‘চলুন, বিলাসিতা-ভোগ বাদ দিয়ে দেশটাকে গড়ি’

PM with rama masiউইমেন চ্যাপ্টার: ‘মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। এই দেশটাকে আমাদেরই গড়তে হবে। দেশের মানুষকে আমি সেই কথাটিই বলতে চাই। চলুন, বিলাসিতা-ভোগ এসব বাদ দিয়ে সবাই মিলে আমরা এই দেশ গড়ি।’

কথাগুলো বলছিলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে গণভবনে সাক্ষাতকার শেষে বেরিয়ে আসার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি একথা বলেন।

মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী ওরফে রমা মাসীমা/রমা দিদির সাথে শনিবার সকালে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন মাধ্যমে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা এই নারীকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপরই তিনি তাঁর সাথে দেখা করতে চান।

একাত্তরে সংসার-সন্তান সব হারিয়ে একাই মাথা উঁচু করে পথ চলছেন এই জননী সাহসিকা। এই বয়সে এসেও তিনি কারও করুণা চান না, সাহায্য চান না। তবুও প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁর সাথে দেখা করতে চান, তখনও তিনি ছিলেন নির্বিকার। শুধু এটাই বলেছিলেন যে, ‘আমার চাওয়ার কিছু নেই, দেখা হলে শুধু কষ্টের-যন্ত্রণার কথাগুলো বলতে চাই বঙ্গবন্ধু কন্যাকে’।

শনিবার সকাল পৌণে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রমা চৌধুরীকে নিয়ে আসার পর প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। সত্তরোর্ধ্ব রমা চৌধুরী (তাঁর ভাষায়) ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা’কে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এসময় প্রধানমন্ত্রী নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

প্রায় আধা ঘন্টা ধরে তাঁরা কথা বলেন বলে জানা গেছে। দুজন দুজনের কাছে নিজেদের কষ্টের জীবনের কথা বর্ণনা করেন। প্রধানমন্ত্রী এসময় বলেন, ‘সব হারানোর কষ্ট আমি বুঝি। ৭৫ এ আমিও বাবা-মা, ভাই, সবাইকে হারিয়েছি’।

চট্টগ্রাম নিবাসী রমা চৌধুরীর সাথে ছিলেন তাঁর বইয়ের প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন। এই খোকনের কাছেই দীর্ঘ বছর আছেন রমা চৌধুরী। উইমেন চ্যাপ্টারকে খোকন জানান, প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর লেখা ‘একাত্তরের জননী’ বইটিসহ কয়েকটি বই উপহার দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি কোন সাহায্য চাননি। বরং বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে নিজের লড়াই আর কষ্টের কথা বলতে পেরেই তিনি সন্তুষ্ট।

তিনি তাঁর বই বিক্রির টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীর পোপদিয়ায় একটি অনাথ আশ্রম খোলার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ চেয়েছেন।

এর আগে শনিবার ভোরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছেন রমা চৌধুরী ও্ আলাউদ্দিন খোকন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারি (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিল তাদেরকে এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সীমান্ত তালুকদারকে সাথে নিয়ে গণভবনে যান।

মাহবুবুল হক শাকিল গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী আগ্রহ প্রকাশের পর তিনি চট্টগ্রামে রমা চৌধুরীর প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকনের সাথে যোগাযোগ করেন, নিজেও কথা বলেন রমা চৌধুরীর সাথে। তারপর তাঁকে ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করেন।

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) রমা চৌধুরী ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করা একাত্তরের এই জননীর জীবন পাল্টে যায় একাত্তরের ১৩ মে। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর দুটো সন্তানকেও হারান অসুখে-অবহেলায়। সংসারও ভেঙ্গে যায় তখন। দ্বিতীয়বার সংসার করতে গিয়ে প্রতারিত হন। সেই সংসারের ছেলেকে তিনি হারান এক সড়ক দুর্ঘটনায়।

ছেলেদের কষ্টের কথা ভেবে তিনি এরপর থেকেই জুতা পায়ে দেন না। তাঁর কথা, যে মাটির নিচে ছেলেরা শুয়ে আছে, তাদের বুকের ওপর দিয়ে তিনি কি করে জুতা পায়ে হাঁটবেন? আজও তিনি গণভবনে গেছেন খালি পায়ে।

নিজের লেখা বই বিক্রি করেই তাঁর সংসার চলে। তিনি কারও কাছ থেকে কোন সহায়তা নেন না। তবে কেউ যদি তাঁর বই কিনে, তবে সেইটুকু নিতে তাঁর আপত্তি নেই।

জানা গেছে, রমা চৌধুরীর এই দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের কথা জেনে দেশ-বিদেশের অনেকেই এগিয়ে এসেছেন তাঁর বই কেনা এবং একাত্তরের জননী বইটির পুনর্মুদ্রণের ব্যাপারে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.