকে বেরিয়ে আসার একটা ইচ্ছা অন্তত রাখুন। হারবেন না প্লিজ।

যদি আমি ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতাম সব, তাহলে কী হতো? আমি অড জব করতাম, আমার বাবা আমকে নিশ্চিতভাবেই একজন তার মতো অকর্মণ্য এর সাথে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতো। আমি নরক থেকে বের হতে পারতাম না। আমার কাহিনী আমার মায়ের মতোই হতো। তাই বলছি, হারবেন না। আমি যদি নিজের বাবাকে ছাড়তে পারি, তবে আপনি স্বামীকে কেন পারবেন না?

সুতরাং আপনি যখন, যেখানে যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, আপনার দূরবস্থা পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করতে পারেন, Its never too late to get a life.

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 573
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    573
    Shares

লেখাটি ২,২৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.