হিজাব একটি শ্রেণি প্রশ্ন; মুসলিম এরিস্টক্র্যাটের প্রতিনিধি

শেখ তাসলিমা মুন:

যতটুকুন জানতে পারি, হিজাব ইসলামেরও আগের একটি বস্ত্রখণ্ড, যা দিয়ে মাথাকে আচ্ছাদন করা হয়। এবং নারীদের মাথা। প্রাচীনকালে গ্রিক, পারস্য, চায়না, ভারত অঞ্চলে নারীর মস্তক আচ্ছাদনের কথা জানা যায়, যা হিজাবের বিকল্প একটি বস্ত্রকালচার হিসেবে প্রচলিত ছিল।

হিজাবের শাব্দিক অর্থ আচ্ছাদন। ইসলামি আইন অনুযায়ী একজন নারী যাদের সঙ্গে আত্মীয়তা সূত্রে আবদ্ধ নয় এমন সব পুরুষের সামনে সে তার শরীর ঢেকে রাখবে, এবং সে তার অংগ প্রদর্শন করবে না। কিন্তু ইসলামের প্রথম দিকে হিজাব বা আচ্ছাদন বিষয়ে কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। নবীর অনেক কাছের এক আত্মিয়া প্রকাশ্যে মুখ খুলেই চলাফেরা করেছেন এবং তাঁর চেহারা আল্লাহর দান বলে গর্ব করেছেন। তারা বলেছেন, যেহেতু আল্লাহ আমাকে আমার এ চেহারার মালিক করেছেন, তাকে ঢেকে রাখার কোনো কারণ আছে বলে মনে করি না। কিন্তু খুব বেশিদিন তারা এ অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারেননি। খুব অল্পদিনের ভেতর কোরআনের আয়াত হিসেবে নারীর প্রতি আচ্ছাদন পরিধানের নির্দেশ এসেছে।

আমার আজকের আলোচনা আমি করবো কোরআনের একটি আয়াত দিয়ে। কোরআনে নবীর স্ত্রীগণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “হে, নবীর স্ত্রীগণ! আপনারা অন্য নারীদের মতো নন”! সূরা আহযাবের আয়াত থেকে আরও পাওয়া যায় “হে নবী! আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মোমিনদের স্ত্রীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়, এর ফলে তাদের (সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত নারী হওয়ার) পরিচয় পাওয়া যাবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ অত্যন্ত ক্ষমতাশীল এবং পরম দয়ালু।” (আহযাব:৫৯) এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এটি পরবর্তীতে হিজাব দ্বারা কিভাবে আমাদের মুসলিম বঙ্গ প্রদেশে শ্রেণিবিভাগ করেছে এবং হিজাব কিভাবে সে শ্রেণি ভঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিই বেশ ইন্টারেস্টিং বিষয়।

এ প্রসঙ্গে হিজাব ইসলামেরও আগে কারা হিজাব পরিধান করতো, সে বিষয়ে আর একটু বলা যাক। শোনা যায়, অ্যাসিরীয় রাজা তাঁর রাজপ্রাসাদের ‘সম্মানিত’ নারীদের জন্য হিজাব চালু করে। কিন্তু পাশাপাশি হারেম বা হেরেমের নারীদের জন্য হিজাব প্রযোজ্য ছিল না। এবং দাসীদের জন্যও না। এমনকি দাসীরা বা হেরেমের নারীরা হিজাব পরলে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান ছিল।

এ অবস্থা কিভাবে আমাদের অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে সেটি বলতে গিয়ে, হুমায়ূন আহমেদের একটি টিভি নাটকের কথা আমার মনে পড়ছে। সেখানে ঠিক হিজাব নয়, তবে আরেকটি বিষয়ে ইসলামিক নিয়ম ধনী এবং দরিদ্রদের ভেতরে কীভাবে প্রযোজ্য, সেটি অত্যন্ত সরলভাবে প্রকাশ করেছে। এ নাটকের একটি নারী চরিত্র নবিতুন বলে ধরে নেই। যার স্বামী পাগল। ইসলামে আছে স্বামী পাগল হলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর স্ত্রীটিকে তার আত্মীয় বা ‘গার্জেন’রা অন্যত্র বিয়ে দিতে পারবে। এক্ষেত্রে এই দরিদ্র পাগলের স্ত্রীর উপর নির্দেশ আসলো জমিদার সাহেব থেকে। কিন্তু মেয়েটি তার পাগল স্বামীকে আগলে রাখে। সে বিয়ে করতে চায় না।

জমিদারের থেকে ডাক আসে। জমিদার বলছে, তুমি নাকি বিবাহে অসম্মত? কেন?
সে বলে, হুজুর আমি দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে চাই না। পাগল স্বামী নিয়েই থাকতে চাই।
তখন জমিদার বলছে, ‘ছোটলোক’দের বারবার বিবাহে কোন সমস্যা নাই। বড় ঘরের মেয়েদের এসব ভাবতে হয়, তোমাদের এসব না ভাবলেও চলে। যাও বিবাহের জন্য প্রস্তুতি নাও। স্বামী পাগল হলে তার সাথে বসত করা নাজায়েজ।

হিজাবের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে অনেককাল এ নিয়মটি কাজ করেছে। নেংটি যেখানে গরীবের পোশাক। এক খণ্ড বস্ত্রে তারা লজ্জা ঢেকেছে। দরিদ্র নারীদের সায়া-ব্লাউজ ছিল না। শীতের সময়ও তারা ঐ ১২ হাত কাপড়ে শরীর পেঁচিয়ে চলেছে। দরিদ্র জনসমষ্টির জন্য ধর্ম বাধ্যতামূলক ছিল না। ক্ষুধার্ত মানুষের রোজা রাখার দরকার না হবার মতো।

এ অঞ্চলে মুসলমান খানদানের নারীদের জন্য কেবল পর্দা ছিল। তারা সাধারণ নারী ছিল না। ধনী ঘরের নারী ছিল। তাঁদের মুখ সাধারণের দেখা নিষেধ এমন মনোভাবেই এ অঞ্চলে পর্দা প্রথা ছিল, একটি বড় সমষ্টির ভেতর কোনো পর্দা ছিল না।

খুব ছোটবেলায় আমি আমার মায়ের কাছে শুনেছি, আমার মায়ের বড়বোন স্কুলে যেতেন পালকি চড়ে। খানদান মুসলমান ঘরের মেয়েরা পালকি চড়ে এবাড়ি-ওবাড়ি বেড়াতে যেতো। সে পালকি আবার কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকতো। মিয়াঁ পাল্কির পেছনে ছড়ি হাতে চলতো। তারা যাচ্ছে আরেক খান্দানি ঘরে দাওয়াত রক্ষা করতে। দরিদ্র মানুষ দূর থেকে তাকিয়ে দেখতো। তারা বুঝতো ধনী অভিজাত খান্দানের মেয়েদেরকে কেউ দেখতে পারে না। ওগুলো কেবল বড় বাড়ির মেয়েদের জন্য। ‘ছোটলোকের’ জন্য পর্দা নয়। ছোটলোকের পর্দা করা এমনকি খানদান বাড়িকে প্রশ্ন করার সামিল ছিল। ঔদ্ধত্য দেখানো ছিল। কোন হঠাত ধনী হওয়া পরিবারের মেয়েদের শরীরে বোরকা হিজাব উঠলে তা সে বাড়ির নারীদের জন্য যেমন ছিল শাস্তির, অন্যদিকে ধনী অ্যারিস্টক্র্যাট নারীদের জন্য ছিল তাঁদের আত্মসম্মানে আঘাত দেওয়ার সামিল। আমাদের বাংলা অঞ্চলে পর্দা হিজাব ছিল কেবল মুষ্টিমেয় মুসলিম খান্দানে। যেমন আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন, “হে, নবীর স্ত্রীগণ! আপনারা অন্য নারীদের মতো নন”!

বাংলাদেশে আজ একটি ভয়ানক পরিবর্তন ঘটেছে। এবার দেশে গিয়ে দেখি আমাদের বাড়িতে কর্মরত সকল সহকারি ছোট বা বড়, তারা বুরকা হিজাব নিকাব ছাড়া বেরুচ্ছে না। সকল শ্রেণি পেশার ছোট বড় বালিকা বৃদ্ধা সকলে এ বস্ত্রে আচ্ছাদিত হয়ে বেরুচ্ছে। কোথায় যেন তারা ধনীদের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে তারা। চাহিদার কারণে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে বুরকার দোকান। রঙবাহারি হরেক রকমের বুরকা হিজাব নিকাবে দোকানপাট ভরা। যতটা সম্ভব বৈভব প্রতিপত্তি প্রকাশের ছড়াছড়িও বেড়ে যাচ্ছে, বৈষম্য প্রকাশ করতে হিজাবে হিজাবে প্রতিযোগিতা ছলছে।

কী আশ্চর্য আৎরাফ আশরাফ দুটি শ্রেণি একটি অন্ধকারের ভুতুড়ে পৃথিবীতে এক হওয়ার যুদ্ধ করছে। এ পশ্চাৎপদতার প্রতিযোগিতার আর পেছন ফেরার কারণ নিরূপণ করতে তাকাতে হবে নিজেদের দিকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.