বাঙালির বাঙালিত্ব নষ্ট হয় আমার মাথার কাপড়ে?

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

আমি একজন বাঙালি। জন্মের এক দেড় বছর পরে আমার মুখে প্রথম যে ভাষাটি বের হয়েছিল, তা ছিল বাংলা। আমি বাংলায় কথা বলি। বাঙালি বাংলা বলবে, এটাই স্বাভাবিক। স্কুলে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও কখনো ইংরেজি ভাষাকে আপন ভাবতে পারিনি, এখনো পারি না। ইংরেজি শেখাটা আমার প্রয়োজন ছিল, ঠিক তেমনি এখন প্রয়োজন ফ্রেঞ্চ শেখাটা।

ভালো ইংরেজি বলতে পারি না বলে আমি কখনো লজ্জিত হইনি। ইংরেজি ভালো বলাটা দরকার। এইটা একটা দক্ষতা, না পারাটা কখনো লজ্জার না। যখন কেউ অশুদ্ধ বাংলা বলে, খারাপ লাগে শুনতে। কিন্তু সেটা তার আঞ্চলিকতা। কিন্তু শুদ্ধভাবে বাংলা বলা আর লেখাটা অবশ্যই গর্বের।

খুব খারাপ লাগে যখন দেখি, ইংরেজি শিক্ষা আর স্কুলের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির বাংলা ভাষা। বাংলায় কথা বলা এখন আর স্ট্যাটাসের সাথে যায় না। একটু হিন্দি, একটু উর্দু আর বাংলিশ অর্থাৎ ইংরেজী উচ্চারণে বাংলা বলা। এই সবই এখন আধুনিকতা। স্মার্টনেস। থার্টি ফার্স্ট আর ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র ভিড়ে একুশ ফেব্রুয়ারিও আজ একটি সাদা-কালো কাপড়ের আনন্দ উৎসব! ভাষার গৌরবের ইতিহাস কয়জনই আর মনে রাখেন! হিন্দি আর ইংলিশের জোয়ারে ভাসছে বাঙালির বাঙালিত্ব। বাংলা ভাষা।

আমি বাঙালি। যেখানেই যাই বাংলায় নামটা স্বাক্ষর করি। এটা করতে আমার খুব ভালো লাগে। হ্যাঁ, আমি খুব খ্যাত! আমি বাংলা বলি, বাংলা লিখি। যে বাংলা বলতে পারে না, কিংবা বাংলা ভাষা নিয়ে লজ্জিত হয়, সে কী কখনো বাঙালি হতে পারে?

আমি বাঙালি। আমার প্রিয় খাবার হচ্ছে ইলিশ মাছ, আলু ডিম ভর্তা, বেগুন ভাজি, শুটকিসহ আরও অনেক বাঙালি খাবার। পোস্তার তরকারি আর পিঠা পুলি সবই আমার ভালো লাগে। দই মিষ্টি আমার খুবই পছন্দের।

কিন্তু কোমল পানি আর ভেজাল খাবারের ভিড়ে দই মিষ্টি আজকাল হারিয়ে গেছে। বিয়ে বাড়িতে এখন আর কেউ বাংলা খাবার দেয় না। না শুনি বাংলা গান। মুখরোচক অবাঙালি আর মুঘল রান্নার ভিড়ে কিছুই নাই আজ। আবার পূজোতে আজকাল ঢাকের ওয়াজের চাইতে হিন্দি গানের সাথে নৃত্যই বেশি। শাঁখা সিঁদুর এর সাথে মঙ্গলসূত্রের আধিপত্য দেখা যায়। এখন সাজসজ্জায় আর আনুষ্ঠানিকতা সবকিছুতেই বাঙালি এবং অবাঙালিত্বের মিশ্রণ ঘটে গেছে।

আমি বাঙালি। আর তাই দেশীয় সুতি কাপড় পরি। দেশীয় সুতি, তাঁত আর জামদানী কাপড় আমার খুবই পছন্দের। শাড়ি পরতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু এখন বাঙালি শুধুই শাড়ি পরে না। শাড়ি ছাড়াও আরো অনেক কিছুই পরে। সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি-পায়জামা, জিন্স-ফতুয়া, স্কার্ট-টপস আর তো আছে শার্ট-প্যান্ট, কোট-টাই আরো কতো কী!

এই সব কাপড় আর কাপড়ের ধরন সবই বিদেশি। এই সবে কোনো বাঙালিত্ব নেই। আবার একটা সময় ছিল যখন কেউ শাড়ির সাথে ব্লাউজ পরতো না। পরবর্তিতে শাড়ির সাথে ব্লাউজের চল এসেছে। তখন থেকেই নারীরা নানার ধরনের ব্লাউজ পরে। কেউ ফুল হাতা, কেউ হাতা কাটা। অভিজাত বাঙালিরাও সুলতান মুঘল আর ইংরেজদের প্রভাবে ঢাকাঢাকি কাপড় পরতে শুরু করে। ফলে বিভিন্ন জাতির আর তাদের সংস্কৃতির সংমিশ্রণের ফলে আজ আমাদের পোশাকে বৈচিত্র্য এসেছে! যার কোনোটাই বাঙালির নিজস্ব না।

আমি বাঙালি, তাই হয়তো চুলে খোঁপা করতে আমার খুব ভালো লাগে। লম্বা চুল আমার পছন্দ। কিন্তু এখন বাঙালি নারীরা চুলে তেমন একটা খোঁপা করে না। না দুইদিকে দুইটা বেণী করে ঘুরে বেড়ায়! বাঙালির লম্বা চুল আজ হারিয়ে গেছে বিভিন্ন ঢং-এর হেয়ার কাটিং-এর ভিড়ে। ইউ/লেয়ার/বব কাট/রেবন্ডিং/পাম্প আরও কতো কী! আরও তো আছে, হেয়ার কালারিং, লাল-ব্রাউন-সবুজ-হলুদ। আচ্ছা এইগুলি কি বাঙালির ঐতিহ্য?

এতো এতো রকমারি পোশাক আর ভিনদেশি সাজ-সজ্জার ভিড়ে বাঙালির বাঙালিত্ব নষ্ট হয় না! বাঙালি তার কালো চুল পাল্টিয়ে লাল-ব্রাউন করলে কিংবা চোখের কালো মণি পাল্টিয়ে নীল-সবুজ করলে বাঙালির বাঙালিত্ব নষ্ট হয় না! বাঙালির তার নিজস্ব তাঁত আর সুতি কাপড় ছেড়ে বিদেশী বস্ত্র আর পোশাক পরলে তার বাঙালিত্ব নষ্ট হয় না! বিদেশি ফার্স্ট ফুড আর অবাঙালি খাবারে অভ্যস্ত হলেও তার বাঙালিত্ব নষ্ট হয় না! শুধু তাই নয়, ভিন্নদেশীয় এতো এতো সাংস্কৃতিক চর্চার আর অপ্রয়োজনে ইংরেজি-হিন্দি ভাষা ব্যবহারে বাঙালিত্ব নষ্ট হয় না।

বাঙালির বাঙালিত্ব নষ্ট হয় কেবলমাত্র আমার মাথার কাপড়ে?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 938
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    938
    Shares

লেখাটি ৩,৩৫২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.