“যৌন শুদ্ধির” বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কেনিয়ার বিধবা নারীরা

0

সাদিয়া রহমান:

কেনিয়ার লুও উপজাতির মাঝে এখনো প্রচলিত আছে “সেক্সুয়াল ক্লিনজিং” বা যৌন শুদ্ধির মতো অসম্ভব এক অসমীচীন প্রথা। এই প্রথা অনুযায়ী এই গোত্রভুক্ত কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে জোরপূর্বক অচেনা একজনের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে শুদ্ধি অর্জন করতে হয়।
তাদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে নারীটির মাঝের অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করে তাকে শুদ্ধ করে তোলা হয়। সম্প্রতি কেনিয়ার বিধবারা এক জোট হয়ে এর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারা তুলে ধরেছে এই প্রথার বর্বর দিকগুলি।

কেনিয়ার বিধবা ক্লাবের সদস্য পামেলার উক্তিতে উঠে আসে এই রীতির নিয়ম কানুন, তীব্রতা, ফলাফল, ভয়াবহতা সবকিছুই। কেনিয়ার এই উপজাতিরদের মাঝে প্রচলিত আছে “কর্তার ইচ্ছাই কর্ম” পদ্ধতি। সেইখানে সবকিছুর সিদ্ধান্ত সমাজের পুরুষেরা নিয়ে থাকে এবং তা অমান্য করার কোনো সুযোগ নারীদের নেই। যৌন শুদ্ধিও জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া একটা প্রথা। এই প্রথা অনুযায়ী কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে প্রথমে অন্য এক ব্যক্তির সাথে যৌন মিলনে আবদ্ধ হতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই ব্যক্তি হয়ে থাকে সম্পূর্ণ অচেনা কেউ।

সেই যৌন মিলন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয় তিনদিন ধরে। ধাপে ধাপে মেঝে এবং বিছানায় তাদেরকে জোরপূর্বক মিলনে বাধ্য করা হয়। পরদিন সকালে তাদের পরিধেয় পোশাক সব পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর বিধবা নারীর মাথা কামিয়ে ন্যাড়া করে দেয় ক্লিঞ্জার ব্যক্তি। চারদিন পর বিধবা ব্যক্তিরা নিজের ঘরে ফিরতে পারেন। এরপর সেইসব ব্যক্তি যাকে “ক্লিঞ্জার” অথবা “আদর্শ শুদ্ধ” ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে, তাদের জন্য বিধবা নারী মুরগী রান্না করে আনেন এবং তার সাথে খান। এরপর বিধবার বাসার সবকিছু ধুয়ে ফেলা হয়। সবকিছু পালন করা হয়ে গেলে তারপর বাচ্চারা ঘরে ফিরতে পারে।

রোসেলিন ওরোয়া নামে একজন যিনি বিধবা এবং ক্লিঞ্জার উভয় পক্ষের পুনর্বাসনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তিনি বলেন, কাজটা খুব কঠিন। এদের মাঝে নেই সঠিক শিক্ষা, কিন্তু আছে সুদীর্ঘ শত বছরের তৈরি হওয়া একটা মানসিক ছাঁচ। যেই ছাঁচ অনুযায়ী তারা এই শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়াকে একটা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য এবং অনেকটা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ মনে করে। অনেক সময় তাদের অর্থের বিনিময়েও নিয়োগ দেয়া হয়। তারা মদ্যপ হয়। তাদের শারীরিক কোনো শিক্ষা থাকে না।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা নিরাপদ মিলনকে অস্বীকৃতি জানায়। যার কারণে এইডস এর হার অনেক বেড়ে যাচ্ছে। যার শিকার হয়েছেন পামেলা। আবার অনেক সময় দেখা যায়, তারা নিতান্তই বিধবার অর্থের প্রতি আকৃষ্ট। অনেক ক্লিঞ্জার প্রক্রিয়া শেষ হবার পরেও থেকে যায় সেই অর্থের লোভে। বিধবাদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, বেশিরভাগ বিধবারাই এই প্রথার বিরোধী। তারা ক্লিঞ্জারদের মনে করছেন অনেকটা “উড়ে এসে জুড়ে বসা” মানুষ, যারা বিধবাদের উপর কোনো উপযুক্ত কারণ বা সম্পর্ক ছাড়াই তাদের নিপীড়ন করে যাচ্ছে। বেশির ভাগ বিধবা এবং সমাজ কর্মীরা মনে করেন জোরপূর্বক শুদ্ধি গ্রহণে বাধ্য করাটা ধর্ষণের শামিল।

২০১৫ সালে দেশটির সরকার এই প্রথাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু তারপরও দেশটির আনাচে-কানাচে এবং বিশেষত দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে থেকে যাচ্ছে এই রীতি। বিধবা সংস্থা এবং কর্মীরা মনে করছেন, এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধতা কেনিয়ার নারীবাদের ইতিহাসে সাড়া জাগানো একটা পদক্ষেপ।

তারা সংঘবদ্ধ হয়েছে এবং একে অন্যের পাশে ছায়ার মতো মানসিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। দিন শেষে তারা মনে করছেন, এই অবস্থার উন্নতি অবশ্যই সম্ভব। দেশটির সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, শিক্ষার হার অনেক নারীকেই তাদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করেছে, এবং এই কারণে অনেক নারী আজকাল আইনী সহায়তা চান। অন্য সংস্থাগুলোও প্রাথমিকভাবে শিক্ষা এবং বিধবার স্বনির্ভরতার ওপরেই গুরুত্ব আরোপ করেছে।

: বিবিসি অবলম্বনে

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 390
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    390
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.