ঘরে ঘরে নাম না-জানা হাজারও অপু বিশ্বাস

0

তনয়া দেওয়ান:

একজন নারী কারও স্ত্রী হতে গিয়ে আর কতোটা আত্মত্যাগ করলে আদর্শ স্ত্রী হতে পারে? স্ত্রী হতে গিয়ে যখন জন্মগতভাবে প্রাপ্ত ধর্মকে ত্যাগ করলো!, অবশ্য যেখানে মানব ধর্ম থেকে প্রথাগত ধর্ম বড় হয়ে যায়, সেখানে বলার কিছুই নেই।
প্রত্যেকটা নারীর স্বপ্ন বিয়ে, সবাই চায় ধুমধাম করে সবাইকে জানিয়ে বিয়ে করতে, স্ত্রী হতে গিয়ে সেটাও বিসর্জন দিলো!
প্রত্যেকটা নারীই স্বপ্ন দেখে বিয়ের পর ফুটফুটে একটা সন্তানের মা হবে, সেই অন্তিম সুখের মুহুর্তে তার স্বামী তার পাশে থাকবে, সেটাও সে পায়নি!
সব মেয়েই চায় স্বামী সন্তান নিয়ে একটা সুন্দর সংসার করতে, সেটাও হলো না তার!
বিনিময়ে কী পেল? পেল শুধু অবহেলা, বঞ্চনা, প্রতারণা আর এক রাশ কষ্ট…….
তাহলে এতো স্যাক্রিফাইস-কম্প্রোমাইজ এর কি এটাই মূল্য?

ভাবছেন, আমি অপু বিশ্বাসের কথা বলছি?
না না, আমি আমাদের সমাজে বসবাস করা নাম না জানা হাজার হাজার অপু বিশ্বাসের কথা বলছি!

একবার ভাবুন তো, পুতুল খেলার বয়স থেকেই আমাদের মেয়েরা স্বপ্ন দেখে, পঙ্খিরাজের ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র এসে সিনড্রেলার মতো তাকেও নিয়ে গিয়ে স্বর্গ রাজ্যের রানী বানাবে। এরপর? এর পরেরটা মনে মনে বুঝে নিতে হয় যে, অর্থাৎ তারা কোনো বাধা, দুঃখ, কষ্ট ছাড়াই দিনাতিপাত করতে লাগলো! (সাথে রাজপুত্র তো আছে তাই চিন্তা কিসের!)

আসলে আমাদের এই সমাজ পরিবারই এই স্বপ্নটা মেয়েদেরকে দেখাতে শেখায়। যথারীতি মেয়েরাও এই স্বপ্নটা দেখেই বড় হয়। তারাও তাই নিজেদেরকে সিনড্রেলার মতো ভাবে। অপেক্ষায় থাকে সেই কাঙ্খিত রাজপুত্রের! সেই কাঙ্খিত রাজপুত্র ভেবে ভুল মানুষের সাথে অনেকের আবার ভুলই হয়ে যায়!

রাজপুত্র ভেবে যাকে বিয়ে করে সে নিজেকে রানী ভাবতে লাগলো, বিয়ের কদিন পরই সে অপু বিশ্বাসের মতো বুঝতে পারে তার জীবনটা সিনড্রেলার মতো নয়, নয় সে কোনো রাজ্যের রানী বা মহারানী! এখানে অপু বিশ্বাস তো সেই সব নাম না জানা রাজকন্যাদের প্রতিনিধি মাত্র। আমাদের এই সমাজে হাজার হাজার অপু বিশ্বাস আছে, যাদের সবাইকে আমি বা আপনি বা আমরা চিনি না, জানি না….

আচ্ছা, আমরা কি পারি না আমাদের রাজকন্যাদের স্বপ্নটা অন্যভাবে দেখাতে?

যেমন ধরুন, শিক্ষা দীক্ষায়, নৈতিকতায় ও মানবতার আদর্শে দীক্ষিত হয়ে নিজে আগে স্বাবলম্বী হয়ে রাজ্য চালানোর যোগ্যতা দক্ষতার সাথে অর্জন করে অন্য দুর্দশাগ্রস্ত রাজকন্যাদেরও দুর্দশার কবল থেকে রক্ষা করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাবে! তারপর কোনো এক যোগ্য রাজপুত্র পেলে তবেই তারা জীবনসঙ্গী করবে!

এক্ষেত্রে সিনড্রেলার চেয়ে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথই কি যোগ্য উদাহরণ নয়?
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, মাদার তেরেসা, বেগম রোকেয়াও কি হতে পারে না এর যোগ্য উদাহরণ?
দুঃখ দুর্দশা থেকে রক্ষার জন্য কেন আমাদের মেয়েদেরকে তথাকথিত সেইসব মেরুদণ্ডহীন রাজপুত্রদের আশায় থাকতে হবে?
কী দরকার মেয়ে, এ ধরনের একটা মানুষের মুখোশধারী প্রাণীকে ভালোবেসে সুন্দর “সংসার স্বপ্ন” দেখার!
তুমি কি কখনো পড়োনি,
“প্রাণ থাকলে প্রাণী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ হয় না”!

বিয়ে না করেও বেঁচে থাকা যায়, কিন্তু কোনো মেরুদণ্ডহীন মানুষের সাথে তো থাকা যায় না।

একটা কথা খুব প্রচলিত, দিল্লি কা লাড্ডু খাইলেও পস্তাতে হয়, না খাইলেও পস্তাতে হয়। তাই সবাই খেয়ে পস্তানোর পক্ষে মত দেয়। সমস্যা তো খেয়ে পস্তানোর বা না পস্তানোর না। পস্তানো পর্যন্ত হলে তো ঠিক আছে, কিন্তু খাওয়ার পর… ওয়াক থু… করে বমি করাতেই তো সমস্যা। যেখানে হজম করতেই সমস্যা, সেখানে শুধু শুধু খেয়ে কী লাভ!

তাই আদর্শ স্ত্রী হওয়ার আগে আদর্শ মানুষ হোন, আদর্শ নারী হোন, এতে আপনারই বেশি মঙ্গল, অন্যদেরও মঙ্গল।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 3.7K
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.7K
    Shares

লেখাটি ৭,৯২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.